ফুলেল শ্রদ্ধায় আলী ইমামকে চিরবিদায়

“আলী ইমাম শুধু শিশু সাহিত্যিকই নন, তিনি তার চেয়ে বেশি কিছু,” বলেছেন কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 22 Nov 2022, 02:36 PM
Updated : 22 Nov 2022, 02:36 PM

সহকর্মী, স্বজন আর বিভিন্ন পেশার মানুষের ভালোবাসা ও ফুলেল শ্রদ্ধায় চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন শিশুসাহিত্যিক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব আলী ইমাম।

মঙ্গলবার বিকালে ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।তার আগে বাংলা একাডেমি, বিটিভি ও চ্যানেল আই কার্যালয়ে হয় শ্রদ্ধা নিবেদন।

সোমবার মারা যান আলী ইমাম। তার বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। তিনি শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছিলেন।

মঙ্গলবার ভোরে ধানমণ্ডির বায়তুল আমান মসজিদে প্রথম জানাজার পর সকাল সাড়ে ১০টায় মরদেহ নেওয়া হয় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। সেখানে আরেকটি জানাজা হয়, তা পরিচালনা করেন বাংলা একাডেমির পরিচালক ড. হাসান কবীর। 

আলী ইমামের ছেলে তানভীর ইমাম অন্তু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাবার ভীষণ প্রিয় জায়গা ছিল বাংলা একাডেমি। বইমেলায় তো প্রায় প্রতিদিনই হাজির হতেন। বইমেলা ছাড়াও তিনি বাংলা একাডেমিতে প্রায়ই যেতেন। মৃত্যুর আগে বাবা তার মরদেহ বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আনার ইচ্ছা প্রকাশ করে গিয়েছিলেন। বাংলা একাডেমির কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই, তারা বাবার এই ইচ্ছাটি পূরণ করেছেন।”

বাবা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তানভীর ইমাম বলেন, “আব্বার যে বিষয়টি আমাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করত, সেটা হলো উনার বাচনভঙ্গী। উনি সুবক্তা ছিলেন। শিশুসাহিত্যিক হিসেবে তিনি আমাদের প্রজন্মকে সমৃদ্ধ করেছেন। আব্বা হারিয়ে গেলেন, কিন্তু তার কাজ হারাবে না।।”

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা বলেন, “আলী ইমাম শুধু শিশু সাহিত্যিকই নন, তিনি তার চেয়ে বেশি কিছু। শিশুকিশোরদের কাছে তিনি শিক্ষক এবং বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে গুগল আসার আগে তিনি অনলাইন বা গুগলপ্রতীম এক জ্ঞানের ভাণ্ডার ছিলেন।

“পৃথিবীর বিচিত্র বিষয় সম্পর্কে আলী ইমাম জানতেন। তার লেখা পড়ে অনেকেই সমৃদ্ধ হয়েছেন। জ্ঞানভিত্তিক সৃজনশীল সমাজ নির্মাণ করতে হলে শিশুদের মাঝে মননশীলতার চর্চা ছড়িয়ে দিতে হবে। আলী ইমাম সেই কাজটিই করে গেছেন। অনেক বই লিখেছেন। এছাড়া নানামুখী কাজে নিজেকে বিকশিত করেছেন। আমার সাথে তার পরিচয় ষাটের দশকে। তিনি সুবক্তা ছিলেন, মেধাবী মানুষ ছিলেন। শিক্ষা, জ্ঞান এবং বিনোদনমূলক- এই তিনটি কাজ করে তিনি আমাদের জাতির জন্য খুব প্রয়োজনীয় কাজ করে গেছেন।”

শিশু একাডেমির মহাপরিচালক ও শিশুসাহিত্যিক আনজীর লিটন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আলী ইমাম ভাই আমাদের শিশুসাহিত্যের একটা বড় অধ্যায়। তার রচনার মধ্য দিয়ে তিনি সেই অধ্যায়কে সমৃদ্ধ করে গেছেন। তার রচনা আমাদের শিশুসাহিত্যের সম্পদ। লেখালেখির মধ্য দিয়ে তিনি ফুল, পাখি প্রকৃতিকে আমাদের মাঝে যেমন নতুনরূপে চিনিয়ে দিয়েছেন, তেমনি বিশ্বসাহিত্যকেও আমাদের সামনে হাজির করেছেন। শিশুকিশোরদের মাঝে তার লেখা বই তুমুল জনপ্রিয়। যে ঘরে শিশুকিশোর আছে, সেই ঘরের বুকশেলফে আলী ইমামের বই থাকবেই। তিনি এমন একটি জায়গা করে নিতে পেরেছিলেন।"

ছড়াকার ও শিশুসাহিত্যিক আমিরুল ইসলাম বলেন, “শুধু এটুকু বলতে পারি- আমরা যে বেড়ে উঠেছি শৈশব থেকেই একটা স্বপ্ন বুনে নিয়েছিলাম যে আলী ইমাম হবো। যে কারণে শৈশব থেকেই শিশুসাহিত্য চর্চা করেছি, টেলিভিশনে কাজ করেছি এবং শিশু সংগঠন করেছি। আলী ইমাম এই তিনটি কাজই করেছেন। তাকে দেখেই তিনটি কাজে যুক্ত হয়েছি।”

আলী ইমামের সাথে দীর্ঘ সময় কাজ করার অভিজ্ঞতা জানিয়ে তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী পিয়ার মোহাম্মদ বলেন, “১৯৮৮ সালে আলী ইমাম ভাইয়ের সাথে পরিচয়। তারপর নানাভাবে তার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। তার অনেক বইয়ের প্রচ্ছদ, প্রিন্টিংয়ের কাজ আমি করেছি। তার সাথে টেলিভিশনের কাজ সহকারী হিসেবে ছিলাম। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে বইয়ের প্রচ্ছদের জন্য পুরস্কার পেয়েছি। সেটিও ছিল আলী ইমামের বই। নানাভাবে তার কাছ থেকে শিখেছি। তিনি আমার জীবনবোধের শিক্ষক ছিলেন।”

বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চের পাশে আলী ইমামের মরদেহে শ্রদ্ধা জানান একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার নেতৃত্বে একাডেমির কর্মকর্তা/কর্মচারীবৃন্দ। এছাড়া শ্রদ্ধা নিবেদন করে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, জাতীয় কবিতা পরিষদ, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, বাংলাদেশ শিশুসাহিত্য কেন্দ্র, মাসিক সাহিত্য পত্রিকা শব্দঘর। 

সেখানে উপস্থিত ছিলেন আনোয়ারা সৈয়দ হক, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, শিশুসাহিত্যিক কাইজার চৌধুরী, কালি ও কলম সম্পাদক সুব্রত বড়ুয়া, শব্দঘর সম্পাদক মোহিত কামাল, সময় প্রকাশনের প্রকাশক ফরিদ আহমেদ, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের যুগ্ম-পরিচালক মনির হোসেন, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কর্মকর্তা মেসবাহউদ্দিন সুমন ও অনন্ত উজ্জ্বল, শিশুসাহিত্যিক কামাল হোসাইন, ইমরান পরশ, মামুন সারওয়ার, কবি হানিফ খান প্রমুখ। 

বাংলা একাডেমি থেকে মরদেহ নেওয়া হয় চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে। সেখানে তৃতীয় জানাজা হয়। এতে অংশ নেন চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ, বামবার সভাপতি হামিন আহমেদ, ব্যান্ডশিল্পী মাকসুদসহ অনেকে।

এরপর মরদেহ নেওয়া হয় আলী ইমামের দীর্ঘদিনের স্মৃতিবিজড়িত কর্মস্থল বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি)। সেখানে বিটিভির কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাত সহকর্মীরা শ্রদ্ধা এবং চতুর্থ দফা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

আলী ইমামের ছেলে তানভীর ইমাম জানান, বাদ আছর আজিমপুর কবরস্থানে তার বাবাকে দাফন করা হয়।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক