১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০১ কার্তিক ১৪৩৩

বনানীতে সৃষ্টির রূপকথায় সেজেছে ‘জলজ’

একে বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি, জলনির্ভর জীবন, স্থানীয় কারুশিল্প ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সম্মিলিত প্রকাশ হিসেবে দেখছেন স্থপতি অমিতি কুন্ডু।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 16 Oct 2026, 11:33 PM

Updated : 16 Oct 2026, 11:32 PM

অনন্ত মহাবিশ্বের শতকোটি গ্রহ-নক্ষত্রের মাঝে পৃথিবীই একমাত্র প্রাণোচ্ছল নীলাভ নীড়, আর এই প্রাণের অস্তিত্বের প্রথম ও প্রধান শর্ত জল। আধুনিক বিজ্ঞান যেমন পৃথিবীতে জীবনের সূচনাকে জলের সঙ্গে যুক্ত করেছে, তেমনি হাজার বছর আগে বৈদিক ঋষিরাও জলকে সৃষ্টির আদি তত্ত্ব হিসেবে উপলব্ধি করেছিলেন।

জলের এই বৈদিক আধ্যাত্মিকতা, নদীমাতৃক বাংলার রূপসী জলনির্ভর জীবন আর দেবী দুর্গার মাতৃরূপের অপূর্ব সমন্বয়ে এবার সেজেছে গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের পূজামণ্ডপ। শারদোৎসবে বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্কের এ আয়োজনের প্রতিপাদ্য ‘জলজ’।

‘জলজ’ শব্দের সহজ অর্থ, জল থেকে যার জন্ম। ঋগ্বেদের নাসদীয় সূক্তে সৃষ্টির পূর্বে সর্বত্র আচ্ছন্ন অসীম জলরাশি কিংবা পুরাণের কারণসমুদ্রের রূপককে শিল্পের ভাষায় তুলে এনেছেন মণ্ডপের স্থপতি অমিতি কুন্ডু ও শিল্পী-গবেষক পার্থপ্রতিম সাহা।

মণ্ডপজুড়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে পরিবেশবান্ধব লোকজ কারুশিল্প। বাঁশ, বেত, চট ও প্রাকৃতিক তন্তুর মতো ৩৬ ধরনের স্বতন্ত্র উপাদান দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে পুরো অবয়ব। চারটি ভিন্ন প্রজাতির বাঁশ ও পাঁচ প্রকার বুননশৈলীর নিপুণ ব্যবহারে তৈরি হয়েছে ঢেউখেলানো বক্ররেখীয় কাঠামো, যা দেখলে মনে হয়, থমকে থাকা এক বিশাল জলতরঙ্গ।

উপকূলীয় চট্টগ্রাম থেকে সাতক্ষীরা পর্যন্ত অঞ্চলে ব্যবহৃত ১৩ ধরনের বিলুপ্তপ্রায় বাঁশের চাই বা দুয়াইর ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে মণ্ডপের ছাদের চাঁদোয়ায়। বহু অভিজ্ঞ কারিগরের সাহায্যে সংগৃহীত ও নির্মিত এসব অনুষঙ্গ বিলুপ্তপ্রায় গ্রামীণ ঐতিহ্যকে নতুন করে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরছে।

মণ্ডপের প্রধান আকর্ষণ গতিশীল শিল্পকলা বা ‘কাইনেটিক আর্ট’। সম্মুখভাগে স্থাপিত ২৪ ফুট ব্যাসের একটি বৃত্তাকার কাঠামো অবিরাম ঘুরে চলেছে। সেই ঘূর্ণায়মান কাঠামোর ভেতরের জলপ্রপাতসদৃশ অবিরত জলপর্দা ভেদ করে দেখা মিলবে দেবী দুর্গার সৌম্য প্রতিমা।

দর্শকের চলার পথটিকে সাজানো হয়েছে এক অনুভবের যাত্রা হিসেবে। প্রবেশদ্বারে রয়েছে বিমূর্ত পদ্মরূপী স্থাপত্য, যা পেরিয়ে ভেতরের দিকে এগোলে দেখা মিলবে শামুক ও শঙ্খের আদলে তৈরি শৈল্পিক অবয়ব। মাথার ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে এক কল্পিত জলাধার, যা দর্শককে নিমেষেই নিয়ে যাবে এক মায়াবী জলজ জগতের গভীরে।

‘জলজ’ কেবল ধর্মীয় উদযাপনে সীমাবদ্ধ নেই, স্পর্শ করেছে বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের বার্তাকেও। নদী দখল, পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে জলকে রক্ষা করা মানেই জীবমণ্ডল ও ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা, এই সামাজিক দায়বদ্ধতাই স্থান পেয়েছে আয়োজনে।

জল, পদ্ম, ঐতিহ্য ও প্রকৃতির এই অপূর্ব মেলবন্ধন শুধু ভক্তির অর্ঘ্য নয়; আধুনিকতা, ঐতিহ্য ও পরিবেশ ভাবনার সমন্বয়ে এটি যেন রূপ নিয়েছে চলমান এক জীবন্ত শিল্পগ্রন্থে।

স্থপতি অমিতি কুন্ডু বলেছেন, ‘জলজ’ বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি, জলনির্ভর জীবন, স্থানীয় কারুশিল্প ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সম্মিলিত প্রকাশ।

স্থানীয় উপকরণ ও মানুষের সৃজনশীলতায় গড়ে ওঠা এই মণ্ডপে ফাউন্ডেশন তুলে ধরতে চেয়েছে বাংলাদেশের নিজস্ব শিল্পভাষা-যেখানে ভক্তি ও শিল্প, ঐতিহ্য ও সমকালীনতা, প্রকৃতি ও মানুষের জীবন একসূত্রে গাঁথা।

গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন মণ্ডপ ও প্রকৌশল বিষয়ক উপ-পরিষদের এই আহ্বায়ক আরও বলেন, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই গুলশান-বনানী পূজা ফাউন্ডেশন স্থানীয় কারিগরদের সম্পৃক্ত করা ও আর্ট ক্যাম্পের মতো ব্যতিক্রমী আয়োজন করে আসছে। পাশাপাশি শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় আশপাশের পথশিশুদের অংশগ্রহণ ও স্বীকৃতির মাধ্যমে শিল্পচর্চাকে সবার জন্য উন্মুক্ত করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

শুক্রবার সকালে মন্দিরে মন্দিরে কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজার মাধ্যমে শুরু হয়েছে এবারের দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা, যার সমাপন হবে বুধবার বিজয়া দশমীতে; প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে।