‘গৃহহীন’ শব্দটি অতীতে পরিণত করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

গৃহহীনদের ঘর দিতে বাংলাদেশের নজির বিশ্বকে জানালেন শেখ হাসিনা।

গোলাম মুজতবা ধ্রুব, নিউ ইয়র্ক থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 21 Sept 2022, 03:57 PM
Updated : 21 Sept 2022, 03:57 PM

আবাসনহীনতাকে ‘অভিশাপ’ উল্লেখ করে কেউ গৃহহীন থাকবে না এমন বিশ্ব গড়তে রাষ্ট্রনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশে গৃহহীনদের আশ্রয় দিতে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে বুধবার নিউ ইয়র্কে ‘টেকসই আবাসনের উপর আয়োজিত ইউএন-হ্যাবিটেটের উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠকে এ আহ্বান জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য আবাসন প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। নাগরিকদের জন্য টেকসই ও বাসযোগ্য আবাসন নিশ্চিত করার বিষয়টি আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব।

“আমাদের এমন একটি বিশ্ব গড়তে কাজ করে যেতে হবে যেখানে গৃহহীন থাকার বিষয়টি অতীত হয়ে যাবে।”

তিনি বলেন, “একটি দেশে প্রতিটি নাগরিকের জন্য আবাসন একটি মৌলিক চাহিদা এবং এটা অন্যান্য চাহিদা পূরণের সুযোগ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে আমরা আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বাসা শুধু একটি থাকার জায়গা নয়। আবাসনের নিরাপত্তা একজন মানুষের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনকে তরান্বিত করে এবং তাদেরকে মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য উৎসাহিত করে।

“বাংলাদেশে জমি ও ঘরের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি আমরা শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠানোর সফল ব্যবস্থা করেছি। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কাছাকাছি কমিউনিটি ক্লিনিকের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা হয়েছে এবং শিশু ও নারীরা বিনামূল্যে ৩০ ধরনের ওষুধ পাচ্ছে।”

বসতবাড়িতে বাগান করা, হাঁস-মুরগি পালন ও মাছ উৎপাদনসহ নারীদের নেতৃত্বে ক্ষুদ্র ও ছোট উদ্যোক্তা তৈরির কার্যক্রম চলমান জানিয়ে তিনি বলেন, “এই পদক্ষেপগুলো উদ্যোগটিকে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব করেছে।”

উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্ব গৃহহীনতার অভিশাপে ভুগছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, আমাদের সক্ষমতা দিয়েই আমরা এই অভিশাপ দূর করতে পারি। এখানে জড়ো হওয়া আমাদের সব বন্ধু এবং অংশীদারেরা এটি বাস্তবায়নের জন্য একটি শক্তিশালী অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে পারে।”

তিনি বলেন, “দ্য নিউ আরবান এজেন্ডা (নগরায়নের নতুন বিষয়াদি) সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের একটি দরকারি রূপরেখা দিয়েছে। অংশীদার দেশগুলোতে এই এজেন্ডা বাস্তবায়নে আমাদের অবশ্যই ইউএন-হ্যাবিটাটের কার্যক্রমকে সমর্থন দিতে হবে। বাংলাদেশ এই বিষয়গুলো সামনে আনতে নিউ ইয়র্কে গ্রুপ অব ফ্রেন্ডস-এর সঙ্গে কাজ করে যাবে।”

সাড়ে ১৬ কোটি জনসংখ্যার ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশ সফলভাবে গৃহহীনতার সমস্যা সমাধানে কাজ করছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা ভূমিহীন-গৃহহীনদের বিনামূল্যে জমিসহ ঘর করে দিচ্ছি। আমি আজ এখানে এসেছি সারা দেশে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য টেকসই ঘর নির্মাণে আমার সাফল্যের অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে।”

তিনি বলেন, “এক সময় বাংলাদেশে একটি সাধারণ দৃশ্য ছিল যে গৃহহীন মানুষ কর্মসংস্থান এবং বাসস্থানের সন্ধানে শহরে ছুটে আসত। কিন্তু ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’ চালু হওয়ার পর এ প্রবণতা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ওই নাগরিকেরা এখন তাদের নিজ নিজ এলাকায় কর্মসংস্থান করছে।”

আওয়ামী লীগ সরকার দেশে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন’ মডেল অনুসরণ করছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “মডেলটি এমন একটি সামগ্রিক পদ্ধতি নিশ্চিত করে যার মধ্যদিয়ে একজন পুনর্বাসিত ব্যক্তি অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে আত্ম-নির্ভরশীল এবং আত্ম-মর্যাদাবোধ সম্পন্ন হয়ে উঠতে পারেন। প্রকল্পটি স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের জন্য জমি এবং বাড়ির মালিকানার সমান অংশ নিশ্চিত করে।”

শেখ হাসিনা বলেন, “বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভূমিহীন, গৃহহীনদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, ১৯৭২ সালে দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় এসব বিষয় অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করার মাধ্যমে।

“জাতির পিতার সেই লক্ষ্য সামনে রেখে, ১৯৯৭ সালে গৃহহীন-ভূমিহীনদের আবাসন নিশ্চিত করতে আমরা ‘আশ্রয়ণ’ নামে একটি প্রকল্প চালু করি। গত দুই দশকে আমার সরকার সবার জন্য বিনামূল্যে আবাসন নিশ্চিত করতে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়েছে।”

শুধু শহর নয়, দেশের প্রতিটি গ্রাম, মফস্বল, জেলা, দ্বীপ ও পার্বত্য অঞ্চলে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে সরকার প্রধান বলেন, “জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে এই প্রয়াস আরও বড় মর্যাদায় পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে।

“শুধু গত দুই বছরেই আমরা দুই লাখ বাড়ি তৈরি করেছি যেখানে প্রায় দশ লাখ গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। আমার ১৮ বছরের প্রধানমন্ত্রীত্বের সময়ে আমার সরকার ৫ লাখের বেশি ঘর নির্মাণ করে তাকে ৩৫ লাখ গৃহহীনকে ঠাঁই করে দিয়েছে এবং বর্তমানে আরও ৪০ হাজার ঘর নির্মাণের কাজ চলছে।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই প্রকল্পের অধীনে প্রতিটি পরিবার ৪০০ বর্গফুট আয়তনের একটি পাকা বাড়ির মালিকানা পাচ্ছে, যেখানে দুটি শোবার ঘর, একটি দীর্ঘ বারান্দা, একটি রান্নাঘর এবং একটি স্যানিটারি ল্যাট্রিন রয়েছে।

“আমরা প্রত্যেক বাড়িতে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সংযোগ, নিরাপদ পানীয় জল সরবরাহ করছি। আমরা বিনামূল্যে পর্যাপ্ত বসতভিটা এলাকাসহ বাড়ি ও জমি দিচ্ছি - যা পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য।”

বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ভূমিহীন-গৃহহীন মানুষ এই আবাসন ব্যবস্থার সুবিধাভোগী জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “আমরা জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি। আমরা এরইমধ্যে কক্সবাজারে ১৩৯টি বহুতল ভবনে ৫ হাজার জলবায়ু-উদ্বাস্তু পরিবারের থাকার ব্যবস্থা করেছি।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক