Published : 07 Sep 2022, 01:32 PM
দেশের রেলে বড় বিজ্ঞাপন হয়ে এক দশক আগে এসেছিল ডেমু ট্রেন; তবে ছয়-সাত বছর আগে সেগুলো গিয়েছিল অচল হয়ে।
রেলের প্রকৌশলীরা সেগুলো সারাতেও পারছিলেন না, আবার চীন থেকে সারিয়ে আনার কাজটিও ছিল ব্যয় বহুল। ফলে যখন পড়ে পড়ে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছিল ট্রেনগুলো, তখন আশার আলো দেখালো দেশেরই কয়েকজন প্রকৌশলী।
তাদের কৃতিত্বে এই ট্রেনের সবগুলো শিগগিরই আবার চলবে বলে আশা করছে রেল কর্তৃপক্ষ।
স্বল্প দূরত্বে চলাচল উপযোগী আধুনিক প্রযুক্তির ২০টি ডিজেল-ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট বা ডেমু ট্রেন চীন থেকে আমদানি করেছিল সরকার।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশে প্রথম ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে এই ট্রেন চলাচল শুরু হয়। তবে ২০২০ সালের মধ্যে একের পর এক নষ্ট হয়ে যায় সেগুলো।
চীন থেকে আনা নির্দিষ্ট সফটওয়্যারে পরিচালিত এসব ট্রেন সংস্কার করাই ছিল রেলওয়ে প্রকৌশলীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
উৎপাদনকারী চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মেরামত জটিলতা ও অতিরিক্ত খরচ এবং বাংলাদেশ রেলওয়েতে ইলেকট্রনিক্স এবং ইলেকট্রিকাল বিষয়গুলোতে ‘দক্ষ লোকের অভাবে’ বেগ পোহাতে হয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে।
এখন বাংলাদেশি প্রকৌশলীরাই সেই চ্যালেঞ্জ নিয়ে দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর শেষ পর্যন্ত দেশীয় প্রযুক্তিতে ছয়টি ডেমু ট্রেন সচল করতে সক্ষম হয়েছেন তারা।
বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) মঞ্জুর উল আলম চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “২০১৩ সালে আমরা চীন থেকে যে ডেমু ট্রেনগুলো এনেছিলাম, সেগুলোর ইঞ্জিন আমাদের দেশের ট্রেনের ইঞ্জিনের মতো চলে না। এই ট্রেনের দেখভালের জন্য যে ওয়ার্কশপ তৈরি করা দরকার ছিল, সেটাও আমাদের ছিল না, যে কারণে ট্রেনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ সঠিকভাবে করা সম্ভব হয়নি।
“প্রতিটা ডেমুতে ৩০ থেকে ৩৫টি মডিউল ছিল। এই মডিউলগুলো বাজারে পাওয়া যায় না। আর পাওয়া গেলেও সেটি লাগানোর জন্য যে প্রশিক্ষণ দরকার, সেটি আমাদের কারও ছিল না। প্রযুক্তি নতুন হওয়ায় বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের জন্য বুঝে উঠতে পারাও কঠিন ছিল।”
চীনা ডেমু ট্রেন আর কিনবে না সরকার
মঞ্জুর উল আলম জানান, ‘কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত’ ওই ট্রেনগুলো এক ধরনের বিশেষ সফটওয়্যার দিয়ে পরিচালিত হত। এর মডিউল বিকল হলে নতুন মডিউলের সঙ্গে সঙ্গে সফটওয়্যার সেটআপ দেওয়ারও দরকার হত। একটি ডেমুতে আছে ৩০ থেকে ৩৫টি মডিউল, যার একেকটির দাম ছিল প্রায় সাত লাখ টাকা।
চীনা প্রকৌশলীরা প্রযুক্তি হস্তান্তর না করায় একটার পর একটা ট্রেন বিকল হতে থাকে জানিয়ে মঞ্জুর আলম বলেন, এগুলো মেরামতে চীনা প্রতিষ্ঠান ক্রয়মূল্যের কাছাকাছি অর্থ দাবি করে। খরচের কথা বিবেচনায় উৎপাদনকারী চীনা প্রতিষ্ঠানের কাছে এগুলো মেরামত করা হয়নি।
“পরবর্তীতে সেগুলোর দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয় আমাকে। দায়িত্ব নেওয়ার পর মাথায় চিন্তা এলো- বাংলাদেশে যে প্রযুক্তি, সরঞ্জাম ও লোকবল আছে, তা দিয়ে আমরা ট্রেনগুলোর প্রযুক্তি বদলে দিতে পারি।”

ট্রেন মেরামতে দেশের প্রকৌশলী দলের নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও আণবিক শক্তি কমিশনের সাবেক কর্মকর্তা প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বেশ কিছুদিন গবেষণা করে উদ্ভাবন করে ফেলেন ডেমু চালানোর প্রযুক্তি। ব্যয়বহুল মডিউল সরিয়ে বসানো হয় দুটি কন্ট্রোলার ও ইনভার্টার।
ডেমু ট্রেনের সাথে সাধারণ ট্রেনের পার্থক্য সম্পর্কে আসাদুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ডেমু ট্রেনগুলোর যন্ত্রাংশগুলো নিয়ন্ত্রিত হত সফটওয়্যার দ্বারা, তবে ট্রেনগুলো চলত চালকের সাহায্যেই। ডিজিটাল সফটওয়্যার বেইজড যন্ত্রাংশগুলো পরিবর্তন করে সেখানে বর্তমানে এনালগ পদ্ধতি ব্যবহার করে সংস্কার করা হয়েছে।
চীনা প্রযুক্তি ছাড়া ডেমু ট্রেন মেরামত দেশি প্রকৌশলীদের
মেরামত কাজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে রেল কর্মকর্তা মঞ্জুর আলম বলেন, “ভালো কাজের অনেক ধরনের সমালোচনা হয়, অনেক বাধা আসে। নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করার জন্য পার্বতীপুরের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলকে বেছে নিয়েছি।
“বুয়েটের এক্সপার্ট আসাদুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আমাদের সঙ্গে কাজ করতে রাজি হন। তারপর আমরা একটা টিম গঠন করে কাজ শুরু করি।”
ডেমু ট্রেনগুলো মেরামতের কাজ পার্বতীপুরের ডিজেল ওয়ার্কশপসহ চট্টগ্রাম ও ঢাকার ওয়ার্কশপগুলোতে করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
মঞ্জুর আলম বলেন, “গত দেড় বছরে আমরা অনেককিছু বদলেছি, অনেক নতুন যন্ত্রাংশ লাগিয়েছি, অনেক কিছু বাদ দিয়েছি। ইঞ্জিনে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। আমরা শুধু ইলেকট্রনিক্স সাইড বদলে দিয়েছি। তারপর চূড়ান্তভাবে আমরা ট্রেনগুলো মেরামত করতে সক্ষম হয়েছি। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার আমরা ট্রায়ালও দিয়েছিলাম।”
ছয়টির মধ্যে একটি পুরোপুরি বদলে নতুন করে ডেমু ট্রেন তৈরি করা হয়েছে এবং বাকি পাঁচটি সেটে আগের প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশের আংশিক পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
“এক্ষেত্রে চীন আমাদের কাছে মেরামতের জন্য যে টাকা দাবি করেছিল, তার চেয়েও অনেক সাশ্রয়ে আমরা ট্রেনগুলো মেরামত করেছি।”
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলে এভাবে বাকি ট্রেনগুলোও মেরামত করে নিয়মিতভাবে চালু করা যাবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে সংস্কার করা ডেমু ট্রেনগুলো গড়ে ৬৫ কিলোমিটার গতিতে চলাচল করছে। সংস্কারের পর বর্তমানে ঢাকায় দুটি এবং চট্টগ্রামে তিনটি ডেমু ট্রেন চলাচল করছে। সম্প্রতি পার্বতীপুর থেকে লালমনিরহাট সেকশন পর্যন্ত আরও একটি ডেমু ট্রেন পরীক্ষামূলকভাবে চলাচল করেছে। প্রায় সাতশ যাত্রী নিয়ে ৬৫ কিলোমিটার গতিতে চলেছে ট্রেনটি।
ডেমু ট্রেন সচল করার কাজে নিয়োজিত প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান বলেন, “পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন প্রযুক্তি একেকটা নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলে। কিছু প্রযুক্তি একাধিক দেশে একই রকম থাকলেও দাম ও মানের দিক থেকে পার্থক্য থাকে।
“চীন থেকে আনা ডেমু ট্রেনগুলোর মান ভালোই ছিল। কিন্তু এগুলো এখানে বেশিদিন চালানো সম্ভব হয়নি; এর কারণ হল, আমাদের রেলওয়েতে ইলেকট্রনিক্স এবং ইলেকট্রিকাল বিষয়গুলো জানে এমন দক্ষ লোক নেই।”
তিনি বলেন, “ডেমু ট্রেনগুলোর দেখভালের দায়িত্ব যতদিন চাইনিজ কোম্পানির ছিল, ততদিন ট্রেনগুলো চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। পরবর্তী দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় আমাদের প্রকৌশলীরা এগুলোর মেরামতের বিষয়গুলো তাদের কাছ থেকে বুঝে নেয়নি।”

নতুন সংস্কারের পর সহসাই ট্রেনগুলোর আবার অচল হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানান এই প্রকৌশলী।
“নতুন করে যেসব যন্ত্রাংশ স্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো দিয়ে আমাদের অন্যান্য ট্রেনগুলোও চলে, তাই আশা করা যায়, পরবর্তীতে কোনো সমস্যা হবে না। আগামী ৪০ বছর সহজেই ট্রেনগুলো চলতে পারবে। এর মধ্যে যদি মেরামতের প্রয়োজন হয়, সেটিও খুব অল্প খরচে এবং সহজেই মেরামত করা সম্ভব হবে।”
ডেমু ট্রেনকে নতুন রূপ দেওয়া এই প্রকৌশলী জানান, এই মেরামতের কাজে পার্বতীপুর ডিজেল ওয়ার্কশপে তিনজন প্রকৌশলীর একটি দল ছিল। তার সঙ্গে ছিলেন রফিকুল ইসলাম ও আজিম বিশ্বাস নামের দুজন।
“আমাদের উদ্দেশ্য ছিল পরীক্ষা করা। আগে ট্রেনগুলোতে কী কী যন্ত্রাংশ ছিল, সেগুলোর পরিবর্তে কী কী নতুন করে সংযোজন করতে হবে এবং সেগুলো চলবে কিনা, সেটি গবেষণা করাই আমাদের কাজ ছিল।”
মেরামতে খরচের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে আসাদুজ্জামান বলেন, “আমরা অনেক যন্ত্রাংশই নতুন করে কিনেছি, যেগুলো আমাদের আর কাজে লাগেনি। সব মিলিয়ে একেকটি ট্রেনের মেরামতে ব্যয় হয়েছে ৫০ লাখ টাকার মতো, যা আমদানি করা হলে কয়েক গুণ বেশি টাকা ব্যয় হত।
“যদি বাকি ট্রেনগুলো মেরামতের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে কোনোটির জন্য ২০ লাখ, কোনোটির জন্য ৮০ লাখ টাকাও খরচ হতে পারে। মেরামতে সময় লাগবে দুই মাস।”
চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে পার্বতীপুরের ডিজেল ওয়ার্কশপে মেরামতের কাজ শুরু হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, “কাজ তো আর টানা চলেনি। মাঝে মাঝে বন্ধও ছিল। মার্চ থেকে এই পর্যন্ত সব মিলিয়ে আমরা আনুমানিক ৭০ দিনের মতো কাজ করে পার্বতীপুর রুটের এই ট্রেন মেরামত করতে সক্ষম হয়েছি।”
২০১৩ সালে প্রায় ৪২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০টি ডেমু ট্রেন কেনে সরকার। এই প্রকল্পে মোট খরচ হয়েছিল ৬৫৫ কোটি টাকা। মেয়াদকাল ২০ বছর হলেও সাত বছরেই তা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
এই ট্রেনগুলো ঢাকা-কুমিল্লা, আখাউড়া-সিলেট, লালমনিরহাট-পার্বতীপর, লাকসাম-চট্টগ্রাম, লাকসাম-চাঁদপুর, ঢাকা-গাজীপুর, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ, দিনাজপুর-পঞ্চগড় রুটে চলাচল করত।
এদিকে মেরামত করা ট্রেনগুলো কয়েকদিনের মধ্যেই নির্দিষ্ট রুটে নামানোর কথা জানিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। দিনাজপুর রুটে চলবে দুটি ডেমু ট্রেন। চট্টগ্রাম-কুমিল্লা রুটেও নিয়মিত চলবে তিনটি ট্রেন।
তবে নতুনভাবে সংস্কার হয়ে আসা ডেমু আগের মতো যাত্রী পরিবহন করতে পারবে না। এটি সর্বোচ্চ এক হাজার যাত্রী নিয়ে চলাচল করতে পারবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।