জাবিতে যথপোযুক্ত শাস্তি না হওয়ায় ধর্ষণ থামছে না: রামেন্দু মজুমদার

“ঢাবির প্রতিটি সিন্ডিকেট সভায় একটা না একটা বিষয় আসে যে, শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীদের যৌন হয়রানি। এর চেয়ে লজ্জার আর কী আছে?” বলেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 8 Feb 2024, 02:18 PM
Updated : 8 Feb 2024, 02:18 PM

ধর্ষণের ঘটনায় জড়িতদের যথপোযুক্ত শাস্তি না হওয়ায় এই অপরাধ থামানো যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা রামেন্দু মজুমদার।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দলবেঁধে ধর্ষণের যে অভিযোগ উঠেছে, সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেছেন, “এটা নতুন নয়, দীর্ঘদিন ধরে সেখানে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। যথপোযুক্ত শাস্তি হয়নি বলেই এটা থামানো যাচ্ছে না।”

বৃহস্পতিবার বিকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের একুশের অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি একথা বলেন।

গত শনিবার রাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বামীকে মীর মশাররফ হোসেন হলে আটকে রেখে এক গৃহবধূকে দলবেঁধে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে ছাত্রলীগের এক নেতা এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। এর প্রতিবাদে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। ফিরে আসে আড়াই দশক আগে ‘ধর্ষণের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ আন্দোলনের স্মৃতি।

১৯৯৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জসীম উদ্দীন মানিকের বিরুদ্ধে ‘ধর্ষণের সেঞ্চুরির’ অভিযোগ উঠেছিল। পরে ছাত্র-শিক্ষকদের সম্মিলিত আন্দোলনের মুখে মানিক ও তার সহযোগীরা ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য হয়। সেই ঘটনা সারাদেশে আলোড়ন তোলে।

রামেন্দু মজুমদার বলেন, “একটা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যখন এ ধরনের ঘটনা ঘটে, তখন লজ্জায় আমাদের মাথা অবনত হয়। আমরা ধিক্কার জানাই এবং আশু শাস্তি কামনা করছি, যাতে দ্রুত বিচার করা হয়। কেবল দল থেকে বা হল থেকে বহিষ্কার করলে সেটা যথেষ্ট নয়, একটা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি আমরা চাই।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, “আমাদের প্রতি সভায় একটা না একটা বিষয় আসে যে, শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীদের যৌন হয়রানি। এর চেয়ে লজ্জার আর কী আছে?

“যখন প্রমাণিত হয়, তখনও সেই শিক্ষকের জন্য তার দলের লোকেরা তদবির করে। আমরা বলতে চাই, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের কাজ আমরা কোনোভাবে বরদাশত করব না।”

অন্যায়ের প্রতিবাদ করার জন্য বর্তমানে শিল্পচর্চা যথেষ্ট নয় মন্তব্য করে রামেন্দু মজুমদার বলেন, “আমাদের দুর্ভাগ্য যে, স্বাধীনতা অর্জনের ৫২ বছর পরেও বাংলাদেশের মধ্যে নানা বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য বহু রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব খুব সোচ্চার। তবে বর্তমানে আমাদের সংসদে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কোনো সদস্য নেই; এটা আমাদের জন্য স্বস্তির ব্যাপার।

“কিন্তু চারদিকে যে অন্যায় হচ্ছে, তার প্রতিবাদ করতে হবে। একুশ মানে মাথা নত না করা, একুশ হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে প্রতিবাদী হওয়া। দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যখনই অন্যায় হয়েছে, আমরা সংস্কৃতিকর্মীরা প্রতিবাদে মুখর হয়েছি।”

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, “আজকে সমাজে নারী নির্যাতন দুটি কারণে হচ্ছে। একটা হলো মূল্যবোধের অবক্ষয়। কিছু দুর্বৃত্ত নারী নির্যাতন করছে। তাদের পরাভূত করতে হলে আইনের কঠোর প্রয়োগ যেমন দরকার, তেমনই সমাজের মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার লড়াই সংস্কৃতি কর্মীদের সোচ্চার হতে হবে।

“আরেকটি কারণে নারী নির্যাতন ঘটে, সেটা হলো সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। আমাদের দেশে যতদিন সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রভাব থাকবে, ততদিন পর্যন্ত অসাম্প্রদায়িক সমাজ বিনির্মাণের লড়াই আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে। রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতামুক্ত করতে হবে। সমাজের সর্বস্তরের সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে হবে।”

অনুষ্ঠানে তিনি আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যতীত সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষায় প্রচলনের আহ্বান জানান।

এর আগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জোটের নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও অতিথিদের পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মধ্য দিয়ে অমর একুশের অনুষ্ঠানমালার শুরু হয়। পরে শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

এরপর গণসংগীত সমন্বয় পরিষদের শিল্পীরা জাতীয় সংগীত ও একুশের গান পরিবেশন করেন। এরপর গান, আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশন করা হয়।

জোটের নেতারা জানান, ৮ থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এবং ১৭ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রায়ের বাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ মঞ্চে অমর একুশের অনুষ্ঠানমালা আয়োজন করা হবে। প্রতিদিন বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে অনুষ্ঠান শুরু হবে। এতে গান, আবৃত্তি, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলনসহ বহুমাত্রিক বিষয়ভিত্তিক পথনাটক, নাচসহ নানা আয়োজন থাকবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক আহকাম উল্লাহ। এছাড়া বক্তব্য রাখেন একুশের অনুষ্ঠানমালার আহ্বায়ক নাট্যজন ঝুনা চৌধুরী।