বসন্ত-ভালোবাসায় রঙিন বইমেলায় বিক্রিতে ভাটা

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় সংশ্লিষ্টরা জানান, এদিন লোকজন স্টলে এসে বই হাতে ছবি তুলেছেন, কিন্তু বই কেনেননি।

পাভেল রহমানবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 14 Feb 2024, 03:52 PM
Updated : 14 Feb 2024, 03:52 PM

ভোরের কৃষ্ণচূড়া রঙিন হোক আর না হোক, বইমেলা মেতেছিল হরেক রঙে। পহেলা ফাল্গুন আর ভালোবাসা দিবসকে ঘিরে বুধবার মেলা ছিল প্রাণবন্ত।

কর্মদিবস হওয়ার কারণে উপচেপড়া ভিড় না থাকলেও লোক সমাগম নজর কেড়েছে নানা রঙের সাজে। তবে প্রত্যাশিত বিক্রি হয়নি বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন স্টলের বিক্রয়কর্মীরা।

এদিন মেলায় আগতদের অধিকাংশই ছিলেন বাহারী পোশাকে। বিভিন্ন প্রকাশনীর স্টলে বিক্রয়কর্মীদেরও দেখা গেছে শাড়ি আর পাঞ্জাবিতে।

এবার কর্মদিবসে পহেলা ফাল্গুন হওয়ায় কর্মজীবীদের বড় একটা অংশই মেলায় আসেননি। মেলায় আগতদের মধ্যে তরুণদের সংখ্যাই ছিল বেশি।

মেলায় অনেক যুগলকেই দেখা গেছে ঘুরে বেড়াতে, ছবি তুলতে। আবার পরিবারের সদস্যদের নিয়েও এসেছিলেন অনেকে। আড্ডা, ঘুরে বেড়ানোতে মুখর ছিল পহেলা ফাল্গুনের বইমেলা।

মোহাম্মদপুর থেকে স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে মেলায় এসেছিলেন শামীমুল হক।

তিনি বলেন, “মেয়ের আবদার মেটাতেই মেলায় আসা। ফাল্গুনে ঘুরতে হবে বলে মেয়ে আবদার করেছে। কোথায় যাব, তখন মেয়ে বলল বইমেলায়। এজন্যই আসা।”

মেলায় অনেকে ঘুরতে এলেও পহেলা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবসকে ঘিরে যে প্রত্যাশা ছিল, সে পরিমাণ বিক্রি হয়নি বলে জানিয়েছেন অন্তত ১০টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কর্মীরা।

বেঙ্গল পাবলিকেশন্সের বিক্রয় ও বিপণন নির্বাহী ইলিয়াস আহমেদ বলেন, “আজকে বিক্রি ভালো হয়নি। অন্যদের অবস্থা বলতে পারব না, তবে আমাদের এখানে ভালো বিক্রি হয়নি।”

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় সংশ্লিষ্টরা জানান, এদিন লোকজন স্টলে এসে বই হাতে ছবি তুলেছেন, কিন্তু বই কেনেননি।

মেলা যেন হয়ে উঠেছে ফটোশুট জোন- এমন মন্তব্য করে পার্ল প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মী রুবেল বলেন, “বই হাতে নিয়ে ছবি তোলা হচ্ছে যে পরিমাণ, সে পরিমাণ বিক্রি তো নেই।”

গত শুক্রবার মেলায় যে পরিমাণ লোক সমাগম ছিল, তার তুলনায় পহেলা ফাল্গুনে ভিড় কমই হয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।

ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) এর সিনিয়র বিক্রয় ও বিপণন নির্বাহী মোসাদ্দেক বলেন, “বিগত দু-তিন বছরের বিক্রির পরিসংখ্যান নিয়ে আমাদের স্টলে আজকে একটা টার্গেট ছিল, সেটা পূরণ হয়নি। পহেলা ফাল্গুনে গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম বই বিক্রি হয়েছে বলে আমার মনে হয়।”

মেলায় সন্ধ্যায় আজব প্রকাশের সামনে হয় হক ফারুক আহমেদের কবিতার বই 'সবুজ সন্ন্যাস কাল' এর প্রকাশনা উৎসব। এতে সংগীতশিল্পী জয় শাহরিয়ার, শানারেই দেবী শানুসহ লেখক-সাহিত্যিকদের অনেককে দেখা যায়। এটি লেখকের তৃতীয় কবিতার বই।

মেলায় এসেছে কতজন?

মেলা প্রাঙ্গণে লোক সমাগম কম দেখা গেলেও বইমেলার প্রবেশদ্বারের হিসাব বলছে, বুধবার প্রবেশদ্বারের আর্চওয়ে পার হয়েছেন ৩ লাখ ১৩ হাজার মানুষ।

এ সংখ্যাটি এদিন মেলায় আসা যে কাউকে অবাক করে দেবে। কারণ মেলা প্রাঙ্গণে এত ভিড় এদিন দেখা যায়নি।

গত শুক্র ও শনিবার মেলায় ছিল দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। প্রবেশদ্বারের হিসাব অনুযায়ী শুক্রবার মেলায় প্রবেশ করেন ১ লাখ ৬৯ হাজার ৫১৩ জন। আর শনিবার এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১৫ হাজার ৪৯৪ জন।

তাহলে পহেলা ফাল্গুনে আর্চওয়ে এত লোকের প্রবেশ দেখাচ্ছে কেন?

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব কে এম মুজাহিদুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "সংখ্যাটি আমাদেরও অবাক করেছে। পরে আমি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, এদিন সরস্বতী পূজা থাকার কারণে সকাল থেকেই গেট দিয়ে প্রচুর লোকজন মন্দিরে প্রবেশে করেছেন। মেলা বিকেল থেকে শুরু হলেও মন্দিরে লোকজন এসেছিলেন সকাল থেকে।

“সে হিসাবে ৩ লাখের বেশি লোক প্রবেশদ্বারের আর্চওয়েতে ধরা পড়েছে। কিন্তু তাদের সবাই বইমেলায় অবস্থান করেননি। যার জন্য মেলা প্রাঙ্গণে ভিড় কম দেখা গেছে।"

বুধবার ছিল বইমেলার চতুর্দশ দিন। মেলা শুরু হয় বিকেল ৩টায় এবং চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। মেলা পরিচালনা কমিটির জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, এদিন নতুন বই এসেছে ৯১টি।

এদিন ‘লেখক বলছি’ মঞ্চের অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন লেখক ও কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব, কবি শাহেদ কায়েস, কথাসাহিত্যিক মাজহার সরকার এবং তানভীর তারেক।  

বিকাল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ভাষাসংগ্রামী গাজীউল হক শীর্ষক আলোচনা। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রাফাত আলম মিশু। আলোচনায় অংশ নেন সুজাতা হক এবং মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আবদুল মান্নান চৌধুরী।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি মারুফুল ইসলাম, মাসুদুজ্জামান, ইসমত শিল্পী এবং সাহেদ মন্তাজ। আবৃত্তি পরিবেশন করেন মাসকুর-এ-সাত্তার কল্লোল, মাসুদুজ্জামান এবং চৈতালী হালদার।

পুঁথিপাঠ করেন মো. শহীদ এবং মো. কুদ্দুস মিয়া। সংগীত পরিবেশন করেন রফিকুল আলম, খুরশীদ আলম, মামুনুল হক সিদ্দিক, মুর্শিদুদ্দীন আহম্মদ, মো. রেজওয়ানুল হক, কাজী মুয়ীদ শাহরিয়ার সিরাজ জয়, আঞ্জুমান আরা শিমুল, চম্পা বণিক, শরণ বড়ুয়া এবং অনন্যা আচার্য।

বৃহস্পতিবার বইমেলার ১৫তম দিন। মেলা শুরু হবে বিকাল ৩টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত।

বিকাল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘স্মরণ: আবদুল হালিম বয়াতি’ শীর্ষক আলোচনা। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন জোবায়ের আবদুল্লাহ। আলোচনায় অংশ নেবেন শফিকুর রহমান চৌধুরী এবং মো. নিশানে হালিম। সভাপতিত্ব করবেন সাইদুর রহমান বয়াতি।