তাহসিফের মৃত্যু: মামলা হয়নি ৩ দিনেও, দীপের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত?
পিবিআই বলছে, লাশ পেয়েছে নৌপুলিশ, মামলার সিদ্ধান্ত তারা নেবে; আর নৌপুলিশ বলছে, ঘটনাস্থল উত্তরখান, ফলে সিদ্ধান্তও সেখানকার।
বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরির লাশ উদ্ধারের তিন দিনেও কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এখন পর্যন্ত মামলার ‘ঝামেলায়’ যেতে না চাওয়া পরিবারের কেউ ‘পুলিশের অনুরোধেও’ সাড়া দেননি। এ অবস্থায় মামলা করবে কে, সে বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি পুলিশের কোনো ইউনিট।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া তাহসিফের ‘বন্ধুস্থানীয় ছোটভাই’ আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে নিয়েই কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এই দীপ বৃহস্পতিবার সংবাদমাধ্যমে ঘটনার দিনের বিষয়ে একরকম বর্ণনা দিয়েছিলেন, পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) হেফাজতে গিয়ে দেন ভিন্ন তথ্য। যেটিকে তার ‘ঘটনা আড়ালের চেষ্টা’ হিসেবেই মনে করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
এমনকি মামলা না হওয়ায় ‘কনক্লুসিভ’ কোন পদক্ষেপ নিতে না পারার কথাও বলেছেন তারা।
পিবিআই ঢাকা মেট্রোর (উত্তর) অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, “দীপ আমাদের হেফাজতেই আছে, নৌ-পুলিশ কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তাদের কাছে হস্তান্তর করে দিব। অন্যথায় মুচলেকা রেখে তাকে তার অভিভাবকের জিম্মায় দিয়ে দিব।”
মামলা করতে নিজের ‘অনীহার’ কথা জানিয়েছেন তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। তবে তার আশা, রাষ্ট্র নিজে থেকেই ঘটনার রহস্য উদঘাটন করবে।
তিনি বলেন, “মামলার বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেব। মামলার কেন প্রয়োজন হবে? সরকার নিশ্চই এ বিষয়ে দায়িত্ববোধের পরিচয় দেবে এবং অত্যন্ত আন্তরিক হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। মামলা মানেই আমাদের দেশে একটা ঝামেলা, কোর্টে দৌড়াদৌড়ি। কে চায় এরকম ঝামেলার মধ্যে পড়তে?”
মামলা করার বিষয়ে পরিবারের অনীহার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ কী সিদ্ধান্ত নেবে জানতে চাইলে পিবিআইয়ের কর্মকর্তা এনায়েত বলেন, “নৌপুলিশ লাশ প্রথম উদঘাটন করছেন, তারা একটা সিদ্ধান্ত নেবে।
“পরিবার যদি একান্তই না আগায়ে আসে, যেহেতু নৌ-পুলিশ উদঘাটন করেছে, তারাই হয়তো একটা অপমৃত্যুর মামলা করবে।”
তবে নৌ-পুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন বলেছেন, তারা লাশ উদ্ধার করলেও ঘটনাস্থল উত্তরখান থানা হওয়ায় তারাই এখন ‘বিষয়টি দেখবেন’।
আর ডিএমপির উত্তরখান থানা পুলিশ বলছে, তারা এখনো এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। তাদের তরফে একাধিকবার পরিবারকে মামলা করতে বলা হলেও তারা এখনো ‘সাড়া দেয়নি’।
উত্তরখান থানার ওসি হাবিবুর রহমান বলেন, “এখনো কোনো মামলা হয়নি। পরিবারের কেউ আমাদের কাছে আসেননি।”
পরিবারের তরফে মামলা না করলে পুলিশ কী করবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের তরফে যে সিদ্ধান্ত আসবে, তারা তেমনই ব্যবস্থা নেবেন। তবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা আসেনি।
সাধারণত নিহত ব্যক্তির বাবা, মা, ভাই, বোন, স্বামী, স্ত্রী বা অন্য যেকোনো নিকটাত্মীয় বা পরিবারের সদস্যরা থানায় মামলা করেন।
বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, যেকোনো আমলযোগ্য অপরাধে পরিবারের সদস্যদের বাইরেও ওই অপরাধের বিষয়ে অবগত যেকোনো তৃতীয় ব্যক্তি, প্রতিবেশী বা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীও থানায় মামলা করতে পারেন।
একান্তই যদি পরিবার মামলা না করে বা কোনো কারণে সম্ভব না হয়, সেক্ষেত্রে সাধারণত সংবাদ পেয়ে বা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুলিশ নিজ উদ্যোগে নিয়মিত মামলা করতে পারেন।
তবে কোনো লাশের পরিচয় পাওয়া গেলে ‘বাধ্যবাধকতা না থাকলেও’ সাধারণত তাদের পরিবারের পক্ষেই মামলাটি করতে বলা হয় বলে মন্তব্য করেন পিবিআইয়ের অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান।
তিনি বলেন, কাউকে না পাওয়া গেলে পুলিশ ‘বাধ্য হয়ে’ অন্য কাউকে দিয়ে বা নিজেরাই বাদী হয়ে মামলা করেন।
“যার ভাই বা যার সন্তান, তার প্রতি দরদ বেশি নিশ্চয়ই বাইরের কারো থাকবে না। তিনি স্বাক্ষী উপস্থাপন করবেন, ঘটনার বিবরণ দেবেন, দলিল উপস্থাপন করবেন, কবে কী ঘটনা, সেসব তথ্য তুলে ধরবেন। তিনি তার ভাই বা সন্তানের জন্য আদালতে ন্যয়বিচার চাইবেন। আর বাইরের লোক বাদী হলে তো তারা কেউ কাউকে হয়তো চেনেই না।”
তিনি আরও বলেন, পরিবারের কারো আগ্রহ না থাকলে মামলা বেশির ভাগ সময়ই ‘হালকা হওয়ার’ সম্ভাবনা থাকে। ধার করা লোক দিয়ে মামলা করলে সেগুলো সাধারণত ‘টেকে না’। কারণ ওই অচেনা বাদী আপনজনের মতো গুরুত্ব দিতে পারেন না।
ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ‘ভিডিও ধারণকারী’ হিসেবে আলোচনায় থাকা তাহসিফ সাউরির ভাসমান লাশ বুধবার বিকালে তুরাগের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। তিনি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ‘দীপের ডাকে’ বাসার নিচে নামেন এবং নিজের বাইক নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন।
দীপ বৃহস্পতিবার বলেছিলেন, রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে রাতের খাবার খেয়ে উত্তরা হাউজবিল্ডিং এলাকা থেকে তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান।
রাতেই মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পিবিআই। তার দেওয়া তথ্যেই শুক্রবার সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের বাইকটি উদ্ধার করা হয়।
‘মাদকস্পট’ হিসেবে পরিচিত ওই এলাকায় মধ্যরাতে তাহসিফের সঙ্গে যাওয়ার কথা স্বীকারও করে দীপ। একপর্যায়ে তাকে নিয়ে শুক্রবার টঙ্গীর ওই এলাকা পরিদর্শনে যান পিবিআই কর্মকর্তারা।
দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, মঙ্গলবার গভীর রাতে তারা সেখানে অবস্থান করার সময় পুলিশের একটি দল তাদের ধাওয়া দেয়। এ সময় দীপ তুরাগ তীরে স্থাপিত বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পেছনে গিয়ে লুকান। আর তাহসিফ নদে গিয়ে ঝাঁপ দেন। এরপর ‘সুযোগ বুঝে’ দীপ সেখান থেকে সরে যান এবং রাত আড়াইটার দিকে নিজের বাসায় ফেরেন।
গভীর রাতে দুজন কেন সেখানে অবস্থান করছিলেন, জানতে চাইলে পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা বিষয়টি জেনেছি, এটা একটু সেনসিটিভ। আরেকটু ক্রসচেক করে নিই।”
অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, “মামলা হলে আমরা কনক্লুসিভ কথাবার্তা বলব, কারণ মামলা ঘিরেই সবকিছু আবর্তিত হয়।
“এখন পর্যন্ত বাইকটি উদ্ধার হয়েছে। এর বাইরে কীভাবে কী হয়েছে, তারা কোথায় বা কেন গিয়েছে, আরও কে কোথায় আছে, সবগুলো বিষয় যাচাই পর্যায়ে আছে। সব তথ্য ভেরিফায়েড করে পরে জানাব।”
