আদাবরে জমি নিয়ে বিরোধে ভবনে হামলা, গেটে চাপাতির কোপ
এর আগে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর ভবনটি দখল করেছিলেন স্থানীয় এক ব্যক্তি। এবারও তার লোকজনই হামলা করেছে বলে বাড়ির মালিকের অভিযোগ।
রাজধানীর আদাবরে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে একটি ভবন দখলের চেষ্টায় চাপাতি ও রামদা নিয়ে হামলার অভিযোগ উঠেছে।
ভবনটির প্রধান ফটক, জানালা ও নিরাপত্তার জন্য লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর করেছে ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল।
শনিবার সকাল সোয়া ৬টার দিকে আদাবরের শেখেরটেক এলাকার শ্যামলী হাউজিংয়ের প্রথম প্রকল্পের ৬ নম্বর সড়কে এ ঘটনা ঘটে।
ভবন মালিকের স্বজনদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর একইভাবে ভবনটি দখল করেছিলেন স্থানীয় খোরশেদ আলম নামের এক ব্যক্তি।
আদালত ও পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে আইনি প্রক্রিয়া শেষে গত ১২ মার্চ মালিকরা ভবনটির দখল ফিরে পান। কয়েক মাসের মাথায় আবারও হামলার ঘটনা ঘটল।
ভবন মালিকের স্বজনদের অভিযোগ, হামলার সময় জাতীয় জরুরি সেবার ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেও তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশি সহায়তা পাননি তারা। প্রায় তিন ঘণ্টা পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এ ঘটনায় আদাবর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা, ভুক্তভোগী ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে এ ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন আদাবরের বিএনপি নেতা আবুল কালাম ওরফে টিভি কালাম এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য নাসির আহমেদ।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে নাসির আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যার বাড়ি দখল করা হয়েছে তাকে তো আমি চিনিই না। আমার ব্যাপারে এলাকায় খোঁজ-খবর নিয়েন, আমি কেমন লোক।”
আবুল কালাম ওরফে টিভি কালামের বক্তব্য জানতে ফোন করা হলে তিনি ধরেননি।
আর খোরশেদ আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
গেইটে চাপাতির কোপ
যে ভবনটিতে হামলা হয়েছে, সেটি ১০ কাঠা জমির ওপর নির্মিত। একই নকশায় সেখানে রয়েছে দুটি আটতলা ভবন।
রোববার ওই ভবনে গেলে প্রধান ফটকে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। আঘাতে লোহার গেইটের বিভিন্ন অংশ কেটে গেছে। নিরাপত্তাকর্মীদের কক্ষের জানালা ও ভবনের নিরাপত্তায় লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোও ভাঙচুর করা হয়েছে।
ভবন মালিকের ভাতিজা রাজিব আহমেদ রাজু বলেন, “সকাল সোয়া ৬টার দিকে চার-পাঁচজন তরুণ গেটে নক করে। তারা কথা বলার জন্য গেট খুলতে বলে। বাড়ির ম্যানেজার ফাহাদ বাইরে থেকে কথা বলতে বললে তারা নানা ধরনের হুমকি দিতে থাকে।”
রাজু বলেন, “তারা বলতে থাকে, ‘টাকা দে! বাড়িতে থাকিস, টাকা দিস না। বের হ।’ এ কথা বলতে বলতে চাপাতি, রামদা দিয়ে গেটে এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করে।”
হামলার ওই ঘটনা ধরা পড়েছে অন্য একটি সিসিটিভি ক্যামেরায়। সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
ভিডিওতে প্রথমে মুখে মাস্ক পরা একজনকে মোবাইল ফোনে কথা বলতে দেখা যায়। পরে অস্ত্র হাতে একদল তরুণ এসে একে একে ওই বাড়ির তিনটি সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর করে। এরপর জানালা ও প্রধান ফটকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাতে দেখা যায় তাদের।
রাজু বলেন, ১৯৯৯ সালে তার বড় চাচা জমিটি কেনেন। ২০০৩ সালে টাঙ্গাইলে সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান। অবিবাহিত থাকায় পরে তার ছোট ভাই আমিনুর রহমান জমিটির মালিক হন। এরপর সেখানে দুটি ভবন নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়া হয়।
রাজুর অভিযোগ, খোরশেদ আলম কয়েক বছর ধরে জমিটির মালিকানা দাবি করে আসছেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মানুষের জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, খোরশেদ বিরোধপূর্ণ জমির কাগজ কিনে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ব্যবহার করে দখলের চেষ্টা করেন। শেখেরটেকের এই ভবনও একইভাবে তিনি প্রায় দেড় বছর দখলে রেখেছিলেন।
শনিবারের হামলার ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি নেতা আবুল কালাম ও নাসির আহমেদের নাম আসছে স্থানীয়দের কথা। তাদের বিরুদ্ধে হামলাকারীদের ভাড়া করা এবং ঘটনাস্থলের আশপাশে অবস্থান করার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে নাসির এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ভবনটির ম্যানেজার মো. ফাহাদ বলেন, ২০২৪ সালের ১৭ অগাস্ট খোরশেদ আলম ভবনটি দখল করে নেন। সেদিনও অস্ত্র হাতে একদল তরুণ এসে নিরাপত্তাকর্মীদের বের করে দিয়ে ভবনটির নিয়ন্ত্রণ নেয়।
তিনি বলেন, ওই ঘটনায় আদাবর থানায় অভিযোগ দিয়েও কোনো সুরাহা না পেয়ে তারা আদালতে মামলা করেন। আদালত আদাবর থানাকে তদন্তের নির্দেশ দেয়। পরে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করে।
ফাহাদের ভাষ্য, পিবিআই প্রায় চার মাস তদন্ত করে অভিযোগপত্র দেয়। তবে অভিযোগপত্রে কী রয়েছে, তা তারা জানেন না।
তিনি বলেন, গত ১২ মার্চ তারা ভবনটির দখল ফিরে পান। এর কয়েক মাসের মাথায় আবারও হামলা চালানো হল।
“আমরা এখন কী করব, কার কাছে সাহায্য চাইব, বুঝতে পারছি না,” বলেন ফাহাদ।
ফাহাদ বলেন, শনিবার সকালে ভবনের সামনে কয়েকজনকে পায়চারি করতে দেখে তাদের সন্দেহ হয়। তারা দরজা বন্ধ করে ভেতরে অবস্থান করছিলেন। সকাল ৬টা ৪১ মিনিটে হামলা শুরু হলে সঙ্গে সঙ্গে ৯৯৯-এ ফোন করেন।
তার অভিযোগ, প্রায় তিন ঘণ্টা পর সকাল সোয়া ১০টার দিকে আদাবর থানার এএসআই মনির হোসেন ঘটনাস্থলে আসেন। ততক্ষণে হামলাকারীরা চলে যায়।
‘মিছিল-মিটিং নিয়ে ব্যস্ত ছিল পুলিশ’
দেরিতে ঘটনাস্থলে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আদাবর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম বলেন, “আমরা সেদিন মিটিং-মিছিল আটকানো নিয়ে বিজি ছিলাম। আমাদের কাছে যখন ওই ভবনে হামলার খবর আসে তখন আমাদের সবগুলো পার্টি মিছিল ও মিটিংয়ের জন্য রাস্তায় ছিল।
“তারপর ফোর্স পাঠানোর জন্য বার্তা দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু এরই মধ্যে খবর আসে হামলাকারীরা দুই-তিন মিনিট পরেই চলে গেছে। তাই সব কিছু গুছিয়ে (মিছিল-মিটিংয়ের ঝামেলা শেষ হলে) সেখানে ফোর্স পাঠানো হয়।”
ওসি বলেন, “এটি একটি বিরোধপূর্ণ জায়গা। এর আগেও কয়েকবার দখল-বেদখল হয়েছে। একবার বর্তমানে যার দখলে আছে সেও একইভাবে দখলে নিয়েছে, আবার তার থেকে অন্য পক্ষ এভাবেই দখল নিয়েছিল এবং আবার দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছে।”
হামলার দিনেই ভবন মালিক আমিনুর রহমানের তাজমহল রোডের বাসায় মোহাম্মদপুর থানার একটি নোটিস পাঠানো হয়। নোটিসে একটি অভিযোগের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ২৭ সেপ্টেম্বর তাকে মোহাম্মদপুর থানায় হাজির হতে বলা হয়। নোটিসে মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) আব্দুল্লাহ আল মামুনের সই রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে এসি মামুনকে ফোন করলেও তিনি ধরেননি। তবে আদাবর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম বলেন, “আমাদের এসি স্যার তাদের এসব বিরোধ নিয়ে কয়েকবার নোটিস দিয়ে ডেকেছিলেন। তারা কোনো পক্ষই তার নোটিসে সাড়া দেননি।”
তবে আমিনুরের ভাতিজা রাজুর দাবি, তার চাচা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। হামলার পর তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে আদাবর থানাকে জানানো হয়েছে।
রাজুর অভিযোগ, হামলার পর আদাবর থানায় ওসির কাছে অভিযোগ দিতে গেলে তিনি ‘বিরক্তি’ প্রকাশ করেন এবং ‘তাচ্ছিল্যের সুরে’ কথা বলেন।
“আগে আমরা পুলিশের সহযোগিতা পেয়েছিলাম। গতকাল ঘটনার পর ওসির কাছে অভিযোগ দিতে গেলে তিনি বলেন, ‘আমার সময় নেই। ডিউটি অফিসারের কাছে রেখে যান।’”
তবে আদাবর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম বলেন, “মামলার যে বাদী, তিনি সরাসরি থানায় উপস্থিত ছিলেন না। উনার পক্ষে কেউ মামলা করতে পারেন, এতে কোনো সমস্যা নেই। তবে বাদী হিসেবে এজাহারে যার স্বাক্ষর রয়েছে, তিনি যদি থানায় উপস্থিত না থাকেন, তাহলে সেটা নিয়ে ঝামেলা হতে পারে। এজন্য মামলা রেকর্ড হতে সময় নেওয়া হয়েছিল।”
