Published : 16 Oct 2025, 12:36 PM
মোটা বেতনের লোভ দেখিয়ে বাংলাদেশি নারীদের চীনে পাচারের ঘটনায় চীনা দূতাবাস ও ইমিগ্রেশনের ‘যোগসাজশ’ রয়েছে বলে সন্দেহ করছে র্যাব।
র্যাব-৪ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুব আলম বলছেন, পাচারের শিকার নারীদের পাসপোর্টসহ কাগজপত্র তৈরি, চীনা দূতাবাস থেকে ভিসা সংগ্রহ এমনকি বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পেরিয়ে চীন যাত্রার পুরো প্রক্রিয়াটি ‘বেশ দ্রুত গতিতে’ সম্পন্ন হয় ।
ভিসা সংগ্রহ থেকে শুরু করে ইমিগ্রেশন পার হওয়া সব জায়গায় মানবপাচারকারী চক্রটির সদস্যরা ‘প্রভাব খাটাচ্ছে’ বলে এ র্যাব কর্মকর্তার ভাষ্য।
বাংলাদেশি নারীদের চীনে পাচার করে ‘যৌনপেশায় বাধ্য করার’ অভিযোগে বুধবার একটি চক্রের চারজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় র্যাব। পরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এক সংবাদ সম্মেলন করে এ বিষয় বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুব।
গ্রেপ্তাররা হলেন- আব্বাস মোল্লা (৩৬), জাহিদুল ইসলাম ওরফে বাবু (৩১),মিনার সরদার (৩০) ও রিপন শেখ (২৮)।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুব বলেন, “পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্পে এখন অনেক চীনা নাগরিক কাজ করছেন, পাশাপাশি দেশের পোশাক শিল্পেও অনেক চীনা নাগরিক কাজ করেন। তাদের লিংকেই গত সাত আট বছর ধরে এই কাজটি চলছিল।
“এই সময়ের মধ্যে তারা অর্ধ শতাধিক মেয়েকে চীনে পাচার করেছে। আমরা এখন পর্যন্ত এ ধরনের চার-পাঁচটি চক্রের সন্ধান পেয়েছি। একটি চক্র ধরা পড়েছে, বাকিদের বিষয়েও কাজ করবে র্যাব।”
এই র্যাব কর্মকর্তা বলেন, “যারা আমাদের এখানে গ্রেপ্তার, তাদের ভাষ্যমতে অ্যাম্বেসি, ইমিগ্রেশন, ভিসা, পুরোটাই সিস্টেমে প্রসেসড। ভিসা পাইতেও টাইম বেশি লাগে না, দুই চার দিনের মধ্যে ভিসা পেয়ে যায়। ইমিগ্রেশনও ওদের ক্লিয়ার করা। ইমিগ্রেশনেও সহজে বের হয়ে যেতে পারে, যেহেতু স্পাউস ভিসা করা। ডকুমেন্টেশনগুলো ওরা এখানে পুরো একটা চ্যানেলাইজ সিস্টেমের মাধ্যমে করে নিয়েছে।”
ঢাকার একজন ট্র্যাভেল এজেন্ট নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সাধারণত চীনের ভিসা পেতে পাঁচ থেকে সাত কর্মদিবস সময় লাগে। তবে ক্যান্টন ফেয়ারের সময় এই সময়টা বেড়ে যায়। আর ‘এক্সপ্রেস’ হিসেবে দিলে চার থেকে পাঁচদিনের মধ্যে ভিসা পাওয়া যায়।
র্যাব কর্মকর্তা মাহাবুব বলছেন, চীনা নাগরিকদের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে চীন দূতাবাস থেকে স্পাউস ভিসায় বাংলাদেশি নারীদের চীনে পাঠাত চক্রটি।
“আবার লক্ষাধিক টাকা বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অন্য কোনো সিস্টেমেও তাদের চায়নাতে পাঠানো হয়। সাধারণত তিন থেকে চারজন মেয়েকে একসাথে পাঠানো হয়।
“চীনের বিমানবন্দরে নামার পর তাদেরকে আলাদা আলাদা জায়গায় নিয়ে যাওয়া হত। এরপর তাদের আটকে রেখে নির্যাতন করে বিভিন্ন অসামাজিক কাজে বাধ্য করা হত। তাদের পাসপোর্টও ছিনিয়ে নেওয়া হত।”
এরকম একজন ভিকটিম গত ৩১ সেপ্টেম্বর শাহ আলী থানায় একটি মামলা করেন চারজনের বিরুদ্ধে। ওই চারজনের মধ্যে তিনজনকে মঙ্গলবার রাতে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকেগ্রেপ্তার করে র্যাব।
র্যাব কর্মকর্তা মাহাবুব বলেন, “এ মামলার আরেক আসামি একজন নারী, যিনি ওই চক্রের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য বলে প্রতীয়মান। তবে তাকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি। এই নারী চীনাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন।”
নথি প্রক্রিয়ার কাজ যে দ্রুত গতিতে হয়, সে কথা বলতে গিয়ে শাহ আলী থানায় হওয়া মামলার উদাহরণ দেন তিনি।
“এই মামলার বাদীর আগে কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র ছিল না। চকলেট সদস্যরা তার একটি ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে, তার ভিত্তিতে পাসপোর্ট করায়। সেই পাসপোর্ট এর নম্বর দিয়ে ম্যারেজ সার্টিফিকেট তৈরি করে তিন দিনের মধ্যে চীনা দূতাবাস থেকে ভিসা সংগ্রহ করে।
“এরপর ১৯ জুন ওই তরুণী চীনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। সেখানে নির্যাতন সইতে না পেরে অগাস্টে তিনি কৌশলে দেশে ফিরে আসতে সক্ষম হন।”
মাহাবুব বলেন, “মামলার বাদী চক্রটিকে এটা বোঝাতে সক্ষম হন যে তিনি বাংলাদেশে এলে পরে আরো দুই তিনজন মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে চীনে ফিরে যাবেন। এই শর্ত দিয়েই তিনি বাংলাদেশে আসতে পারেন। তার খালাতো বোনটি এখনো চীনে আটকে রয়েছে।”
একজন মেয়েকে পাঠালে সাড়ে তিন লাখ টাকা পাওয়া যেত জানিয়ে র্যাব কর্মকর্তা মাহাবুব বলেন, “চক্রের হোতা চীনা নাগরিক বা বাংলাদেশি যেই থাকুক না কেন, তিনি ওই টাকাটি দিতেন। এরমধ্যে দেড় লাখ টাকা যে মেয়েটি যাচ্ছে তাকে এবং দেড় লাখ টাকা সেই দালাল পেতেন, যে তাকে খুঁজে এনেছে। বাকি ৫০ হাজার টাকা তারা ভাগাভাগি করে নিত।”
এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য চীনা দূতাবাস ও অভিবাসন পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
র্যাব কর্মকর্তা বলছেন, "(শাহ আলী থানার) এই ঘটনার ভিকটিম এবং মামলার বাদী আমাদের কাছে অভিযোগ দেয় যে, সে এবং তার খালাতো বোন একটি নারী পাচারকারী চক্রের শিকার হয়ে চায়নায় পাচার হয়েছিলেন এবং তার খালাতো বোন এখনও চায়নাতে বন্দি অবস্থায় আছে এবং প্রতিনিয়ত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে।”
লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুব আলম, এই ঘটনার ভুক্তভোগী এবং মামলার বাদী একটি বিউটি পার্লারে কাজ করতেন।
“কয়েক মাস আগে ফেইসবুকে ভিকটিম ও তার খালাত বোনের সঙ্গে এই মামলার অন্যতম আসামী বাবুর সাথে পরিচয় হয়। ভিকটিম বাবুর কাছে ঢাকায় একটি ভালো কাজের সন্ধান চায়। বাবু তাদেরকে জানায় চায়নাতে আর্কষণীয় বেতনে চাকরি আছে, বিশেষ করে যারা পার্লারের কাজ জানে এবং তাদেরকে চায়নায় আকর্ষণীয় বেতনে কাজের প্রস্তাব দেয়। তারা এই প্রস্তাবে রাজি হলে, তাদেরকে ঢাকায় নিয়ে আসে এবং এই চক্রের মূলহোতা আব্বাস এর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।
“আব্বাস তাদেরকে আশ্বাস দেয়, চায়নাতে ভালো কাজ আছে এবং তাদেরকে সেখানে পাঠানো যাবে। তাদেরকে সেখানে ১ লাখ টাকা বেতনে কাজ দেওয়া হবে এবং সেখানে পৌঁছানোর পরপরই ১০ লাখ টাকা দেওয়া হবে। এই প্রলোভন দেখানোর পর তাদেরকে পাসপোর্ট ও ভিসা করে সিলভি নামের এক মেয়ের মাধ্যমে চায়নাতে পাঠিয়ে দেয়।"
র্যাব কর্মকর্তা বলেন, "পরবর্তীতে তারা চায়নায় যাওয়ার পর তাদেরকে বিউটি পার্লারে কাজ না দিয়ে তাদের দুই বোনকে আলাদা দুইটি বাসায় রেখে চক্রের সদস্যরা জোর করে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করে। এক পর্যায়ে এই মামলার বাদী বাদী নির্যাতন সহ্য না করতে পেরে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং তাকে বিভিন্ন শর্তের ভিত্তিতে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়।”
বাংলাদেশে ফিরে এসে ওই নারী আসামিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলেন যে, চীনে আটকে থাকা তার বোনকেও ফিরিয়ে আনতে হবে। তখন আসামি আব্বাস বাদীর বোনকে উদ্ধার করে নিয়ে আসার আশ্বাস দিয়ে ওই নারীকে ‘অনৈতিক কাজে বাধ্য করে’ বলে জানিয়েছেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুব আলম।
তিনি বলেন, “পরবর্তীতে ভিকটিম বুঝতে পারে সে মিথ্যা আশ্বাসে ক্রমাগত নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তখন ভিকটিম থানায় একটি মামলা রুজু করে এবং র্যাবের কাছেও সহযোগিতা চায়।"
পরে র্যাব মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গা থেকে চারজনকে গ্রেপ্তার করে। তারা হলেন- আব্বাস মোল্লা (৩৬), জাহিদুল ইসলাম ওরফে বাবু (৩১),মিনার সরদার (৩০) ও রিপন শেখ (২৮)।