আশুলিয়ায় দম্পতি খুন: পুলিশের দাবি বিয়ের আগে প্রেমের জের, গ্রেপ্তার ১
গ্রেপ্তার হৃদয় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
সভারের আশুলিয়ায় এক পোশাকশ্রমিক, তার গর্ভের সন্তান ও স্বামীর অর্ধগলিত লাশ উদ্ধারের ঘটনার রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তাদের দাবি, নিহত নাজমা খাতুনের বিয়ের আগেই এক ব্যক্তির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক থাকার জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
আশুলিয়ার মধ্য জামগড়া এলাকার একটি বাসা থেকে গত ৫ সেপ্টেম্বর তিন লাশ উদ্ধারের ঘটনায় এরইমধ্যে মনিরুজ্জামান হৃদয় নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পিবিআইয়ের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন হৃদয়। তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন।
আশুলিয়ায় ওই তিন হত্যা নিয়ে রাজধানীর উত্তরায় সংস্থার ঢাকা জেলা কার্যালয়ে বুধবার সংবাদ সম্মেলন করে পিবিআই। সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, হৃদয়ের সঙ্গে নিহত নাজমার বিয়ের আগে থেকেই প্রেম ও শারীরিক সম্পর্ক ছিল। বিষয়টি জানতে পেরে নাজমার স্বামী আলমগীর কবিরের সঙ্গে হৃদয়ের বিরোধ তৈরি হয়। নাজমা ও আলমগীরের সঙ্গে হৃদয়ের ওই বিরোধের জেরেই এ হত্যার ঘটনা ঘটে।
আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় গত ৫ সেপ্টেম্বর হযরত আলীর বাড়ির দ্বিতীয় তলার একটি ঘর থেকে পচা দুর্গন্ধ বের হলে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। পরে আশুলিয়া থানা পুলিশ তালাবদ্ধ ঘরটির দরজা খুলে ভেতর থেকে পোশাকশ্রমিক নাজমা খাতুন (৩৯), তার স্বামী আলমগীর কবির (৪৫) ও তাদের সদ্য ভূমিষ্ঠ একটি নবজাতকের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে।
মরদেহগুলোর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ। এ ঘটনায় নাজমার বড় বোন শাপলা বেগম ওইদিনই অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানায় মামলা করেন। পিবিআই বলছে, ঘটনার পর থেকেই তারা ছায়া তদন্ত শুরু করে। মামলাটি সিডিউলভুক্ত হওয়ায় ৮ সেপ্টেম্বর স্ব-উদ্যোগে তদন্তভার গ্রহণ করে তারা। মামলাটি তদন্ত করছেন এসআই আনিসুর রহমান।
পিবিআইয়ের তদন্ত এবং হৃদয়ের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পর্যালোচনা করে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তরকারি বিক্রেতা হৃদয় ছিলেন আলমগীরের পূর্বপরিচিত। আলমগীর ছিলেন বেকার। তাদের বাসার দূরত্ব ছিল প্রায় ১০ মিনিটের হাঁটার পথ।
সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ বলেন, “বিয়ের আগে থেকেই নাজমার সঙ্গে হৃদয়ের প্রেম ও শারীরিক সম্পর্ক ছিল। বিষয়টি জানার পর আলমগীরের সঙ্গে হৃদয়ের বিরোধ তৈরি হয়। ঘটনার দিন নাজমা ও আলমগীর হৃদয়ের বাসায় গিয়ে তাকে নিজেদের বাসায় নিয়ে আসেন। সেখানে আগের সম্পর্কের বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে আলমগীর হৃদয়কে মারধর করতে থাকেন। এ সময় নাজমাও ঝাঁটা দিয়ে হৃদয়কে আঘাত করেন বলে জবানবন্দিতে বলা হয়েছে। পরে হৃদয়ও ধাক্কাধাক্কি ও ঘুষি দিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে তিনি নাজমার পেটে লাথি মারলে তিনি পড়ে যান।
“এতে নাজমার পেটে আঘাত লাগে এবং তার গর্ভের সন্তান মারা যায় বলে হৃদয় জবানবন্দিতে দাবি করেছেন। এরপর আলমগীর খুন্তি ও পাইপ দিয়ে হৃদয়কে আঘাত করেন। তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে হৃদয় আলমগীরের গলায় গামছা পেঁচিয়ে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। পরে মরদেহগুলো খাটের ওপর রেখে হৃদয় ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। এ সময় নাজমার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, সিম, অফিসের পরিচয়পত্র ও পার্সও নিয়ে যান বলে তদন্তে পাওয়া গেছে।”
হৃদয়কে গ্রেপ্তারের বিষয়ে পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ বলেন, “পিবিআইয়ের একটি দল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ৮ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকা থেকে হৃদয়কে গ্রেপ্তার করে। পরে তার বাসা থেকে নাজমার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, সিম, অফিসের পরিচয়পত্র ও পার্স উদ্ধার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে হৃদয় ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। তাকে আদালতে পাঠানো হলে হৃদয় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
“ঘটনার সংবাদ পাওয়ার পর থেকেই রহস্য উদঘাটনে ছায়া তদন্ত অব্যাহত রাখি। ভুক্তভোগীদের আগে কার সঙ্গে সম্পর্ক ও চলাফেরা ছিল, তা নির্ণয় করে যাচাই করা হয়। সর্বশেষ ঘটনার রহস্য উন্মোচন করে আসামিকে গ্রেপ্তার ও আলামত উদ্ধার করতে সক্ষম হই। ঘটনার সঙ্গে অন্য কোনো ব্যক্তি জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
পিবিআই বলছে, হৃদয়ের বিরুদ্ধে এর আগে আশুলিয়া থানায় করা একটি হত্যা মামলায়ও সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালের ওই মামলায় ২০২৩ সালে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। বর্তমান মামলায় গ্রেপ্তার হৃদয়কে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তার দেওয়া জবানবন্দি, উদ্ধার করা আলামত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনসহ অন্যান্য তথ্য যাচাই চলছে।
