Published : 02 Aug 2026, 12:36 AM
উত্তরায় র্যাব পরিচালিত ‘গোপন বন্দিশালার’ যেসব স্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ’গুম’ ও বেআইনিভাবে আটক ব্যক্তিদের রাখা ও ‘নির্যাতন’ করা হত বলে অভিযোগ উঠেছে সেগুলো পরিদর্শন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা।
পরিদর্শনের সময় র্যাব-১ সদরদপ্তরের পেছনের কথিত এ ‘আয়নাঘর’ বা টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেল পরিদর্শনের সময় প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে বিচারকদের আনুমানিক আড়াই ফুট বাই তিন ফুটের কথিত ‘ডেথ সেলগুলো’ দেখানো হয়।
ভুক্তভোগীদের বরাতে ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম এসব ‘ডেথ সেল’ পরিদর্শন দলকে দেখিয়ে বলেন, বছরের পর বছর ‘গুম’ হওয়া ব্যক্তিদের এসব সেলে আটকে রেখে নির্যাতন করা হত; যেখানে একজন মানুষের স্বাভাবিকভাবে লম্বা হয়ে শোয়ারও কোনো সুযোগ ছিল না।
শনিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল সরেজমিনে কথিত এ ‘আয়নাঘর’ বা টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেল পরিদর্শন করেন।
এসময় ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন প্রধান কৌঁসুলির নেতৃত্বাধীন প্রসিকিউশন দলের সদস্য, তদন্ত সংস্থার সদস্য, ‘মায়ের ডাক’ এর সমন্বয়ক সংসদ সদস্য সানজিদা তুলি, ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার, আসামিপক্ষের আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী, ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতিনিধি ও সংবাদমাধ্যম কর্মীরা।
প্রধান কৌঁসুলি বলেন, একই মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে আগামী সপ্তাহে ঢাকা সেনানিবাসে ডিজিএফআই কার্যালয়ে থাকা আরেকটি কথিত ‘গোপন বন্দিশালা’ বিচারিকভাবে পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য, তদন্তে পাওয়া আলামত এবং ঘটনাস্থলের বাস্তব অবস্থার মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা এ ‘বন্দিশালা’ পরিদর্শন করেন।
প্রসিকিউশনের সদস্যরা বলেন, চলমান মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ মূল্যায়নের অংশ হিসেবে এ পর্যবেক্ষণ বিবেচনায় আসতে পারে।
পরিদর্শনের সময় বিচারকরা ভবনটির নিচতলার কথিত ডেথ সেল, সাধারণ সেল, দ্বিতীয় তলার সাউন্ডপ্রুফ জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ ও ভিআইপি কক্ষ ঘুরে দেখেন। তদন্তে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন আলামতও একে একে তাদের দেখানো হয়।
প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল বলেন, "অনেকেই আয়নাঘরকে রূপকথা মনে করতে পারেন, কিন্তু এটি বাস্তব ছিল। তদন্তে পাওয়া তথ্য ও ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্যের সঙ্গে সরেজমিনে দেখা স্থাপনার মিল পাওয়া গেছে।"
পরিদর্শন দলের সঙ্গে ঘুরে দেখা যায়, এ বন্দিশালার ‘ডেথ সেলগুলোর’ প্রতিটির আয়তন আনুমানিক আড়াই ফুট বাই তিন ফুট। একই কক্ষের ভেতরে রয়েছে আড়াই ফুট বাই এক ফুটের একটি বাথরুম, যেটির কোনো দেয়াল বা বিভাজন নেই।
চব্বিশের আন্দোলন আওয়ামী সরকার পতনের পর আলামত গোপনের চেষ্টা হয়েছিল দাবি করে প্রসিকিউশন দলের প্রসিকিউটর এস এম তাসমিরুল ইসলাম বলেন, “তদন্তকারীরা প্রথমবার এসে সাক্ষীদের বর্ণনায় তুলে ধরা কয়েকটি কক্ষ খুঁজে পাননি। দেয়াল তুলে আলামত গোপনের চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে ময়লা-আবর্জনা সরিয়ে দেয়াল অপসারণ করলে ২৯টি কক্ষ এবং নিচতলার কথিত ডেথ সেলের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।”
তিনি বলেন, “আলামত নষ্ট বা গোপনের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন, তাদের ভূমিকাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।”
র্যাবের এ বন্দিশালা ঘুরে এই প্রসিকিউটর বলেন, দোতলা ভবনটিতে মোট ২৯টি কক্ষের মধ্যে নিচতলায় রয়েছে ৬ থেকে ৭টি ছোট কথিত ডেথ সেল, ১০টি সাধারণ সেল এবং একটি কমন টয়লেট পাওয়া গেছে।
ভবনটির দ্বিতীয় তলার ইন্টারগেশন সেলের কক্ষগুলো দেখিয়ে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এগুলো ছিল মূল জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ। দেয়ালের ভেতরে বিভিন্ন স্তরের উপকরণ ব্যবহার করে কক্ষগুলোকে সাউন্ডপ্রুফ (শব্দনিরোধক) করা হয়েছিল।
তার দাবি, ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহের পর থেকে আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এসব কক্ষ ব্যবহৃত হত এবং সেখানে ওই বিদ্রোহ-সংক্রান্ত একটি মানচিত্রও পাওয়া গেছে।
প্রসিকিউটর ফারুক আহমেদ বলেন, বন্দিদের ঝুলিয়ে নির্যাতনের জন্য দ্বিতীয় তলার কয়েকটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষের ছাদে বড় হুক লাগানো ছিল। সেখান থেকে উদ্ধার হওয়া বেল্টসহ বিভিন্ন সামগ্রী তদন্তের স্বার্থে জব্দ করা হয়েছে।
র্যাবের সাত কর্মকর্তার পক্ষের আইনজীবী তাবারক হোসেন পরিদর্শনকালে বলেন, “টিএফআই কোনো নির্দিষ্ট ভবন নয়; এটি বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত একটি টাস্কফোর্স। অভিযোগপত্র অনুযায়ী আটক ব্যক্তিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আদালত বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে সোপর্দ করা হয়েছে।"
আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী এ বি এম হামিদুল মেসবাহ বলেন, "কাউকে নির্ধারিত সময়ে আদালতে হাজির করতে ব্যর্থ হওয়া একটি প্রশাসনিক বিষয় হতে পারে, একে মানবতাবিরোধী অপরাধ বলা যায় না।"
স্টেট ডিফেন্সের আইনজীবী আমির হোসেন দাবি করেন, পরিদর্শন করা স্থাপনাটি পরবর্তী সময়ে নির্মিতও হয়ে থাকতে পারে।
র্যাবের টিএফআই সেলে গুম, বেআইনি আটক, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগে বর্তমান ও সাবেক ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।
র্যাবের 'গোপন বন্দিশালা' ঘুরে দেখলেন ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিরা