Published : 03 Sep 2026, 12:38 AM
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের আগ্রহ এবং এ নিয়ে আলোচনার মধ্যে বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমি জাহানাবাদি।
বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে অবগত থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আপনাদের সরকার একটি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখছে। তাই এই সিদ্ধান্ত (মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের আগ্রহ) আমাদের চিন্তিত করে না। আমরা মক্কা চুক্তিকে ইরানের বিরুদ্ধে মনে করি না এবং পুরো মক্কা চুক্তিটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতারই একটি বহিঃপ্রকাশ।”
প্রস্তাব পেলে ইরানও এই জোটে যোগ দেবে বলে তুলে ধরেন তিনি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে বুধবার সাক্ষাতের পর এক প্রশ্নে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।
সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের কোনো চ্যালেঞ্জ বা দ্বন্দ্ব নেই দাবি করে জালিল রাহিমি বলেন, “তুরস্ক ও পাকিস্তান ইরানের অত্যন্ত ভালো বন্ধু; আর সৌদি আরবের সঙ্গেও আমাদের সুসম্পর্ক রয়েছে। তাই মক্কা শান্তি চুক্তি নিয়ে আমাদের কোনো দুশ্চিন্তা নেই।
“আপনারা যেমন জানেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের সময় আমরা কেবল এসব দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালিয়েছি। কখনোই কোনো আরব দেশ বা আরব ভূমিতে আক্রমণ করিনি।”
পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে থাকার প্রেক্ষাপটে গত জুলাইয়ের শেষে মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স (এমডিডিসি) বা সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের উদ্যোগ নেয় সৌদি আরব।
হুতিদের আক্রমণের মুখে বাব-আল মান্দাব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই নতুন বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের ঘোষণা আসে গত ৩১ জুলাই।
রিয়াদে ৪৩টি দেশের সামরিক প্রতিনিধি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের পর জোট গঠনের ওই ঘোষণা দেওয়া হয়। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী দেশ ৪৩টি হলেও জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশ যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করে।
ওই জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনার মধ্যে গত ৭ অগাস্ট নতুন যৌথ প্রতিরক্ষা জোট গঠনে চুক্তিবদ্ধ হয় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান; যা ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে পরিচিতি পায়। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ ও সামরিক উত্তেজনার মধ্যে তিন দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করা এর লক্ষ্য।
চুক্তির উল্লেখযোগ্য একটি দিক হল, তিন দেশের যে কোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যদেরও সম্মিলিত প্রতিরক্ষার আওতায় আসার কথা রয়েছে।
ইউরোপ-আমেরিকার জোট নেটোর আদলে এমন সম্মিলিত প্রতিরক্ষার কারণে এই জোটকে ‘ইসলামিক নেটো’ও বলা হচ্ছে।
চুক্তিতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামরিক সমন্বয়, যৌথ সামরিক মহড়া এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে পরিচিত এই জোটে অংশগ্রহণের বিষয় ইতিবাচকভাবে বিবেচনার কথা বলেছে বাংলাদেশ সরকার।
পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমি বলেন, “গত কয়েক বছর ধরে এই অঞ্চলের দেশগুলোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট বার্তা ছিল- আমাদের সামরিক ঘাঁটির জন্য জমি দাও এবং আমাদের থেকে অস্ত্র কেনো। আমরা তোমাদের নিরাপত্তা দেব।
“তেহরানে সরকার পরিবর্তন করা, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দখল করা, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্প স্তব্ধ করা আর বিশ্বের সামনে নিজেদের সামরিক শক্তি প্রদর্শন করাই ছিল ইরানের ওপর হামলা চালানোর মূল আমেরিকান লক্ষ্য। তবে আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন, ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো বা শাসনব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। আমাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এখনও সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাছাড়া, গত রাতেই আমাদের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত এবং ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।”
হরমুজ প্রণালির মত বাণিজ্য পথগুলো পুনরায় চালু করার চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র কোটি কোটি ডলার ব্যয় করেছে মন্তব্য করে রাষ্ট্রদূত বলেন, “আমার মতে মক্কা চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরাজয়ের একটি সম্পূরক অংশ মাত্র। এই অঞ্চলের ইসলামিক দেশগুলো এখন বুঝতে পেরেছে, মার্কিন অস্ত্রের মজুদ তাদের নিরাপত্তা দিতে পারবে না। ফলে আমরা মক্কা চুক্তিকে ইরানের জন্য হুমকি মনে করি না।”
মক্কা চুক্তিতে ইরানের আগ্রহের প্রসঙ্গে তার ভাষ্য, “আমরা কোনো প্রস্তাব প্রকাশ করিনি বা জমাও দিইনি। তবে মক্কা চুক্তির সদস্য দেশগুলোর পক্ষ থেকে যদি কোনো আমন্ত্রণ বা প্রস্তাব জানানো হয়, তবে আমরা তা গ্রহণ করব।”
এদিকে ১০ বছর আগেই ইরানের পক্ষ থেকে এমন প্রস্তাব দেওয়ার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমি বলেন, মক্কা চুক্তির মত উদ্যোগের প্রস্তাব প্রায় ১০ বছর আগে দিয়েছিলাম। পরমাণু অস্ত্রমুক্ত মধ্যপ্রাচ্যের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলাম।
“ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র কি এই প্রস্তাব সমর্থন করেছিল? না, তারা করেনি। মধ্যপ্রাচ্যের সব মুসলিম দেশের মধ্যে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির দ্বিতীয় প্রস্তাবও আমাদের ছিল। অবশ্য আরব দেশগুলো ইরানের প্রস্তাব সমর্থন করেনি। কেননা তারা ভেবেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন তাদের নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট। বাহরাইন, কুয়েত, আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব এবং জর্ডানের প্রতি প্রশ্ন একটাই, যুক্তরাষ্ট্র কি তাদেরকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দিতে পেরেছে? তাদের আকাশসীমার উপর দিয়ে তেল আবিবের দিকে যাওয়া ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কি যুক্তরাষ্ট্র ঠেকাতে পেরেছে?”