Published : 02 Mar 2026, 11:26 PM
অমর একুশে বইমেলার পরিচালনা কমিটি চার দিনে মোট ১৩৬টি বই প্রকাশের তথ্য দিয়েছে, এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কোনো বইয়ের তথ্য নেই।
তবে মেলার মাঠে ঘুরে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক অন্তত নয়টি নতুন বই প্রকাশের তথ্য পেয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। আরো কয়েকটি বই প্রকাশ হওয়ার অপেক্ষায় আছে বলে প্রকাশনা সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
গবেষকেরা বলছেন, বিগত সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা, 'মব'সহ বিভিন্নভাবে মুক্তিযুদ্ধকে অসম্মান বা অপমান করার মত ঘটনায় তারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বই প্রকাশে দ্বিধা বা সংশয়ে ছিলেন। এ কারণে এবার মেলায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই কম।
তবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানা রকম গবেষণার কাজ হয়েছে, যা পরে বই আকারে আসতে পারে।
সোমবার ছিল বইমেলার পঞ্চম দিন। মেলা চলে দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। এদিন তথ্যকেন্দ্রে নতুন বই জমা পড়েছে ৪০টি।
মেলায় ঘুরে দেখা গেল, নতুন বইয়ের মধ্যে কথাপ্রকাশ এনেছে লেখক ও গবেষক সালেক খোকনের গবেষণাগ্রন্থ 'মুক্তিযুদ্ধে অবিনাশী ঘটনামালা’। এই বইয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাষ্য থেকে যুদ্ধকালীন ছোটো ছোটো নানা ঘটনা সরল গদ্যে তুলে ধরা হয়েছে।
এছাড়া তানিয়া ঊর্মির 'সেতারে স্বাধীনতার সুর' বইটি প্রকাশ করেছে বাতিঘর। মুনতাসীর মামুনের '১৯৭১: অবরুদ্ধ দেশে স্পার্টাকাস' প্রকাশ করেছে অনন্যা প্রকাশনী।
প্রকাশনা সংস্থা সুবর্ণ এনেছে 'শহীদ বুদ্ধিজীবী লুৎফর রহমান স্মারকগ্রন্থ'। এটি যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন জয়দুল হোসেন ও মামুন সিদ্দিকী।
নাওজিশ মাহমুদের 'স্মৃতি ও রাজনীতি: চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর' প্রকাশ করেছে জাগতিক প্রকাশনী।
মেলায় আগামী প্রকাশনী, প্রথমা, বাতিঘর, অনন্যাসহ বেশ কিছু প্রকাশনীর স্টলে ঘুরে দেখা যায় বিগত বছরে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বইও বিক্রি হচ্ছে। স্বাধীনতার মাসে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বইয়ের খোঁজও করছিলেন কেউ কেউ।

‘প্রতিকূল সময়ে’ মুক্তিযুদ্ধের বই
লেখক ও গবেষক সালেক খোকন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "বিগত দেড় বছরে 'মব'সহ মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে যেসব ঘটনা ঘটেছে, তাতে অনেকে এবার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বই প্রকাশে হয়ত সাহস করেননি।"

তবুও কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধের বই প্রকাশ করছেন জানিয়ে সালেক খোকন বলেন, "গত ডিসেম্বরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম থেকে প্রকাশিত হয়েছে 'রক্তরেখায় বাংলাদেশ–অন্তহীন যুদ্ধ: গৌরব, বেদনা আর শিকড়ের ইতিহাস’ নামে তথ্যবহুল একটি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সংকলন। এটি সম্পাদনা করেছেন তৌফিক ইমরোজ খালেদী।
"ইতোমধ্যে দুই খণ্ড বেরিয়েছে। আরেক খণ্ড এ মাসেই বের হবে। এই প্রতিকূল সময়েও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিছু কাজ হচ্ছে। রাষ্ট্র যদি স্থিতিশীল হয় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আরো অনেক গবেষণার কাজ হবে বলে আশা করি।"
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই প্রকাশের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অনুকূল পরিবেশ দরকার বলে মনে করেন এই গবেষক।
তিনি বলেন, "গবেষকেরা যদি নির্ভয়ে গবেষণার কাজ করার পরিবেশ পান, তবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই প্রকাশও বাড়বে। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের বাংলাদেশের শেকড়, মুক্তিযুদ্ধ না হলে বাংলাদেশ হত না। তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় যে সরকারই ক্ষমতায় থাকবে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে রাষ্ট্রের অবস্থান, থাকবে– এটাই আশা করি।"

পোস্টার, ভিউকার্ডে মুক্তিযুদ্ধ
মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ছেলে আরিক ইসলামকে নিয়ে বই দেখছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী লতিফুল ইসলাম। আরিকের হাতে দেখা গেল মানচিত্র খচিত বাংলাদেশের পতাকা।
লতিফুল জানান, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের স্টল থেকে ছেলের জন্য ভিউকার্ড এবং পতাকা কিনেছেন তিনি।
মেলায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের স্টলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কিছু বই আছে। স্টলটিতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আলোকচিত্রের 'ভিউকার্ড, 'পোস্টার' ও 'পতাকা' রয়েছে।
জাদুঘরের স্মারক সংগ্রাহক হারেছ-উজ-জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "এবার মেলায় তো লোকজন একটু কমই আসছে। যারা আসছেন, তারা জানতে চান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কী কী আছে। আমরা যুদ্ধকালীন সময়ের ছবি দিয়ে 'ভিউকার্ড' করেছি।
"এগুলো অনেকে সংগ্রহ করছেন। এছাড়া যুদ্ধকালীন পোস্টার এবং পতাকাও আছে। কেউ কেউ সেগুলো আমাদের স্টল থেকে সংগ্রহ করছেন।"

দ্বিধা-সংশয়
প্রাবন্ধিক ও গবেষক মামুন সিদ্দিকী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "বিগত বছরের কিছু বাস্তবতা বা সংকটের কারণেই প্রকাশকদের অনেকে এবার মেলায় মুক্তিযুদ্ধের বই প্রকাশ নিয়ে সংশয়ে ছিলেন। তার মানে এই না যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ কম হচ্ছে। অনেকেই কাজ করছেন, কিন্তু বই প্রকাশ হয়তো কম হয়েছে।"
এই গবেষক বলেন, "ব্যক্তিগতভাবে আমার সঙ্গে এমন একাধিকজনের কথা হয়েছে, যারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বইয়ের পাণ্ডুলিপি গুছিয়ে রেখেছেন। কিন্তু নানা রকম বাস্তবতার কারণে এবার মেলায় বই প্রকাশ করা হয়নি। সামনে হয়ত মুক্তিযুদ্ধের বই প্রকাশ বাড়বে। মেলাতেই হয়ত আরো কিছু বই আসবে।"
প্রকাশনা সংস্থা বাতিঘর এর প্রধান নির্বাহী জাফর আহমদ রাশেদ বলেন, "বাতিঘর থেকে আমরা তো সারা বছরই বই প্রকাশ করি। এবার মেলা হবে কিনা অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল সবাই। সেজন্য অনেকে প্রস্তুতি নিতে পারেনি সেভাবে।"
তাছাড়া গত বছর বই প্রকাশ নিয়েও প্রকাশকদের মধ্যে এক ধরণের সংশয় ও দ্বিধা ছিল বলে জাফর আহমেদ রাশেদের ভাষ্য।
তিনি বলেন, "কী বই প্রকাশ করা যাবে, কী বই মেলায় প্রদর্শন করা যাবে–তা নিয়েও এক ধরনের সংশয় ছিল। এসব কারণে হয়ত মেলায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই কম থাকতে পারে। তবে বাতিঘর থেকে আমরা 'সেতারে স্বাধীনতার সুর' বইটি প্রকাশ করেছি। এটি বীর গেরিলাযোদ্ধা শহীদ হাফিজকে নিয়ে লিখেছেন তানিয়া ঊর্মি।"

জন্মবর্ষে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
সোমবার বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে হয় ‘সার্ধশত জন্মবর্ষ: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। সেখানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন হামীম কামরুল হক। আলোচনায় অংশ নেন পারভেজ হোসেন। সভাপতিত্ব করেন সফিকুন্নবী সামাদী।
হামীম কামরুল হক বলেন, "বাংলা সাহিত্যের এক কীর্তিস্তম্ভের নাম শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তার উপন্যাসগুলোর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নারীজীবনের মুক্তি ও বৃহত্তর সমাজের কল্যাণ সাধন। উপন্যাসে বাস্তবতার যে নিগূঢ় ও জটিল উন্মোচন ঘটে, সেখানে শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে বাস্তব অনেকটা সরল হলেও তাৎপর্যহীন নয়।"
পারভেজ হোসেন বলেন, "বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে শরৎচন্দ্রের অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ়। তার রচিত উপন্যাস পাঠের ব্যাপকতা আছে বলেই তিনি এত বড় ঔপন্যাসিক হয়ে উঠেছিলেন। তার উপন্যাসে জীবনের মহত্ত্ব যেমন আছে, তেমনি আছে অন্তর্বেদনা, নর—নারীর পাস্পরিক অনুভূতির টানাপোড়েন ও সমাজের নিপীড়িত মানুষের আর্তনাদ।"
সফিকুন্নবী সামাদী বলেন, "বাংলা কথাসাহিত্যে শরৎচন্দ্রের অবদানকে অস্বীকার করা প্রায় অসম্ভব। পরবর্তী অনেক বিখ্যাত লেখক-সাহিত্যিকই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শরৎচন্দ্রের কাছে ঋণী।"

সাংস্কৃতিক আয়োজন
সোমবার লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী ও এজাজ ইউসুফী।
বিকেল ৪ টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশন করেন শাহনাজ পারভীন লিপি, শামীমা চৌধুরী, রোকসানা আক্তার এবং ঝর্ণা আলমগীর।
সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী শিমু দে, অণিমা রায়, ফাহিম হোসেন চৌধুরী, পাপড়ি বড়ুয়া, ফারাহ হাসান মৌটুসী ও খোকন চন্দ্র দাস।
যন্ত্রাণুষঙ্গে ছিলেন কাজী মো. ইমতিয়াজ সুলতান (তবলা), এ বি এম তানভীর আলম সজীব (কী-বোর্ড), গাজী আবদুল হাকিম (বাঁশি) ও মো. ফারুক (অক্টোপ্যাড)।

মঙ্গলবার যা থাকছে
মঙ্গলবার মেলা শুরু হবে দুপুর ২ টায় এবং চলবে হবে রাত ৯ টা পর্যন্ত।
বিকেল ৩ টায় বইমেলার মূলমঞ্চে হবে ‘জন্মশতবর্ষ: তাজউদ্দীন আহমদ’ শীর্ষক আলোচনা। সেখানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মহিউদ্দিন আহমদ। আলোচনায় অংশ নেবেন সাজ্জাদ সিদ্দিকী। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান।
বিকেল ৪ টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।