Published : 14 Mar 2026, 12:01 AM
সকালে শিশুদের কলতানে মুখর অমর একুশে বইমেলার শেষবেলাটায় ছন্দপতন ঘটায় শিলাবৃষ্টি।
রাত ৮টার দিকে ঝড়ো বাতাসের সঙ্গে শুরু হওয়া এ বৃষ্টিতে কিছু বই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা বলেছেন বিক্রেতারা।
তবে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে তারা কোনো ধারণা দিতে পারেননি। কারণ আচমকা বৃষ্টিতে তড়িঘড়ি করে স্টল বন্ধ করে দিতে হয় তাদের।
বাতিঘরের স্বত্ত্বাধিকারী দীপঙ্কর দাশ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তাৎক্ষণিক কিছু বই রক্ষা করা গেছে। তারপরও আমাদের স্টলের ৫০টার বেশি বই নষ্ট হয়েছে। মেলায় তো কয়েকটি স্টল ভেঙে গেছে। অনেক স্টলে আরো বেশি ক্ষতি হয়েছে।"
প্রকাশনা সংস্থা ‘বাবুই’ এর স্বত্ত্বাধিকারী কাদের বাবু বলেন, "শিশুচত্বরে বাবুই স্টলের সাইনবোর্ড ও সিলিং ভেঙে পড়ে যায়। ভেতরে পানি ঢুকে অনেক বই ভিজে যায়। ঝড়োবৃষ্টিতে মেলার অবস্থা খুবই করুণ।"
শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন মেলা শুরু হয় সকাল ১১টায়। এদিন শিশুপ্রহরে ছিল বায়োস্কোপ ও পুতুলনাট্যসহ নানা আয়োজন। বিকাল থেকে স্টলে স্টলে চলে বই বিক্রি আর আড্ডা।
মেলার তথ্যকেন্দ্রে এদিন সবচেয়ে বেশি নতুন বই জমা পড়ে; ২৭৭টি। মেলার ১৬তম দিনে এ নিয়ে নতুন বইয়ের সংখ্যা দাঁড়াল ১ হাজার ৬১৪টি।
রাত ৯টার দিকেও দেখা যায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনেকে স্টল ঠিকঠাক করছেন।
পাঁচটি প্রকাশনীর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা বৃষ্টিতে দ্রুত স্টল বন্ধ করেছেন। শনিবার মেলা সকাল ১১ টায় শুরু হবে, সেজন্য যেন স্টল গুছিয়ে বসতে পারেন, তারই প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।

এবার সবচেয়ে বেশি এসেছে কবিতার বই। মেলার তথ্যকেন্দ্রে এখন পর্যন্ত জমা পড়া বইয়ের মধ্যে পাঁচ শতাধিক কবিতার বই রয়েছে। তবে বিক্রি ভালো হচ্ছে গল্প ও উপন্যাসের।
মেলায় পাঠক সমাবেশ এনেছে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের নির্বাচিত ছোটগল্প সংকলন; নাম ‘ভুলে থাকা গল্প’। ‘কাচ-ভাঙা রাতের গল্প’ এবং ‘অন্ধকার ও আলো দেখার গল্প’ থেকে বাছাই করে সংকলনটি করা হয়েছে।
খ্যাতিমান রুশ কথাসাহিত্যিক নিকোলাই গোগোলের নির্বাচিত গল্প প্রকাশ করেছে বাতিঘর। মূল রুশ থেকে অনুবাদ করেছেন অরুণ সোম। কবি প্রকাশনী থেকে নতুন একটি গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে। তারা ধ্রুপদি সাহিত্য ও অনুবাদ গল্পও বের করেছে।
ওয়াসি আহমেদ ও ইমতিয়ার শামীম সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের পাঁচ দশকের গল্প’ সংকলনের দ্বিতীয় খণ্ড এসেছে মেলায়।
ভারতীয় উপমহাদেশের বিশ শতকের শক্তিমান লেখক সাদাত হাসান মান্টো। বিশেষ করে দেশভাগের ভয়াবহতা ও মানবিক বিপর্যয়কে তিনি অনন্য দক্ষতায় সাহিত্যে তুলে এনেছেন। ‘মান্টোর শ্রেষ্ঠ গল্প’ নামে এই কথাসাহিত্যিকের নির্বাচিত গল্পের সংকলন এনেছে বেঙ্গলবুকস। গল্পগুলো অনুবাদ করেছেন কমলেশ সেন।
সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় বিজয়ী যারা
এদিন সকাল সাড়ে ১০টায় শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পুরস্কার দেওয়া হয়।
চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার ‘ক’ শাখায় প্রথম হয়েছেন আফ্ফান আল হাসনাইন, দ্বিতীয় হয়েছেন আনহিতা রেদোয়ান আভা, তৃতীয় হয়েছেন মো. রিসালাত শাহ।
‘খ’ শাখায় প্রথম হয়েছেন চারুলতা রহমান জারা, দ্বিতীয় হয়েছেন বায়ান রাশদান, তৃতীয় হয়েছেন দ্যুলোক দ্যুতিমান।
‘গ’ শাখায় প্রথম হয়েছেন শ্রেয়া রায়, দ্বিতীয় হয়েছেন স্বস্তি চৌধুরী, তৃতীয় হয়েছেন আদিত্য সাহা।

আবৃত্তি প্রতিযোগিতার ‘ক’ শাখায় প্রথম হয়েছেন পূর্ণতা আদিত্য, দ্বিতীয় হয়েছেন সাহানা ইসলাম সাইফা এবং তৃতীয় হয়েছেন আরওয়া রহমান তাজরি।
‘খ’ শাখায় ১ম হয়েছেন তাসবিহা আয়ান তানহা, ২য় হয়েছেন বেহজারিন হাসান তারফি এবং ৩য় হয়েছেন কারিমা হোসাইন দিয়া।
‘গ’ শাখায় ১ম হয়েছেন সিমরিন শাহীন রুপকথা, ২য় হয়েছেন রাজ্যশ্রী সাহা এবং ৩য় হয়েছেন সমৃদ্ধি সূচনা স্বর্গ।
সংগীত প্রতিযোগিতার ‘ক’ শাখায় ১ম হয়েছেন শ্রীজা মন্ডল, ২য় হয়েছেন মাগফিরাহ্ মাবরুরা তৈষী এবং ৩য় হয়েছেন হিয়াঞ্জলি তরফদার।
‘খ’ শাখায় ১ম হয়েছেন তাসবিহা আয়ান তানহা, ২য় হয়েছেন সার্থক সাহা এবং ৩য় হয়েছেন বিদ্যাস্তুতি সিংহ।
‘গ’ শাখায় ১ম হয়েছেন রোদসী নূর সিদ্দিকী, ২য় হয়েছেন তানজিম বিন তাজ প্রত্যয় এবং ৩য় হয়েছেন নাবিলা আক্তার রায়না।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির সচিব ড. মো. সেলিম রেজা। প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) ড. মামুন আহমেদ।
সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।
বদরুদ্দীন উমর স্মরণ
বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘স্মরণ: বদরুদ্দীন উমর’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফিরোজ আহমেদ। আলোচনায় অংশ নেন সুমন রহমান। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।

মোহাম্মদ আজম বলেন, "বদরুদ্দীন উমরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো, তিনি একজন একাডেমিক বুদ্ধিজীবী। তিনি জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব চাইতেন, গণঅভ্যুত্থান চাইতেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আকাঙক্ষাটি ছিল একটি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের পরিগঠিত হওয়া। আর এজন্য তিনি অনবরত সমসাময়িক ইতিহাস বিশ্লেষণ করে গেছেন এবং জনগণের মধ্যে সেই আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত করার চেষ্টা করেছেন।
এদিন লেখক বলছি অনুষ্ঠানে আলোচনা করেন নাসির আলী মামুন এবং মোহন রায়হান।
বিকেল ৪টায় ছিল সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলাদেশ জাতিয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা— (জাসাসের পরিবেশনা। অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন এ. বি. এম সোহেল রশিদ, মিজানুর রহমান, এনামুল হক জুয়েল।
সংগীত পরিবেশন করেন আলম আরা মিনু, হাসান চৌধুরী, জাকির হোসেন আখের, পিয়াল হাসান, ফরহাদ হোসেন নিয়ন, অধ্যক্ষ আশরাফ শাহিন, মনির হোসেন, হাবিবুর রহমান রেখা সুফিয়ানা, মৌসুমী ইকবাল, জ্যোৎস্না, মিতা মল্লিক, রাফিজা আলম লাকি।
নাতে রাসুল পরিবেশন করেন শাহিনুর আবেদিন। অনুষ্ঠান পরিচালনায় ছিলেন সংগীত পরিচালক জাবেদ আহমেদ কিছলু ও অভিনেতা এ বি এম সোহেল রশিদ।
শনিবার মেলা শুরু হবে সকাল ১১টায়; চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত থাকবে শিশুপ্রহর। বিকাল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে হবে ‘জন্মশতবর্ষ: মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ শীর্ষক আলোচনা। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মোরশেদ শফিউল হাসান। আলোচনায় অংশ নেবেন মমতাজ জাহান। সভাপতিত্ব করবেন আবুল আহসান চৌধুরী। বিকাল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।