Published : 20 Nov 2025, 06:27 PM
সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বে দেওয়া রায়কে ‘কলঙ্কিত’ বলেছে বর্তমান আপিল বিভাগ।
সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় অবৈধ ঘোষণা করে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের রায়ে বৃহস্পতিবার আপিল বিভাগ এ পর্যবেক্ষণ দিয়েছে।
প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে ৭ বিচারকের পূর্ণাঙ্গ আপিল বিভাগ এ রায় ঘোষণা করে।
বেঞ্চের অপর ৬ বিচারক হলেন– বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম ইমদাদুল হক, বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
আইনজীবীরা বলছেন, এ রায়ের মধ্য দিয়ে সংবিধানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরলেও আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অন্তর্বর্তী সরকারে অধীনেই হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কার্যকর হবে চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে।
১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের আমলে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন হয়েছিল।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে রায় দিলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলোপ ঘটে। সে সময় প্রধান বিচারপতি ছিলেন এ বি এম খায়রুল হক।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০১১ সালের সেই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন হলে নতুন করে আপিল শুনানির সিদ্ধান্ত নেয় সর্বোচ্চ আদালত।
বৃহস্পতিবার সেই আপিল ও রিভিউ মঞ্জুর করে সর্বসম্মত রায় ঘোষণা করল আপিল বিভাগ।
রায়ে সর্বোচ্চ আদালত বলছেন, ১৪ বছর আগে আপিল বিভাগের দেওয়া রায়টি ‘একাধিক ত্রুটিতে ত্রুটিপূর্ণ’ বলে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। সেই রায় সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হল।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, “এই রায়টা, বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক সাহেবের দেওয়া রায়টা কেন বাতিল হয়ে গেল? আদালত বললেন যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এবং আমাদের সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আমাদের যে সংবিধানে সুপ্রিম কোর্টের যে রিভিউ ক্ষমতা, সেই ক্ষমতাটা তারা ব্যবহার করেছেন এবং দেখেছেন সেই রায়ের পরতে পরতে ভুল ছিল; অর্থাৎ টেইন্টেড ছিল। টেইন্টেড উইথ দা এরর অ্যাপারেন্ট অন দা ফেস অফ দা রেকর্ড। এইটা আদালতের অবজারভেশন।
“গণতন্ত্র সংবিধানের বেসিক স্ট্রাকচার, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা জনগণের ভোটাধিকার, সংবিধানের বেসিক স্ট্রাকচার, মৌলিক কাঠামো। এই মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করা যায় না এবং আমরা মনে করেছি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে, সংবিধানে প্রবর্তনের মাধ্যমে মৌলিক যে কাঠামো, এই কাঠামোটা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”
জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, “রায়ে বলা হয়েছে যে অতীতের যে রায় দেওয়া হয়েছে এটি টেইন্টেড, বাংলায় বলে কলঙ্কিত এবং এরর অ্যাপারেন্ট অন দ্য ফেস অব দ্য রেকর্ড। দেখামাত্রই মনে হয় অতীতের রায়টা ছিল টেইন্টেড; এবং সেইজন্য বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে থার্টিন্থ অ্যামেন্ডমেন্টকে যে আনকন্সটিটিউশনাল ডিক্লেয়ার করা হয়েছিল, সেই রায়কে পরিপূর্ণভাবে বাতিল করা হল ইন ইটস এনটায়ারিটি।”
বদিউল আলম মজুমদারের আইনজীবী শরীফ ভুঁইয়া, “বাংলাদেশে গত ১৫ বছর ধরে যে স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। তার সূচনা হয়েছিল বিচারপতি খায়রুল হকের নেতৃত্বে দেওয়া এই রায়ের মাধ্যমে। এই রায় এত বাজে একটা রায় ছিল, এটা অনেক ধরনের ভুলে পরিপূর্ণ ছিল এবং এটা এমন একটা রায় যার চেয়ে খারাপ, যার চেয়ে খারাপ রায় আর লেখা সম্ভব নয় বলে আমার মনে হয়।
“এত, এত খারাপভাবে লিখিত একটা রায়, এটাতে আইনগত ত্রুটি ভরপুর ছিল, এটা খুবই খারাপভাবে লেখা হয়েছে এবং এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে লেখা হয়েছে এবং এই রায়ের ফলে আমি যেমনটা বলছিলাম যে বাংলাদেশে একটা স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার সূচনা হয়েছে।”
এই রায়ের মাধ্যমে ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকেও ধ্বংস করা হয়েছে’ বলেও তিনি মন্তব্য করেন।