Published : 01 Jan 2026, 02:02 AM
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের শীর্ষ নেতাদের সফর ও শোকবার্তা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে হঠাৎ উষ্ণ করার প্রচেষ্টার বিষয়টি স্পষ্ট করে তুলেছে।
খালেদা জিয়াকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে স্বল্প সময়ের নোটিসে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকায় উড়ে আসার পর আরেক শীর্ষস্থানীয় নেতা শোক জানাতে যাচ্ছেন দিল্লিতে বাংলাদেশ মিশনে।
প্রতিবেশী দুই দেশের শীতল সম্পর্কে বিশেষ এ পরিবর্তনের বার্তা এমন এক সময়ে এল যখন চব্বিশের আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে পারস্পরিক অভিযোগ ও জনবিক্ষোভ নিয়ে টানাপড়েন চলছিল।
বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে আসার পর প্রায় দেড় বছর ধরে চলছিল কূটনৈতিক বার্তা বিনিময়। একই দিনে পাল্টাপাল্টি কূটনীতিকদের তলবের রেশ না কাটার প্রেক্ষাপটেই বিএনপি চেয়ারপারসনের মৃত্যুর পর ভারতের শোক বার্তা ও সফর পরিস্থিতি পাল্টানোর ইঙ্গিত বলে ভাবার কথা উঠেছে।
জয়শঙ্করের ঢাকা সফরের পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদার মৃত্যুতে শোক জানাতে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং যাবেন দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনে, যেখানে দিন কয়েক আগেই হিন্দু উগ্রবাদীরা বাংলাদেশে এক হিন্দুকে পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনায় বিক্ষোভ করে। তৈরি হয় উত্তজনাকর পরিস্থিতি।
জয়শঙ্কর স্বল্প সময়ের সফরে ঢাকায় এসে খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানকে সমবেদনা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শোকবার্তা পৌঁছে দিয়েছেন।
আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী চিঠিতে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে উষ্ণ ভাষায় প্রশংসা করেছেন।
চিঠিত ‘নতুন সূচনার’ প্রত্যাশার কথা বলেছেন। তারেক রহমানের নেতৃত্বের ওপর আস্থা প্রকাশ করাও হয়েছে।

মোদী লিখেছেন, খালেদা জিয়ার প্রস্থান ‘অপূরণীয় শূন্যতা’ সৃষ্টি করলেও তার দৃষ্টিভঙ্গি ও উত্তরাধিকার টিকে থাকবে।
“আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে আপনার (তারেক রহমান) দক্ষ নেতৃত্বে তার (খালেদা জিয়া) আদর্শ এগিয়ে নেওয়া হবে এবং ভারত ও বাংলাদেশের গভীর ও ঐতিহাসিক অংশীদারত্বকে আরও সমৃদ্ধ করতে তা পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করবে—নতুন সূচনা নিশ্চিত করবে।”
এরপর ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে আসে রাজনাথের দিল্লিতে বাংলাদেশ মিশনে যাওয়ার খবর।
এমন প্রেক্ষাপটে মোদী সরকারের এসব উদ্যোগকে বিএনপির নতুন নেতৃত্বের প্রতি দিল্লির একটি কৌশলগত যোগাযোগ প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
অথচ কয়েকদিন আগেই পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। উভয় দেশের কূটনৈতিক মিশনও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়। বাংলাদেশে ভারতীয় কূটনৈতিক স্থাপনা এবং ভারতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে, যা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সম্পর্ক আরও খারাপ করে তোলে।
সম্পর্কের অবনতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, কিছু ভিসা সেবাও স্থগিত করা হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনার পর উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়, এ নিয়ে দুই দেশই প্রকাশ্য মঞ্চে কঠোর ভাষায় একে অপরের সমালোচনা করে।

বিভিন্ন কূটনৈতিক ইস্যুতে দুই দেশ একাধিকবার একে অপরের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে। প্রতিটি তলবের সঙ্গেই আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ ও বিবৃতি দেওয়া হয়। একই দিনে পাল্টাপাল্টি তলবের ঘটনাও ঘটে।
এ প্রেক্ষাপটে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের হঠাৎ সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
হঠাৎ এ সফরের ঘোষণা আসে বিএনপি চেয়ারপারসনের মৃত্যুর পরপরই। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর গত মঙ্গলবার ঢাকায় মারা যান খালেদা জিয়া।
তার মৃত্যুর কিছুদিন আগেই যুক্তরাজ্যে ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফেরেন তার বড় ছেলে তারেক রহমান।
বুধবার খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসে সংসদ ভবনে তারেককে সমবেদনা জানান জয়শঙ্কর। অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তবে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে তার সাক্ষাতের খবর আসেনি।
প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকারসহ অন্য বিদেশি প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইউনূসের বৈঠকের খবর দিয়েছে।
জয়শঙ্কর পরে তারেকের সঙ্গে দেখা করার বিষয়ে ফেইসবুক পোস্টে লেখেন, “ঢাকায় পৌঁছানোর পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি।
“তার হাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একটি ব্যক্তিগত চিঠি হস্তান্তর করেছি। গভীর সমবেদনা জানিয়েছি ভারত সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে।”
তিনি লেখেন, “খালেদা জিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ আমাদের পারস্পরিক অংশীদারত্বের বিকাশে দিকনির্দেশনা দেবে, সে বিষয়ে আস্থা প্রকাশ করেছি।”
এর আগে মঙ্গলবার তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মারা যাওয়ার পরপরই এক্স পোস্টে শোক জানিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী।
পরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে আনুষ্ঠানিক পত্র দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বুধবার ঢাকায় এসে খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি ভারত সরকারের শোকবার্তা তারেকের কাছে হস্তান্তর করেন।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে ‘প্রিয় তারেক রহমান সাহেব’ সম্বোধন করে মোদী লিখেছেন, “আপনার মা, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসন মহামান্য বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের খবরে আমি গভীরভাবে শোকাহত। এই গভীর ব্যক্তিগত শোকের সময়ে আমার আন্তরিক সমবেদনা গ্রহণ করুন। তার আত্মা চিরশান্তিতে বিশ্রাম নিক—এই কামনা করি।”
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এক প্রতিবেদনে দিল্লির এই পদক্ষেপকে বিএনপির নতুন নেতৃত্বের প্রতি একটি কৌশলগত যোগাযোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী মাসগুলোতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, “এটি রাজনৈতিক অঙ্গনের নতুন প্রভাব রাখা নেতাদের প্রতি ভারতের সরাসরি বার্তার ইঙ্গিত দেয়, যারা নির্বাচন-পরবর্তী ঢাকার ক্ষমতার কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।”
বাংলাদেশের দৃষ্টিতে নতুন এই যোগাযোগকে প্রতীকী ও কৌশলগত- উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সঙ্গে কাজ করতে ভারতের আগ্রহের ইঙ্গিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তারেকের সঙ্গে দেখা করে ভারতের শোকবার্তা দিলেন জয়শঙ্কর
খালেদার মৃত্যু: সমবেদনা জানাতে বাংলাদেশ হাই কমিশনে যাচ্ছেন রাজনাথ