১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

উপজাতি বা নৃ-গোষ্ঠী নয়, সংবিধানে ‘আদিবাসী’ শব্দ অন্তর্ভুক্ত করার দাবি

“জুম চাষ নিয়ে একটি মহল পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে বলে নেতিবাচক ধারণা ছড়াচ্ছে,” বলেন এমপি মাধবী মারমা।

উপজাতি বা নৃ-গোষ্ঠী নয়, সংবিধানে ‘আদিবাসী’ শব্দ অন্তর্ভুক্ত করার দাবি
ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে ১৭টি অধিকারভিত্তিক সংস্থা যৌথভাবে আদিবাসীদের বিভিন্ন দাবি নিয়ে একটি সেমিনার আয়োজন করে।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 06 Aug 2026, 06:00 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:47 PM

সংবিধানে ‘উপজাতি, নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দগুলো বাদ দিয়ে তার পরিবর্তে ‘আদিবাসী’ শব্দটি অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন আদিবাসী অধিকারকর্মীরা।

বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে এই দাবি তোলা হয়।

অ্যাসোসিয়েশেন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-এএলআরডি ও বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামসহ জাতীয় পর্যায়ের ১৭টি অধিকারভিত্তিক সংস্থা যৌথভাবে ‘আদিবাসী জনগণ: জীবন, ভূমি অধিকার ও সংস্কৃতির সম্মান’ শীর্ষক এ আলোচনা সভার আয়োজন করে।

স্বাগত বক্তব্যে এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, “বর্তমান সরকার আদিবাসীদের উন্নয়নে ইতিবাচক কথা বলে; যা আমাদের আশান্বিত করে। তবে সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই আমাদের আশাকে স্বার্থক করতে পারে।”

তিনি সরকারিভাবে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালনের আহবান জানান।

মূল প্রবন্ধে মানবাধিকারকর্মী ইলিরা দেওয়ান সরকারের কাছে আদিবাসীদের উন্নয়নে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল:

১. সংবিধানের ২৩ক ধারায় বর্ণিত ‘উপজাতি, নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দগুলো বাদ দিয়ে তার পরিবর্তে ‘আদিবাসী’ শব্দটি অন্তর্ভুক্ত করা।

২. পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনকে কার্যকর করতে অবিলম্বে উদ্যোগ নেওয়া এবং নিয়মিত সভা করে কমিশনকে গতিশীল করা।

৩. সমতলের আদিবাসীদের জন্য স্বতন্ত্র ভূমি কমিশন গঠন করা।

৪. আদিবাসীদের অধিকার দেখভালের জন্য জাতীয়ভাবে একটি অধিদপ্তর গঠন করা। যেটি পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিতের জন্য গঠিত হবে এবং এই অধিদপ্তরটি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের অন্তর্ভুক্ত থেকে কাজ যাতে করতে পারে, তা নিশ্চিত করা।

৫. আদিবাসী এলাকায় পর্যটন শিল্প প্রসারিত করার আগে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনধারা যাতে ব্যাহত না হয় এবং তাদের সংস্কৃতি, কৃষ্টির প্রতি সম্মান রেখে ভ্রমণের জন্য সরকারিভাবে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা।

৬. পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সমতলের আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে এ নীতিমালা কঠোরভাবে পালন করা বাধ্যতামূলক করা।

৭. সরকার ঘোষিত নারী স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় আদিবাসীদের নিয়োগ দেওয়া এবং ধাত্রীবিদ্যার সাথে যুক্ত যে সকল আদিবাসী নারী আছে তাদের তালিকা প্রণয়ন করে সরকারি ব্যয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

৮. পার্বত্য শান্তি চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে উদ্যোগ নেওয়া।

৯. সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মে চিনিকলের নামে আদিবাসী ও বাঙালিদের অধিকৃত ন্যায্য ভূমি ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে সরকারকে জরুরি উদ্যোগ নেওয়া।

গবেষক ও নৃবিজ্ঞানী ঈশিতা দস্তিতার আদিবাসীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে আদিবাসীদের লোকজ জ্ঞান ও চিকিৎসাসেবার স্বীকৃতিসহ আদিবাসী ধাত্রী, সেবিকাদের আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা বিষয়ে প্রশিক্ষণসহ আদিবাসীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে বিশেষ ব্যবস্থাগ্রহণে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ আদবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, “আমাদের দেশের বৈচিত্রের যে সংস্কৃতি, তাকে ধরে রেখে এগিয়ে যেতে হবে। বর্তমান সরকার যে রংধনু জাতির কথা বলছে, যে অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে, যা আদিবাসীদের জন্য সম্ভাবনার, নতুন পথে চলার প্রেরণা দিচ্ছে। কিন্তু তাকে বাস্তবে রূপ না দিলে আবার আমরা পিছিয়ে যাব।”

সংসদ সদস্য আন্না মিনজ বলেন, “আদিবাসীদের না পাওয়ার বঞ্চনা যেমন সর্বস্বীকৃত কিন্তু পাওয়ার বিষয়টিকেও আমাদের স্বীকার করতে হবে। আদিবাসীদের জন্য সবচেয়ে জরুরি হল সামনের দিনগুলোতে কীভাবে আমরা আরো এগিয়ে যেতে পারি, সে দিকটির প্রতি বেশি জোর দেওয়া।”

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “আদিবাসীদের কোনো বিতর্ক ব্যাতীত সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া উচিৎ। আদিবাসীদের তাদের অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, যাতে কারে স্বার্থান্বেষীগোষ্ঠী তাদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে তাদের ন্যায্য দাবিকে দুর্বল করে না দেয়।”

আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমির মালিকানার আইনগত স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি সংসদীয় আদিবাসী বিষয়ক ককাস গঠন এবং এটিকে সক্রিয়ভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে তিনি সরকারকে আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভানেত্রী ফওজিয়া মোসলেম বলেন, আদিবাসীদের সংস্কৃতি, সমাজ সবকিছু ভূমির সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। আদিবাসীদের ন্যায্য ভূমি অধিকার নিশ্চিতে তিনি সরকারকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

সংসদ সদস্য মাধবী মারমা বলেন, “জুম চাষ নিয়ে একটি মহল পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে বলে নেতিবাচক ধারণা ছড়াচ্ছে। পৃথিবীর অনেক দেশেই জুম চাষ হচ্ছে, যা পরিবেশবান্ধব হিসেবেই স্বীকৃত। আমাদের জুম চাষকে আরও কীভাবে উন্নত করা যায় সে বিষয়ে কাজ করতে হবে।”

আদিবাসী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটগুলোর সম্প্রসারণ ও শক্তিশালী করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো কাজ করছে, বলেন তিনি।

অন্য আলোচকরা আদিবাসীদের এলাকায় ‘ইকো ট্যুরিজম’ থেকে শুরু করে যে কোনো উন্নয়নকাজের ক্ষেত্রে আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

তারা বলেন, পাবর্ত্য অঞ্চলে বন্যা খুবই অপরিচিত ছিল। কিন্তু অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে এ বছরে পার্বত্যঅঞ্চলের বেশিরভাগ এলাকায় বন্যায় আক্রান্ত হয়।

ভূমি কমিশনের সক্রিয়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তারা বলেন,

১৯৯৭ সালের শান্তি চুক্তির অধীনে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে ২৭ হাজারের বেশি ভূমি বিরোধের আবেদন থাকলেও স্বার্থান্বেষী মহলের বিরোধিতায় কখনও কমিশনের সভা হতে পারছে না। 

এছাড়া ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাসত্ত্ব আইন এর ৯৭ ধারা বাস্তবায়নে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) যাতে আদিবাসীদের ভূমি বিষয়ে স্বতপ্রণোদিত হয় কাজ করেন, সে বিষয়ে সরকারকে উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি জানান অন্য বক্তারা।