Published : 01 Dec 2025, 12:00 AM
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সশস্ত্র বাহিনীর যেসব সদস্য বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, অন্যান্য সরকারি চাকরিজীবিদের মত তাদেরও নিশ্চিত ন্যায়বিচার পাওয়ার কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
রোববার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বিগত সরকারের আমলে সামরিক বাহিনীর ‘বঞ্চিত’ সদস্যদের আবেদন পর্যালোচনার প্রতিবেদন হস্তান্তর অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৪ অগাস্ট সময়কালে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর চাকরিতে ‘বৈষম্য, বঞ্চনা, অবিচার ও প্রতিহিংসার’ শিকার হওয়া অবসরপ্রাপ্ত ও বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের আবেদন পর্যালোচনা করে সুপারিশ দেওয়ার জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছিল।
ওই কমিটির তৈরি প্রতিবেদন মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হস্তান্তর করেন কমিটির সভাপতি এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি উন্নয়ন বিষয়ক বিশেষ সহকারী অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আব্দুল হাফিজ।
পরে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “যখন আপনাদেরকে এই কাজ করার জন্য দায়িত্ব দিয়েছিলাম তখন মনে হয়েছিল সামান্য কিছু অনিয়ম হয়ত হয়েছে, কিন্তু আপনারা যে পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে এনেছেন তা রীতিমত ভয়াবহ। এটা কল্পনার একেবারে বাইরে।”
পূর্ণ পেশাদারিত্ব ও নির্মোহ থেকে সত্য বের করে আনায় কমিটির সস সদস্যকে ধন্যবাদ দেন তিনি।
কমিটি সর্বমোট ৭৩৩টি অভিযোগ পায় যেগুলোর মধ্যে ৪০৫টি গ্রহণ করে। এর মধ্যে কমিটির সুপারিশ করা আবেদনের সংখ্যা ১১৪, কমিটির কার্যপরিধির আওতা বহির্ভূত আবেদন ২৪টি এবং ৯৯টির আবেদনকারীর ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ভঙ্গের, সাজা মওকুফের ও নৈতিক স্খলনজনিত বিষয় রয়েছে।
আব্দুল হাফিজ বলেন, আবেদনপত্র পর্যালোচনার জন্য গঠিত কমিটি চলতি বছর ১৯ অগাস্ট প্রথম সভা আহ্বান করে। বঞ্চিত অফিসারদেরকে সেন্ট্রাল অফিসার্স রেকর্ড অফিস, আইএসপিআর এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সংগঠন রাওয়ার মাধ্যমে হোয়াটসঅ্যাপ ম্যাসেজ, প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এবং টিভি স্ক্রলের মাধ্যমে ২১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আবেদন জমা দিতে বলা হয়।
তিনি বলেন, স্ব স্ব বাহিনী কর্তৃক গঠিত বোর্ড যাদের বিষয়ে সুপারিশ প্রদান করেছে তাদের বিরুদ্ধে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া কোনো নৈতিক স্খলনজনিত শাস্তি কিংবা অভিযোগ ডোসিয়ারে লিপিবদ্ধ ছিল না।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ কমিটি স্ব স্ব বাহিনী কর্তৃক গঠিত বোর্ডের সুপারিশ আমলে নিয়ে সেগুলোর বাইরেও কমিটির বিবেচনায় উপযুক্ত আবেদনগুলো প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এবং আবেদনকারীর সঙ্গে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের বিষয়ে ইতিবাচক সুপারিশ করেছে।
অনেক আবেদনকারী সম্পর্কে কমিটির সদস্যরা মতামত দিয়েছেন, আবেদনের যথার্থতা ও বঞ্চিত হওয়ার যৌক্তিকতা সম্পর্কে তাদের মতামত নির্মোহভাবে কমিটিতে উপস্থাপন করেছেন বলে প্রতিবেদন হস্তান্তর অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন কমিটির প্রধান।
তিনি বলেন, কমিটি ভুক্তভোগী অফিসারদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের অধিনায়ক ও ঊর্ধ্বতন অফিসারদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের বঞ্চনা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে।
অনুসন্ধানে কমিটি জানতে পেরেছে, আবেদনকারীদের মধ্যে ছয়জন অফিসারকে তাদের আত্মীয়-স্বজনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার দরুন বা জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অপবাদ দিয়ে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বিভিন্ন মেয়াদে (১ বছর হতে ৮ বছর পর্যন্ত) গুম করে রাখা হয়, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এমনকি একজন অবসরপ্রাপ্ত অফিসারকে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়, পরে ওই অফিসারের স্ত্রীকে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এক বছরের শিশুসহ বিনা বিচারে দুই দফায় দীর্ঘ ছয় বছর কারাগারে রাখা হয়।
বিজ্ঞপ্তি বলা হয়, “তদন্তে আরও জানা যায়, কিছু সংখ্যক অফিসার ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর হত্যাযজ্ঞের নারকীয় ঘটনায় সরকারের নিষ্ক্রিয়তায় সোচ্চার ছিলেন, তাদের মধ্যে পাঁচজনকে একটি ভুয়া ঘটনা (ব্যারিস্টার তাপস হত্যা প্রচেষ্টা মামলা) সাজিয়ে ব্যাপক নির্যাতন করে।
“পাঁচজন অফিসার ১/১১ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ডিজিএফআইতে কর্মরত থাকাকালীন তাদেরকে মিথ্যা অভিযোগে কিংবা বিনা অভিযোগে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।”
প্রতিবেদনের বরাতে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, কিছু অফিসার বিডিআর হত্যাযজ্ঞের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর দরবারে প্রশ্ন করার জন্য সেনাসদর কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এক পর্যায়ে উক্ত দরবারে ব্যাপক হৈচৈ ও হট্টগোল হওয়ায়, পাঁচজন অফিসারকে অযথা দায়ী করা হয় এবং তাদেরকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো প্রকার সুযোগ না দিয়ে চাকুরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
“চারজন কনিষ্ঠ অফিসার (লেফটেন্যান্ট পদবির) ধর্মীয় আচার-আচরণ নিয়ম-নিষ্ঠার সাথে পালন করার কারণে তাদেরকে কোনো একটি দলের অনুসারী হিসেবে অথবা জঙ্গি ট্যাগ দিয়ে অন্যায়ভাবে চাকুরি থেকে বরখাস্ত করা হয় বলেও বেরিয়ে আসে তদন্তে।”
প্রতিবেদনে বলা হয়, তদন্তে দেখা যায় ২৮ জন বিদ্যমান নীতিমালা অনুসরণ করে পদক্ষেপ গ্রহণের পরও গুম, অপহরণ, অবৈধভাবে আটক রেখে অমানুষিক নির্যাতন ও জেরা, লোক দেখানো প্রহসনের তদন্ত ও বিচারহীন, আইন-বহির্ভূত কার্যকলাপে এসব কর্মকর্তা নানাবিধ বঞ্চনা, নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, বর্ণনাতীত পারিবারিক ও সামাজিক লাঞ্ছনা এবং প্রভৃতি আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন।
এতে বলা হয়, সেনাবাহিনীতে বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার ১১৪ জন কর্মকর্তা সম্পর্কে সুপারিশ প্রদান করা হয়েছে। তাদেরকে (যার জন্য যা প্রযোজ্য) স্বাভাবিক অবসর প্রদান, পদোন্নতি, অবসর পূর্ব পদোন্নতি, বকেয়া বেতন ও ভাতা এবং আনুষঙ্গিক সুবিধাদি প্রদান করার জন্য কমিটি সুপারিশ করে। এর মধ্যে চারজনকে চাকুরিতে পুনঃবহাল করার জন্য কমিটি সুপারিশ করে।
নৌবাহিনীতে বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার ১৯ জন কর্মকর্তাকে (যার জন্য যা প্রযোজ্য) স্বাভাবিক অবসর প্রদান, পদোন্নতি, অবসরপূর্ব পদোন্নতি, বকেয়া বেতন ও ভাতা এবং আনুষঙ্গিক সুবিধাদি প্রদান করার জন্য কমিটি সুপারিশ করে।
বিমান বাহিনীতে বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার ১২ জন কর্মকর্তাকে (যার জন্য যা প্রযোজ্য) স্বাভাবিক অবসর প্রদান, পদোন্নতি, অবসর পূর্ব পদোন্নতি, বকেয়া বেতন ও ভাতা এবং আনুষঙ্গিক সুবিধাদি প্রদান করার জন্য কমিটি সুপারিশ করে।
আবেদনকারীদের মধ্যে ১২৫ জন সেনা, ৫১ জন নৌ এবং ২৫ জন বিমানবাহিনীর সদস্য।
বৈঠকে অন্যান্যদের মধ্যে কমিটির সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মুহম্মদ শামস-উল-হুদা, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল শেখ পাশা হাবিব উদ্দিন, অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ শফিউল আজম ও অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ভাইস মার্শাল মুহাম্মদ শাফকাত আলী এবং প্রধান উপদেষ্টার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ তারিক উপস্থিত ছিলেন।