Published : 09 Feb 2026, 07:12 PM
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের হত্যায় সম্পৃক্ততার কারণে সেনাবাহিনীর অনেক কর্মকর্তার ফাঁসি হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাহিনীর সাবেক প্রধান অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া।
র্যাবে কর্মরত কনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের মানুষ হত্যা থেকে নিবৃত্ত থাকতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে এ কথা স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।
শতাধিক খুনের অভিযোগে সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সোমবার তিনি দ্বিতীয় দিনের সাক্ষ্য দেন।
সাক্ষ্য শেষে জিয়াউল আহসানের আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো তাকে জেরা শুরু করেন। তবে জেরা শুরুর পরপরই তা স্থগিত করে আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী দিন রাখা হয়।
গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে দুই সদস্যের বেঞ্চে এই সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। অপর বিচারপতি হলেন মো. শফিউল আলম মাহমুদ।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল তারিক আহম্মেদ সিদ্দিকীর ছত্রছায়ার ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর কিছু ব্যক্তি নিয়মিত ডিজিএফআইয়ের অফিস ভিজিট করত এবং সেখানে যে সাতটি মিটিং রুম ছিল, তার একটিতে তাদেরকে কাজ করতে দেওয়া হতো বলে ইকবাল করিম সাক্ষ্যে বলেন।
“তারা বিভিন্ন সময়ে কিছু ব্যক্তিকে জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করে তার তালিকা ডিজিএফআইয়ের কাছে দিত। এ তালিকার উপর ডিজিএফআই কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে কিনা, তা আমার জানা নেই।”
সেনাপ্রধানের তথ্য পাওয়ার জন্য অনেক সূত্র রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সেনাপ্রধানের অধীনে আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট এবং ডাইরেক্টর মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স নামে দুটি সংস্থা ও ব্যক্তি থাকেন। এছাড়া র্যাবের অফিসার এবং অন্যান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপের মাধ্যমে তিনি অনেক তথ্য জানতে পারতেন। এসব তথ্যের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে সেনাবাহিনীর জুনিয়র অফিসারদের মিসগাইড করা হতো এবং ভুল পথে পরিচালিত করা হতো।
এ প্রসঙ্গে তিনি তিনটি ঘটনা তুলে ধরেন।
র্যাব থেকে যারা ফিরে আসত, তাদেরকে তিনি প্রথম প্রশ্ন করতেন যে, তারা কতজন মানুষ হত্যা করেছে। একজন কনিষ্ঠ অফিসার র্যাব থেকে প্রত্যাবর্তনের পরে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান।
“এই অফিসারকে আমি একই প্রশ্ন করেছিলাম; সে উত্তরে বলল ছয়জন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ছয়জনকে কি তুমি সরাসরি হত্যা করেছ? উত্তরে সে বলল, দুই জনকে সে সরাসরি হত্যা করেছে এবং বাকি চার জনকে হত্যার সময় সে সেখানে উপস্থিত ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, প্রতি হত্যার জন্য কত টাকা করে পেয়েছ? উত্তরে সে বলল, দশ হাজার। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, টাকা নিয়ে কী করেছ? উত্তরে সে বলল, টাকাগুলো সে গ্রামের মসজিদে অনুদান হিসেবে দিয়েছে। আমি অনুধাবন করতে পারলাম যে, এই কাজগুলো সে ইচ্ছার বিরুদ্ধে করেছে এবং অপরাধবোধ থেকে সে টাকাগুলো মসজিদে দান করেছে।”
তিনি বলেন, দ্বিতীয় ঘটনাটি ছিল একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেলের সঙ্গে। ওই কর্নেল তার অফিসে গেলে তাকেও একই প্রশ্ন করা হয়- কয়জনকে হত্যা করেছ?
“সে বলল ছয়জন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম কেন করেছ? উত্তরে সে বলল, ঊর্ধ্বতন অফিসারের আদেশ পালন করেছি। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি তোমার ঊর্ধ্বতন অফিসার। সে বলল, হ্যাঁ। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আমি যদি আমার হাগু তোমাকে খেতে বলি খাবে কিনা। সে বলল, না। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা এবং হাগু খাওয়ার মধ্যে কোনটা নিকৃষ্ট? সে বলল, নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা। আমি তাকে বললাম, তাহলে কেন করেছ? উত্তরে সে নিশ্চুপ থেকেছে।”
তৃতীয় ঘটনাটি একজন মেজরের, যিনি আগে ইকবাল করিম ভূঁইয়ার সঙ্গে চাকরি করেছেন।
“র্যাবে পোস্টিং হওয়ার কিছুদিন পর তিনি আমার সঙ্গে সেনাভবনে দেখা করেন। তার আগের একটি ঘটনা আমার কর্ণপাত হওয়ার কারণে আমি তাকে সে বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি। ঘটনাটি ছিল হোটেল রেডিসনে চাকরিরত একটি মেয়েকে কিছু দুর্বৃত্ত রাতে বাড়ি ফেরার সময় ধর্ষণ ও হত্যা করে। র্যাব, যার মধ্যে উক্ত মেজরও ছিল, সে ব্যক্তিদের হত্যা করে। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি, তুমি আইন নিজের হাতে কেন তুলে নিয়েছ? সে বলল, এই ব্যক্তিগুলো সমাজবিরোধী ব্যক্তি এবং তাদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। আমি তাকে বললাম, তুমি যে আইন ভঙ্গ করে তাদেরকে হত্যা করেছ, তুমিও তো সমাজবিরোধী ব্যক্তি। সে এরপর নিশ্চুপ হয়ে যায়। পরে আমি তাকে প্রতিজ্ঞা করাই সে র্যাবে আর এই ধরনের কাজ করবে না। কিন্তু হতাশার সঙ্গে দেখি, কিছুদিন পর সে ফেইসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছে, যেখানে দেখা যায় যে শাপলা চত্বরের ধোঁয়াটে পটভূমিতে সে এবং কর্নেল জিয়া একে অপরের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে।”
অসংখ্য ইন্টারভিউয়ের মধ্যে এগুলো অল্প কয়েকটি উদাহরণ বলে জানান জেনারেল ইকবাল।
র্যাব যাদের হত্যা করত তাদের পেট চিরে নাড়িভুঁড়ি বের করে ইট-পাথর বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দিত বলে তিনি শুনেছেন বলে জানান।
ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, র্যাবের এসব কর্মকাণ্ড দেখে তিনি বিভিন্ন ডিভিশন এবং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ভিজিট করতে থাকেন এবং অফিসারদের এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে মোটিভেট করতে শুরু করেন।
“এক পর্যায়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যত কমান্ডিং অফিসার আছে, তাদেরকে ঢাকায় এনে জুনিয়র অফিসারদের প্রতি তাদের কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করি। তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেই, শেখ মুজিব এবং জিয়া হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে অনেক অফিসারের ফাঁসি হয়েছে। দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় আরও কিছু সামরিক অফিসার ফাঁসির দণ্ড মাথায় নিয়ে হাজতবাস করছেন।”
এতকিছুর পরও যখন তিনি বুঝতে পারছিলেন যে ক্রস ফায়ার থামছে না, তখন তিনি ডিজিএফআই, বিজিবি এবং র্যাব থেকে অফিসার নিয়ে আসা শুরু করেন এবং সেসব সংস্থায় পোস্টিং করা বন্ধ করে দেন।
তিনি বলেন, “আমাকে অনেকে মনে করিয়ে দেন যে, আমি যা করছি তা বিদ্রোহের শামিল। আমার উত্তর একটাই ছিল যে হাশরের ময়দানে আমাকে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে। পোস্টিং বন্ধ করার প্রতিক্রিয়াও ছিল মারাত্বক। আমি প্রতিনিয়ত অফিসার পোস্টিং করার জন্য পিএমের কাছ থেকে টেলিফোন পেতে থাকি। এক সময় র্যাবের ডিজি বেনজির আহম্মেদ আমার অফিসে আসেন এবং র্যাবে অফিসার দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান। আমি তাকে কোনো কথা দেইনি। চট্টগ্রামে হোটেল রেডিসন উদ্বোধনের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুলিশদের সঙ্গে বৈঠককালে আমাকে ডেকে নেন এবং র্যাবে অফিসার দিতে বলেন। অফিসার স্বল্পতার কারণে র্যাবে অফিসার দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানাই।”
তার অবসর গ্রহণের আগ পর্যন্ত এই চাপ অব্যাহত ছিল; কিন্তু তিনি তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন বলে জানান।
সেনাবাহিনী কলুষিত হয়েছে এবং এই বাহিনীকে শুদ্ধির যে সুযোগ এসেছে, তা কোনো অবস্থাতেই হেলায় হারানো উচিত হবে না বলে তিনি মনে করেন।
“এতে সেনাবাহিনীর গৌরব ক্ষুণ্ণ হবে না, বরং সেনাবাহিনী গৌরবের উচ্চ শিখরে আসীন হবে। পুরো জাতি জানবে সেনাবাহিনী কখনও দোষী ব্যক্তিদেরকে ছাড় দেয় না। এতে সেনাবাহিনীর গৌরব এবং সম্মানের সাইনবোর্ডের আড়ালে অফিসারদের অপকর্ম করে পার পেয়ে যাওয়ার প্রবৃত্তি দূর হবে।”
তিনি বলেন, “আমি চাই র্যাব অবিলম্বে বিলুপ্ত করা দরকার এবং সেটি সম্ভব না হলে সামরিক সদস্যদের সামরিক বাহিনীতে ফিরিয়ে আনা উচিত। আমি আরও চাই, ডিজিএফআইও বিলুপ্ত করা হোক। কারণ এই সংস্থাটি আয়না ঘরের মতো অপসংস্কৃতি জন্ম দেওয়ার পরে টিকে থাকার বৈধতা হারিয়েছে।”
র্যাব ও ডিজিএফআইয়ের বিলুপ্তি চাইলেন ইকবাল করিম ভূঁইয়া
অপারেশন ক্লিন হার্টে দায়মুক্তি ছিল 'হত্যার লাইসেন্স': ইকবাল করিম ভূঁইয়া