Published : 28 Apr 2026, 11:51 PM
যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএসএফ) বাংলাদেশি দুই শিক্ষার্থী খুনের ঘটনা তাদের পরিবার ও প্রিয়জনদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছে ‘অন্তহীন’ এক প্রশ্নের মুখে।
উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া মেধাবী এই দুই শিক্ষার্থীর ‘নৃশংস’ হত্যার ন্যায়বিচার তারা পাবেন কিনা সে প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে তাদের মনে। সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় গ্রেপ্তার মার্কিন নাগরিক হিশাম আবুগারবিয়েহর কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন তারা।
এমনকি এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে মুখ খুলেছেন গ্রেপ্তার হিশামের ছোট ভাইও। তিনিও তার ভাইয়ের কঠোর শাস্তির দাবি করেছেন।
ইউএসএফ এর পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি ১৬ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ ছিলেন। তাদের মধ্যে শুক্রবার লিমনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তারপর পুলিশ বৃষ্টির পরিবারকে ফোনে জানায়, তাকেও হত্যা করা হয়েছে।

লিমনের লাশ উদ্ধারের পর ওইদিনই তার রুমমেট হিশামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে হত্যার দুটি অভিযোগ আনা হয়।
তবে বৃষ্টির মরদেহ এখনো উদ্ধার হয়নি। বৃষ্টির মরদেহের সন্ধানে এখনো ইউএসএফ ক্যাম্পাস সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ তল্লাশি চলাচ্ছে। এরইমধ্যে সোমবার স্থানীয় একটি জলাশয় থেকে মানুষের দেহাবশেষ উদ্ধার হয়েছে। তবে তা বৃষ্টির কি না, তা এখনও নিশ্চিত করা হয়নি। পিনেলাস কাউন্টি মেডিকেল এক্সামিনার অফিস মরদেহটি শনাক্তের কাজ করছে।
নিহত শিক্ষার্থী লিমনের ছোট ভাই জুবায়ের আহমেদ দাবি করেছেন, হিশামকে একেবারেই পছন্দ করতেন না লিমন। এমনকি হিশাম ‘সাইকোপ্যাথ’ কিনা, সেই সন্দেহ ছিল তার।
ঢাকা থেকে ভার্চুয়ালি ফ্লোরিডার স্থানীয় সংবাদপত্র ট্যাম্পাবে ২৮- কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জুবায়ের বলেন, “লিমনের ওই রুমমেটকে নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তা ছিল। আমার ভাই সম্প্রতি সেখানে (অ্যাপার্টমেন্ট) ওঠে। সে প্রায়ই বলত, লোকটি (হিশাম) খুব একটা মিশুক বা সামাজিক নয়। লিমনের সন্দেহ ছিল, সে হয়ত ‘সাইকোপ্যাথ’ ধাঁচের, যদিও সে নিশ্চিত ছিল না।”
লিমনের খুন হওয়ার খবরে পরিবারে কেমন প্রতিক্রিয়া হয়েছিল বর্ণনা করে জুবায়ের বলেন, “এটা আমাদের এবং বৃষ্টির পরিবারের জন্য ছিল অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক সময়। আমরা নিয়মিত তাদের সাথে যোগাযোগ রাখছি। বৃষ্টির পরিবারও শোকস্তব্ধ।”
জুবায়ের বলেন, ২৪ এপ্রিল শুক্রবার তারা সেই ‘ভয়ঙ্কর’ খবরটি পান যে, ট্যাম্পাবে এলাকার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের পাশে একটি কালো ব্যাগের ভেতর লিমনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, “সেই রাতটি ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার এবং দীর্ঘতম রাত। আমি আমার বাবা-মাকে কখনও শিশুর মত এত উচ্চস্বরে কাঁদতে দেখিনি।
“লিমন আর বৃষ্টি ছিলেন বন্ধু। তাদের মধ্যে একে অপরের প্রতি ভালো লাগা ছিল। তারা দুজনেই অত্যন্ত মেধাবী, কঠোর পরিশ্রমী, দয়ালু এবং স্বপ্নবাজ ছিলেন। তাদের মুখে সবসময় হাসি থাকত।”
ফ্লোরিডার স্থানীয় এবিসি৭-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বৃষ্টির ছোট ভাই জাহিদ প্রান্ত বলেন, “এটা ছিল আমার জীবনের অন্ধকারতম রাত। এই দুঃস্বপ্ন যেন শেষ হওয়ার নয়। এটি অকল্পনীয় এবং আমার বাবা-মা এই পরিস্থিতির সঙ্গে কোনোমতে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।”
তিনি বলেন, “এখনও মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, হয়ত এটা একটা দুঃস্বপ্ন, হয়ত এসব ঘটছে না। হয়ত এটা শুধুই একটা ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন এবং আমি জেগে উঠলেই সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে।”
গ্রেপ্তার হিশামের ভাই আহমদ আবুগারবিয়েহর সঙ্গেও কথা বলেছে ট্যাম্পাবে ২৮। তবে ‘হয়রানির’ ভয়ে নিজের মুখ দেখাতে রাজি হননি আহমদ।
তিনি বলেন, “আমার মাথায় কেবলই তাদের (লিমন ও বৃষ্টি) পরিবারের কথা ঘুরছে। বৃষ্টির ভাইয়ের সাক্ষাৎকার দেখে আমি ভেঙে পড়েছি। এটা সত্যিই ভয়াবহ।”
আহমদ বলেন, তিনিও তার ভাইকে পছন্দ করতেন না। হিশামের সঙ্গে তার কাছে নিরাপদ মনে হত না।
হিশাম খুন করতে পারেন কি না–এমন প্রশ্নে আহমদ বলেন, “আমি ওকে কখনও বিশ্বাস করিনি... ১৮ বছর বয়স থেকে ওর মধ্যে কিছু একটা ঘটেছিল এবং ও অত্যন্ত সহিংস হয়ে উঠেছিল।”
এদিকে লিমন ও বৃষ্টি হত্যার তদন্ত চলতে থাকলেও উভয় পরিবার রোববার একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছে। সেখানে তারা বলেছে, আদালতের কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়কে সক্রিয়ভাবে এ বিষয়ে নজরদারি বজায় রাখতে হবে এবং পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় আইনি ও আর্থিক সহায়তা দিতে হবে।
একইসঙ্গে ইউএসএফ কর্তৃপক্ষের কাছে তারা অনুরোধ করেছে, লিমন ও বৃষ্টির (যখন পাওয়া যাবে) মরদেহ যেন ইসলামী শরিয়ত ও জানাজার নিয়ম অনুযায়ী যথাযথভাবে সমাহিত করার ব্যবস্থা করা হয়।

লিমন ও বৃষ্টির সব ব্যক্তিগত জিনিসপত্র বাংলাদেশে তাদের পরিবারের কাছে ‘ঠিক যেভাবে পাওয়া গেছে সেভাবেই’ ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করেছেন তারা। এছাড়া তাদের ব্যাংকে থাকা অবশিষ্ট অর্থ, উপবৃত্তি বা বেতন যেন নিজ নিজ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়, সেই অনুরোধও জানিয়েছেন।
লিমন ও বৃষ্টির স্মরণে ইউএসএফ ক্যাম্পাসে একটি ‘স্মৃতিস্তম্ভ’ স্থাপনের দাবি করেছে তাদের পরিবার।
বিবৃতির জবাবে ইউএসএফ কর্তৃপক্ষও শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছে।
লিমনের ভাই জুবায়ের গ্রেপ্তার হিশামের সর্বোচ্চ সাজার দাবি জানিয়ে বলেন, “তাদের (লিমন ও বৃষ্টি) জীবনের মূল্য আছে এবং আমাদের পরিবার বিচার, মর্যাদা ও জবাবদিহিতা পাওয়ার যোগ্য।”