ডোলমা খাং শিখর জয়ের গল্প অভিযাত্রীদের মুখে

পরিকল্পনা বদলের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পর্বতারোহী এম এ মুহিত বললেন, “জেনেশুনে কেউ সুইসাইড করতে চায় না, সে যত দক্ষ পর্বতারোহীই হোক।”

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 25 Nov 2022, 11:32 AM
Updated : 25 Nov 2022, 11:32 AM

হিমালয়ের অজেয় চূড়া দোগারি হিমাল অভিযানে গিয়ে বৈরী আবহাওয়ায় বদলাতে হয় পরিকল্পনা; শেষ পর্যন্ত ২০ হাজার ৭৭৪ ফুট উচ্চতার ডোলমা খাং শৃঙ্গে প্রথমবার লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে দেশে ফেরা পর্বতারোহীরা জানালেন, তাদের এ অভিযানও কম রোমাঞ্চকর ছিল না। 

বাংলাদেশ ও নেপালের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এই অভিযানে গত ২ নভেম্বর ডোলমা খাং চূড়ায় পৌঁছান বাংলাদেশের চার এবং নেপালের দুই পর্বতারোহী। 

তবে ১২ অক্টোবর যখন তারা কাঠমান্ডু থেকে যাত্রা করেন, তখন তাদের লক্ষ্য ছিল ২২ হাজার ফুট উঁচু দোগারি হিমালের বেজক্যাম্প।

অভিযান শেষে দেশে ফিরে শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ দলের দলনেতা এম এ মুহিত এবং অন্যরা শোনালের রোমাঞ্চকর সেই অভিযাত্রার গল্প। 

ঢাকা থেকে নেপালের উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় যে জাতীয় পতাকা তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল, ডোলমা খাং শৃঙ্গে উড়িয়ে আসা সেই পাতাকা এ অনুষ্ঠানে প্রত্যর্পণ করেন তারা।

এভারেস্টজয়ী পর্বতারোহী মুহিত বলেন, “দোগারি হিমালটা ছিল হিমালয়ের একদম পশ্চিম জেলায়। এ বছর আবহাওয়া এতটা খারাপ ছিল যে নেহেরু ইন্সটিটিউটের ২৯ জন শিক্ষার্থী মারা গেছে। এরপরও আমরা চেষ্টা করেছিলাম। আমরা ১২ অক্টোবর পশ্চিম নেপালের রুকুম জেলার কাংড়ির উদ্দেশ্য যাত্রা শুরু করি। কাংড়ি থেকে জিপে তাকসারা পৌঁছে দোগারি হিমাল বেসক্যাম্পের উদ্দেশ্যে ট্রেকিং করি।”

সেখানে ১৫ হাজার ৯২ ফুট উচ্চতায় নিমকুণ্ড ফুলগাড়ি উপত্যকায় ক্যাম্প করেন। কিন্তু সেখানে দুই দিন থেকে নানাভাবে উপরে ওঠার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। 

“সাধারণত এ ধরনের জায়গা ঘাসে আবৃত থাকে। কিন্তু সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবরের শুরু পর্যন্ত নেপাল হিমালয়ে ভারী তুষারপাতের কারণে তিন থেকে চার ফুট উঁচু বরফ জমে ছিল। আমরা দেখছিলাম যে যত উপরের দিকে যাচ্ছি, একটা পা ফেললে হাঁটুর উপর বরফ উঠে যায়। তো, যখন হাঁটুর ওপর বরফ উঠে যায়, তখন এক পা তুলে আরেক পা ফেলাটা কষ্টকর। 

“তখন আমি নেপালের কিলু পেম্বা শেরপা সাথে দফায় দফায় আলোচনা করি। সবদিক বিবেচনা করে আমরা পাঁচ হাজার মিটারের কাছাকাছি পৌঁছেও সাত থেকে আট ফুট উচুঁ বরফের কারণে দোগারি হিমাল অভিযান পরিত্যক্ত ঘোষণা করে ২৪ অক্টোবর কাঠমান্ডু ফিরে আসি। কারণ অ্যাক্সিডেন্ট একটা বিষয়। আর জেনেশুনে কেউ সুইসাইড করতে চায় না, সে যত দক্ষ পর্বতারোহীই হোক,” বলেন মুহিত।

কাঠমান্ডু ফিরে তারা এ অভিযান আয়োজনকারী সংস্থা ইমাজিন নেপালের কর্ণধার পর্বতারোহী মিংমা গ্যালজে শেরপার সাথে আলোচনা করেন। তখনই বাংলাদেশ-নেপাল যৌথ অভিযানটি ডোলমা খাং শিখরে করার সিদ্ধান্ত হয়। 

এ অভিযানে বাংলাদেশ দলে এম এ মুহিতের সঙ্গী ছিলেন বাহলুল মজনু, ইকরামুল হাসান ও রিয়াসাদ সানভী। নেপালের কিলু পেম্বা শেরপা এবং নিমা নুরু শেরপার সঙ্গে তারা ২৮ অক্টোবর সিমিগাঁওয়ের উদ্দেশ্যে কাঠমান্ডু ত্যাগ করেন। 

সিমিগাও থেকে ট্রেকিং করে ৩০ অক্টোবর ১২ হাজার ২৭০ ফুট উচ্চতার বেদিং গ্রামে পৌঁছায় অভিযাত্রী দলটি। বেদিংই ছিল এ অভিযানের বেজক্যাম্প।

মুহিত বলেন, “দুই রাত বেদিংয়ে থেকে ১ নভেম্বর দুপুরে ১৬ হাজার ৭৬ ফুট উচ্চতায় হাইক্যাম্পে পৌঁছাই আমরা। সেদিন বিকাল ৫টার মাঝে ডিনার শেষ করে ফেলি। তারপর রাত ১টায় হাইক্যাম্প থেকে চূড়ার দিকে যাত্রা করি। প্রথমে পাথরের বোল্ডার পেরিয়ে রাত ৩টার দিকে বরফে মোড়া প্রান্তরের কাছে পৌঁছাই… সেখান থেকে ক্র্যাম্পনসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পরে মেইন রোপে নিজেদের বেঁধে যাত্রা করি।

“কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর দেখলাম, সবাই এক দড়ির সাথে যাওয়াটা সম্ভব না, রিস্কি। কারণ আমাদের সামনে কয়েকশো মিটার উচ্চতার প্রায় ৯০ ডিগ্রি খাড়া দেয়াল।”

সেই দেয়ালে দড়ি বসানো কঠিন ছিল জানিয়ে এই পর্বতারোহী বলেন, “সেই কঠিন দেয়ালে রোপ ফিক্স করেন নেপালি দলের নেতা কিলু পেম্বা শেরপা ও নিমা নুরু শেরপা। সেই দড়িতে শুরু হয় কষ্টকর জুমার ক্লাইম্বিং। সেটি এতই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল যে উপরের জনের পায়ের চাপে বরফ ও পাথর খসে পরছিল, ফলে যে কোনো মুহূর্তে ঘটতে পারত মারাত্মক দুর্ঘটনা।” 

কষ্টকর সেই আরোহণ শেষে প্রায় ২৫ মিটার দীর্ঘ ঝুঁকিপূর্ণ এক সরু রিজ লাইন পেরিয়ে ডোলমা খাং শীর্ষে পৌঁছান অভিযাত্রীরা।

জীবনে প্রথমবার ৬ হাজার মিটারের পর্বতে চড়া বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে তরুণ সদস্য রিয়াসাদ সানভী বলেন, “এটি আমার দ্বিতীয় পর্বতাভিযান ছিল। এর আগে ২০১৯ সালে মাউন্ট ফার্চামো অভিযানে খারাপ আবহাওয়ার কারনে বেজ ক্যাম্প থেকে ফিরে আসতে হয়েছিল। এবারো প্রথমে দোগারি হিমাল অভিযানে খারাপ আবহাওয়ার কারণে আমাদের বেজ ক্যাম্প থেকে ফিরে আসতে হয়।

“অভিযান বাতিল হওয়ার পর স্বভাবতই খারাপ লাগছিল, পর পর দুটি অভিযানে শুধু প্রকৃতির কারণে ব্যর্থ হতে হল। কিন্তু যখন শুনলাম ডোলমা খাং অভিযানটি হচ্ছে, তখন নতুন আশা জাগে মনে। একটাই সংকল্প ছিল, প্রকৃতি ভালো আচরণ করলে শীর্ষে পৌঁছাবই।”


দলের আরেক সদস্য কাজী বাহালুল মজনু বিপ্লব বলেন, “পর্বতে সব সময়ই ঝুঁকি থাকে। এই অভিযানেও ছিল ঝুঁকি। বিশেষ করে সামিটের আগে শেষ ৫০০ মিটার ছিল টেকনিক্যাল। কিন্তু সব কিছু পেছনে ফেলে আমরা ডোলমা খাং শীর্ষে পৌঁছাতে সক্ষম হই।”

বিপ্লবের লক্ষ্য এখন মাউন্ট এভারেস্ট। পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আগামী বছরই তিনি সেই অভিযানে বেরিয়ে পড়তে চান। 

দলের চতুর্থ সদস্য ইকরামুল হাসান শাকিল এখনো নেপালেই আছেন অন্য এক অভিযানের সাথে।

দলনেতা মুহিত বললেন, “বাংলাদেশ থেকে এ মুহূর্তে এভারেস্টের জন্য কেউ যদি পুরোপুরিভাবে প্রস্তুত থাকে, তারা হলেন বিপ্লব ও শাকিল।”

বাংলাদেশে নেপালের রাষ্ট্রদূত ঘনশ্যাম ভাণ্ডারী, ব্র্যাক চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। 

যৌথভাবে এ অভিযানের আয়োজন করে বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব (বিএমটিসি) এবং ইমাজিন নেপাল। পৃষ্ঠপোষকতা করেছে ইস্পাহানী টি, স্কয়ার টয়লেট্রিজ ও ফার্ষ্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ২৫ শতাংশ ছাড়ে অভিযাত্রীদের ঢাকা-কাঠমান্ডু-ঢাকা বিমান টিকেট দিয়েছে।

বিএমটিসি প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হকের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে ইস্পাহানি টি লিমিটেডের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মার্কেটিং ফজলে রাব্বি, স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেডের সিনিয়র মার্কেটিং ম্যানেজার ফজল মাহমুদ রনি, চক্ষু চিকিৎসক ডা. নিয়াজ আব্দুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

খেলাধুলায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা যে জরুরি, সে কথা তুলে ধরে হোসেন জিল্লুর রহমান বললেন, “এটা খুব ভালো লেগেছে যে একটা করতে গিয়েছিলাম, কিন্তু করা যায়নি। কিন্তু তাই বলে থেমে থাকা হয়নি।”

আগামী বছর এভারেস্টের বেজক্যাম্পে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে তিনি বলেন, “যাদের বয়স ১০০ বছর, তাদের জন্যও ফিটনেস এবং স্পোর্টস প্রযোজ্য। আমি একটা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আগামী বছর আমি এভারেস্টের বেইজক্যাম্প পর্যন্ত যাব, সেই প্রতিজ্ঞা এখনো আছে। আসলে বিভিন্ন বয়সের লোকজন যে এটা করত পারে, সেটাও একটা বিশেষ ধরনের পরীক্ষা।”

রাষ্ট্রদূত ঘনশ্যাম ভাণ্ডারি এই এক্সপিডিশনকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, “এই পর্বতারোহীরা আজ প্রথম না, আগেও সফলভাবে অনেক পর্বত আরোহন করেছেন। আমি অফিশিয়াল অ্যাম্বাসেরড হিসেবে এখানে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু এই পর্বতারোহীরাই হলেন নেপাল বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপের সত্যিকারের গুডউইল অ্যাম্বাসেডর।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক