Published : 14 May 2026, 04:54 PM
শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হত্যাযজ্ঞ চালানোর অভিযোগে করা মামলায় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনিকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
একই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু ও সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপাকেও।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেয়।
বেঞ্চের বাকি দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
গত ৭ মে ট্রাইব্যুনাল তাদের বিরুদ্ধে হাজিরা পরোয়ানা (প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট) জারি করে। সেই আদেশ অনুযায়ী বৃহস্পতিবার সকালে তাদের কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
ওইদিন শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী গাজী এম এইচ তামীম বলেন, "২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হত্যাযজ্ঞের সময় দীপু মনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। ওই দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা একদল উচ্ছৃঙ্খল মানুষকে নির্মূল করেছে বলে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার করেন।"
এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল এবং আসামিদের পরবর্তী হাজিরার জন্য আগামী ৭ জুন দিন ধার্য করেছে ট্রাইব্যুনাল।
সাংবাদিকদের বিষয়ে প্রসিকিউশনের ভাষ্য, “সাংবাদিক ফারজানা রুপা ও মোজাম্মেল বাবু শুরু থেকেই হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশকে 'উসকানিমূলক' আখ্যা দিয়ে একাত্তর টেলিভিশনের মাধ্যমে প্রচার করেন এবং গণমাধ্যম কভারেজের মাধ্যমে শাপলা চত্বর অভিযান ঘিরে ভিন্ন বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।”
প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, "অপরাধ করার ক্ষেত্রে কে সাংবাদিক, কে আইনজীবী, কে ডাক্তার, কে কোন পেশার, সেটা দেখার কোনো সুযোগ নাই। আমরা অপরাধের বিচার করি। সুনির্দিষ্ট অপরাধ করলে যেকোনো পেশার মানুষকেই বিচারের আওতায় আনা হবে।"
শুধু ভুল সংবাদ পরিবেশনের জন্য নয়, বরং শাপলা চত্বরের ঘটনার পেছনের 'মেকানিজম' বা পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
বিগত সরকারকে ‘ফ্যাসিস্ট’ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সহায়তা করা সাংবাদিকদের বিচারের আওতায় আনা হয়েছে বলে তিনি জানান।
“ভালো সাংবাদিক তো আর আসামি হয় না; কিন্তু যারা হলুদ সাংবাদিকতা করেন, তারা যদি ফ্যাসিস্ট সরকারকে সহযোগিতা করে থাকেন, যাদের কারণে আজকে এতগুলো মানুষের হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, তাদের বিচার তো চাইতেই হবে।"
তদন্ত সংস্থার স্বাধীনতা বিষয়ে তিনি বলেন, "ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি একেবারেই স্বাধীনভাবে কাজ করছে। তারা তদন্ত করে যাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রমাণ পাবে, ট্রাইব্যুনালে তাদের বিরুদ্ধেই রিপোর্ট জমা দেবে।"
প্রসিকিউশন জানায়, শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশ ঘিরে ঢাকাসহ চারটি স্থানে ৫৮ জন নিহত হওয়ার তথ্য তদন্তে পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঢাকায় ৩২, নারায়ণগঞ্জে ২০, চট্টগ্রামে ৫ ও কুমিল্লায় একজনের পরিচয় শনাক্ত করেছে তদন্ত সংস্থা।
মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই রাতের অভিযানে ৬১ জন নিহত হয়েছিলেন। তবে তৎকালীন পুলিশের দাবি ছিল, রাতের অভিযানে কেউ মারা যাননি; দিনভর সংঘাতে নিহতের সংখ্যা ছিল ১১ জন।
এই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে আছেন আরো ছয় আসামি। তারা হলেন— সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক আইজিপি এ কে এম শহিদুল হক, সাবেক ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম ও আবদুল জলিল মণ্ডল এবং একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টামণ্ডলীর সভাপতি শাহরিয়ার কবির।
নারী ও শিক্ষানীতির বিরোধিতার মধ্য দিয়ে ২০১০ সালে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের আত্মপ্রকাশ ঘটে। পরে ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার মতিঝিলে সমাবেশ ডাকে তারা। সমাবেশ ঘিরে ব্যাপক সহিংসতা ও তাণ্ডবের পর ওই রাতে যৌথ বাহিনীর অভিযান চালিয়ে হেফাজতকর্মীদের শাপলা চত্বর থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
ওই হত্যাকাণ্ড নিয়ে ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি বরাবর হেফাজত নেতা জুনায়েদ আল হাবিব ও মাওলানা মামুনুল হকের পক্ষে একটি অভিযোগ করেন আজিজুল হক, যেখানে ২১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।
এর আগে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত ২০ অগাস্ট শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আরেকটি অভিযোগ জমা পড়ে। সেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।