Published : 17 Nov 2025, 12:18 AM
নির্বাচন কমিশন-ইসির সঙ্গে সংলাপে নির্বাচনের মাঠে ‘অবৈধ অস্ত্রের’ ব্যবহার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে রাজনৈতিক দলগুলো।
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান পরিচালনা করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে সুপারিশ করেছে রাজনৈতিক দলগুলো।
রোববার দুপুরে নির্বাচন ভবনে দ্বিতীয় দিনের সংলাপের দ্বিতীয় পর্বে পাঁচটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বসে কমিশন।
বেলা ২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত নির্ধারিত এ পর্বে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-বাংলাদেশ জাসদ ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের নেতারা ইসির সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
তারা নির্বাচন কমিশনকে ভোটের সময় কঠোর হওয়া, কমিশনের ক্ষমতার দৃষ্টান্তমূলক প্রয়োগ, জামানত ও নির্বাচনি ব্যয়সীমা কমানো, ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করা এবং অপতথ্য ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছেন।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজের সঞ্চালনায় সংলাপের সূচনা বক্তব্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার-সিইসি এ এম এম নাসিরউদ্দিন গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে কমিশনের প্রতিশ্রুতি পুর্নব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, “অনেকে মনে করেন আমরা তার পক্ষে কাজ করলে আমরা নিরপেক্ষ। কিন্তু আমরা কারো পক্ষে কাজ করতে পারবো না। আমাদের বিবেক দেশের প্রচলিত আইন বিধি বিধান যা বলে সেটা মনেই আমরা চলবো, ইনশাল্লাহ।”
সংলাপ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে সিইসি বলেন, “আপনাদের এখানে আমন্ত্রণ জানানোর মূল পারপাস দুইটা। একটা হল, আমরা যে একটা আচরণ বিধি বানিয়েছি তা পরিপালনে আপনাদের সহযোগিতা চাওয়া।
“আর হল একটা সুন্দর নির্বাচনের কথা আমরা সবাই বলছি এবং আমরা জাতির কাছে ওয়াদাবদ্ধ। একটা নিরপেক্ষ, সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এখানে আপনাদের সহযোগিতা চাওয়া আমাদের বড় উদ্দেশ্য।”
কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকী সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারকে বাদ দিয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি বলেন, “বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হয়নি। সে অভিজ্ঞতা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেটাও আমরা সুস্পষ্টভাবে এখনও বুঝতে পারছি না। একটি ব্যালট হলে যে সময় লাগে, দুইটি ব্যালট হলেতো আরও বেশি সময় লাগবে। নির্বাচনের ব্যালট গণনায় ফল যদি বিলম্বিত হয় নানাবিধ প্রশ্ন প্রার্থীদের মধ্যে, জনগণের মধ্যে আসবে।”

নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার বিধান রাখায় তিনি নির্বাচন কমিশনকে সাধুবাদ দেন। নির্বাচনে প্রযুক্তিগতভাবে অপতথ্য ছড়ানো নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেন বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালাল উদ্দিন আহমদ নির্বাচন সুষ্ঠু অবাধ গ্রহণযোগ্য করতে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরিতে নিরপেক্ষতার বিষয়ে লক্ষ রাখার সুপারিশ করেন।
প্রতিটি কেন্দ্রে ভোটের একদিন আগের থেকে তিন দিন পর পর্যন্ত সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন, নির্বাচনের আগে যৌথবাহিনী অভিযান করে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের সুপারিশ করেন তিনি।
নির্বাচনে ‘কালো টাকার’ অপব্যবহার বন্ধ করা ও বুথব্যাতীত প্রতিটি কেন্দ্রকে সিসিটিভির আওতায় আনার সুপারিশ করেন জালাল উদ্দিন আহমদ। নির্বাচনি ব্যয়ের বিষয়ে মনিটরিং করার সুপারিশ করেন তিনি।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পক্ষ সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বাস্তবায়ন করতে কমিশনকে সুপারিশ করেন। তিনি বলেন, “শুধু কথা না, কাজে দেখতে চাই।”
আগের নির্বাচন কমিশন যেসব ভুল করেছে, সেগুলো যেন না করা হয়, সে বিষয়ে বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক করেন।
গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একই দিনে আয়োজন করা হলে গণভোটের গুরুত্ব থাকবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মোসাদ্দেক বিল্লাহ লোভ ও ক্ষমতার ঊর্ধ্বে থেকে নির্বাচন আয়োজন করতে কমিশনকে অনুরোধ করেন।
তিনি নির্বাচনী কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে কঠোর নির্দেশনা দেওয়ার এবং তা তদারকি করার সুপারিশ করেন।
ইসলামী আন্দোলেনের এই নেতা বলেন, “নির্বাচনের আগে মাঠে যে অস্ত্রগুলো আছে, যা লুট হইসে তো লুট হইসে, সন্ত্রাসীরা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে আসতেসে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ তো বসে নাই, টাকা ছড়াইতেসে। এ অস্ত্রধারীদের এমনভাবে সব অস্ত্র ‘ক্লোজড’ করতে হবে যেন কেউ কোনো সন্ত্রাস ছড়াইতে না পারে।”
বাংলাদেশ জাসদের জেনারেল সেক্রেটারি নাজমুল হক প্রধান সংলাপে রাজনৈতিক দলগুলোকে দেওয়া ‘চাঁদা’ করমুক্ত করার সুপারিশ করেন।
নির্বাচনি ব্যায়সীমা ও জমানত কমানো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বানানো ভিডিও ও অপতথ্য নিয়ন্ত্রণকে তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করেন কমিশনকে।
নির্বাচনের কমিশনের ক্ষমতার প্রয়োগ দৃষ্টান্তমূল করার সুপারিশ করে নাজমুল হক বলেন, “ওসি, ডিসি, এসপির এত মাতব্বরি হয় যে, ভোটটা নির্বাচন কমিশনের থাকে না।”
সংলাপের শেষাংশে ইসি সানাউল্লাহ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযোগ না করতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান রাখেন।
তিনি বলেন, “এআই ও সোশ্যাল মিডিয়ার অপতথ্য ঠেকাতে আমরা কাজ করছি। রাষ্ট্রের যতটুকু সক্ষমতা আছে এর পাশাপাশি ইউএনডিপির প্লাটফর্মটাও ব্যবহার করছি। কিন্তু এটা খুব একটা সহজ কাজ নয়। আমি অনেকগুলো ‘ইলেক্ট্ররাল বডির’ সঙ্গে কথা বলেছি, সবারই ‘কনসার্ন’ এটা।”
রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা এখন থেকে আচরণবিধি মেনে চলার অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করছেন তুলে ধরে তিনি বলেন, “আচরণ বিধির উল্লেখযোগ্য অংশ সোশ্যাল মিডিয়ার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার না করার কথা আছে।”
ইসি সানাউল্লাহ বলেন, “ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত প্রবাসীরা পৃথিবীর যেকোন স্থান থেকে ভোট দিতে পারবেন।”
আরও পড়ুন:
ইসি কারো হয়ে কাজ 'করবে না': সিইসি
নতজানু হবেন না, নিরপেক্ষ ও শক্ত ভূমিকা নিন: ইসিকে দলের প্রতিনিধিরা