১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ আর রক্তক্ষয়ের সাক্ষী হল ঢাকা

বাসার ছাদে খেলতে গিয়েও গুলিবিদ্ধ হয়েছে অনেক শিশু।

গোলাম মর্তুজা অন্তু গোলাম মর্তুজা অন্তু

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 23 Jul 2024, 10:48 PM

Updated : 26 Aug 2026, 10:02 AM

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে চলতি মাসের প্রথম দিন যে আন্দোলন শুরু হয়, দুই সপ্তাহ বাদে তা সহিংস হয়ে ওঠে ১৫ জুলাই। দুইদিন পর সংঘাত আর জ্বালাও-পোড়াও ছড়িয়ে পড়ে ঢাকাশহর জুড়ে। নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি ভয়ংকর হয়ে ওঠে ১৯ ও ২০ জুলাই; এই ৪৮ ঘণ্টার প্রতিটি মুহূর্ত চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কাটে নগরবাসীর।

এই সময়ের মধ্যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার বাইরেও; কারাগারে হামলা চালিয়ে অস্ত্র লুট আর কয়েদিদের পালানোর মতো ঘটনাও ঘটে। সবমিলিয়ে সংঘাতে সার্ধশতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে; আহত ও গুলিবিদ্ধ হয় সহস্রাধিক মানুষ। সংঘাত থামাতে গিয়ে আহত হয় সহস্রাধিক পুলিশ, মারা গেছে তিনজন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে কোটা সংস্কারের আন্দোলন ঘিরে রক্তক্ষয়ী সহিংসতা দেখা যায় ১৬ জুলাই। ওইদিন ঢাকা, রংপুরসহ সারাদেশে ছয়জন নিহত হওয়ার খবরে উত্তেজনার পারদ আরও চড়তে থাকে।

সেদিন রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও হল বন্ধের নির্দেশনা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন। একইসঙ্গে সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। আন্দোলন থেকে সরে না এসে বুধবার সারাদেশে গায়েবানা জানাযা ও কফিন মিছিলের কর্মসূচি দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এদিন রাত ও পরদিন সকালে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হলগুলো থেকে ছাত্রলীগকে বিতাড়িত করে আন্দোলনকারীদের একাংশ।

গায়েবানা জানাযা ও হল খালি করা ঘিরে বুধবার দিনব্যাপী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দফায় দফায় পুলিশের সংঘাত হয়। পাশাপাশি রাজধানীর বাড্ডা, রামপুরা, নতুনবাজার, নদ্দা, উত্তরা-আজমপুর এলাকায় কোটা আন্দোলনকারীদের সমর্থনে রাস্তায় নামে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও। 

বুধবার রাতে সংঘাত জ্বালাও-পোড়াওয়ে রূপ নেয়। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও শনির আখড়ায় হঠাৎই রাস্তায় নেমে জ্বালাও-পোড়াও শুরু করে একদল মানুষ, যারা পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলাও করে। একপর্যায়ে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের টোলপ্লাজায় আগুন দেয় তারা। বুধবার রাতে যাত্রাবাড়ীতে শুরু হওয়া সেই সংঘাত থেমে থেমে চলেছে রোববার পর্যন্ত। সংঘাত ছড়িয়েছে যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, রায়েরবাগ থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড হয়ে কাঁচপুর পর্যন্ত; সংঘাত ছড়ায় ডেমরা, সানারপাড়, স্টাফ কোয়ার্টার এলাকাতেও।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে যাত্রাবাড়ী-রায়েরবাগসহ আশপাশের এলাকা, রামপুরা-বাড্ডা, উত্তরা-আজমপুর, সায়েন্স ল্যাবরেটরির মোড়, মোহাম্মদপুর তিন রাস্তার মোড়, মিরপুর-১০ নম্বরসহ বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে একদল মানুষ। তাদের হটিয়ে দিতে টিয়ারশেল ও ছররা গুলি ছুঁড়তে থাকে পুলিশ। ভয়াবহ সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে ঢাকাজুড়ে। এইদিন ঢাকা মেডিকেলে ১২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। 

বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে শুরু হয় জ্বালাও-পোড়াও; বিকালে মহাখালীর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবনের নীচে রাখা গাড়ি ভাঙচুর করে অগ্নিসংযোগ করে দাঙ্গাকারীরা। এতে ভবনের নীচে রাখা ৫৩টি গাড়ি পুরোপুরি ভষ্মীভূত হয়। নীচতলার ইমার্জেন্সি রেসপন্স কো-অর্ডিনেশন সেন্টার পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলা হয়। 

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবনের পাশেই খাজা টাওয়ার, যেখানে রয়েছে সারাদেশে ইন্টারনেট সরবরাহকারী অনেকগুলো আইএসপি ও ডেটা সেন্টারের মূল যন্ত্রপাতি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবনের আগুনে খাজা টাওয়ার থেকে ইন্টারনেটের ব্যান্ডউইডথ সরবরাহকারী তার বিনষ্ট হয়ে সারাদেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে যায় বলে সরকারের তরফে জানানো হয়।

বৃহস্পতিবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবনে আগুন দেওয়ার খানিক বাদে আগুন দেওয়া হয় অদূরের সেতু ভবন ও বিআরটিএ ভবনে। এসময় ভবন দুটি তছনছ করে দাঙ্গাকারীরা। সেতু ভবনে ৫৫টি যানবাহন পুড়িয়ে দেওয়া হয়; যার মধ্যে ছিল কার, এসইউভি (জিপ), মাইক্রোবাস, পিকআপ ও মোটরসাইকেল। 

একই সময়ে মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে হামলা চালানো হয়। সেখানেও বেশ কিছু যানবাহন পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সামন্তলাল সেন জানান, সেখানে গাড়ি পোড়ানোতে গান পাউডার ব্যবহার করা হয়েছে। 

দুর্যোগ ভবন ও সেতু ভবন থেকে যানবাহন পোড়া কালো ধোঁয়া বের হওয়ার সময় ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে ফোন দিলে তারা জানায়, পুলিশের সহায়তা না পাওয়ায় নিরাপত্তাজনিত কারণে তারা আগুন নেভাতে যেতে পারছেন না।

বৃহস্পতিবারই রামপুরার বিটিভি ভবনে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও জ্বালাও-পোড়াও করা হয়। সেখানে ১৬টি যানবাহন ও বিটিভির বিভিন্ন স্থাপনা তছনছ ও যন্ত্রপাতি ধ্বংস করা হয়। 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সোমবার বলেন, “বিটিভির একটি সমৃদ্ধ শতবর্ষের পুরনো আর্কাইভ ছিল, যেখানে বাংলোদেশের সংস্কৃতি এবং বাংলাদেশের ইতিহাসের অনেক কিছু ছিল। সেই আর্কাইভটা তারা ধ্বংস করে দিয়েছে।”

বৃহস্পতিবারের পাশাপাশি শুক্রবারও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সরকারি অফিসে হামলা চালানো হয়। রামপুরায় ওয়াসার শোধনাগার, মিরপুরে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৪০টি ময়লার গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বিভিন্ন স্থানে পুলিশ বক্স ও ফাঁড়িতে হামলা হয়, পুড়িয়ে দেওয়া হয় পুলিশের অনেক গাড়ি ও মোটরসাইকেল। 

মিরপুর ১৩ নম্বরে বিআরটিএ কার্যালয়ে হামলা চালায় দাঙ্গাকারীরা। কার্যালয় প্রাঙ্গণে রাখা ৫টি জিপগাড়ি ও কয়েকটি মোটরসাইকেলে আগুন দেয় তারা। পাশাপাশি গত বছর ১২১ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষার যন্ত্র ভিআইসি ভাঙচুর করে ধ্বংস করে সন্ত্রাসীরা।

পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বিআরটিসির তিনটি বাস। এর বাইরে বিভিন্ন জায়গায় বেসরকারি মালিকানাধীন বাস, ট্রাক, পিকআপ, মাইক্রোবাস, সিএনজি অটোরিকশা ও মোটরাসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়। বেশ কয়েকটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের গাড়ি আক্রান্ত হয়। অন্তত তিনটি চ্যানেলের গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়, ভাঙচুর হয়েছে অনেকগুলো। সাংবাদিকদের মোটরসাইকেলও ভাঙচুর করে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়।

বৃহস্পতিবার রাত ৮টার পর থেকেই ইন্টারনেট সেবা সীমিত হয়ে আসে। রাত ৯টার পর থেকে আর ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায়নি। 

বৃহস্পতিবার ভয়াবহ এক রাতের পর শুক্রবার সকাল আসে ধোঁয়া আর আগুনের গন্ধ নিয়ে। বাতাসে নানা গুজব। এর মধ্যেই যাত্রাবাড়ী থেকে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকা, ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার, বনশ্রী, রামপুরা, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর-বসিলা, উত্তরা-আজমপুর এসব এলাকা রীতিমতো রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে। 

ইট-পাটকেল, ধারালো অস্ত্র নিয়ে পুলিশের সঙ্গে লড়াইয়ে নামে একদল দাঙ্গাকারী। এদের বেশিরভাগেরই বেশভূষায় শিক্ষার্থী মনে হয়নি। জুমার নামাজের পর হাই কোর্ট সংলগ্ন এলাকা, পল্টন-তোপখানা রোড এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বিএনপি কর্মীদের ধাওয়াধাওয়ি হয়।

গোটা শহরে নারকীয় অবস্থার মধ্যে এদিন দুপুরে দাঙ্গাকারীরা কাজীপাড়া ও মিরপুর-১০ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনে ঢুকে পড়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। দুটো স্টেশন পুরো তছনছ করা হয়।

শনিবার মিরপুর-১০ নম্বর স্টেশন পরিদর্শনে গিয়ে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) এমডি এম এ এন ছিদ্দিক বলেন, “দুটো স্টেশনে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়েছে, তছনছ করা হয়েছে সবকিছু। এই দুটো স্টেশন চালু করতে এক বছরও লেগে যেতে পারে।”

শুক্রবার দুপুরের পর ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় আগুন দেওয়া হয়; ডিভাইডার, গাছ উপড়ে ফেলে ব্যারিকেড দেওয়া হয় বেশিরভাগ সড়কে। একদিকে শত শত মানুষের রণহুঙ্কার আর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ; আরেকদিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর টিয়ারশেল আর গুলি- এভাবেই সারাদিনে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে হতাহতদের ভিড় বাড়তে থাকে। দিন শেষে ঢাকা মেডিকেলে জমা হয় ৩৬ লাশ। এদিন ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নেন সংঘাতে আহত ৪৮২ জন, যাদের বেশিরভাগই গুলিবিদ্ধ। এদের ১৫৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

ঢাকা মেডিকেলের শুক্রবারের চিত্র

দিনভর একের পর এক আহত আসে ঢাকা মেডিকেলে। একপর্যায়ে সংঘাতে আহত ব্যক্তি ছাড়া আর কাউকেই জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল না, বাকিদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় নতুন ভবনে। জরুরি বিভাগের সামনে ভিড় সামলাতে ঢাকা মেডিকেলে কর্তব্যরত আনসার সদস্যরা বাঁশি বাজিয়ে, লাঠি উঁচিয়ে সমানে চিৎকার করে যাচ্ছিলেন। অ্যাম্বুলেন্স, সিএনজি অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ট্রাকে করে আসছিলেন আহতরা।

বিকাল সাড়ে ৫টায় লাল রঙের একটি ব্যাটারিচালিত রিকশায় দুজন মিলে দাঁড়িওয়ালা এক তরুণকে ধরে নিয়ে আসেন। তার বাম পায়ে গুলি লেগেছে, পায়ের হাড় গুঁড়িয়ে গেছে, চামড়ার সঙ্গে কোনো রকমে লেগে রয়েছে পায়ের বাকি অংশটা। প্রচুর রক্ত গেছে, রিকশার পাদানিতে জমাট রক্তের পুকুর যেন। 

রিকশায় বসে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থরথর করে কাঁপছিলেন ওই তরুণ। ঢাকা মেডিকেলের কর্মীরা ছুটে এলেন। টিকেট করতে হবে চিৎকার করে কাউন্টার থেকে একজন জানতে চাইলেন নাম, বয়স। কেউ একজন বললেন, লেখেন নয়ন, বয়স ২৩। ঠিকানা শনির আখড়া। লোকজন ধরাধরি করে কোলে করে নামিয়ে নিয়ে গেলেন নয়নকে। টিকেট নিয়ে পিছু পিছু ছুটলেন একজন।

এভাবে একের পর এক আসতে থাকেন আহতরা। সবারই গুলি না হয় ছররা গুলির আাঘাত। এক পর্যায়ে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগের অস্ত্রোপচার কক্ষ (ওসেক), অবজারভেশন রুম, আর নিউরো ইমার্জেন্সি বিভাগে কোনো জায়গা ফাঁকা থাকে না। একেকটা বিছানায় তিনজনকে আড়াআড়ি করে বসিয়ে কোনোরকমে স্যালাইন লাগিয়ে রাখা হয়েছে অবজারভেশন কক্ষে। 

সন্ধ্যার দিকে নারায়ণগঞ্জ থেকে একযোগে তিনজনকে আনা হলে তাদের মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। জরুরি বিভাগে কোনো জায়গা নেই, ট্রলিরও তীব্র সংকট। তাড়াতাড়ি করে নিহতদের দেহগুলো ট্রলি থেকে নামিয়ে মেঝেতে একপাশে রেখেই ট্রলি ছুটলো আরও আহতদের নিয়ে আসতে।

মেঝেতে লাশের পাশেই আবার স্যালাইন লাগানো অবস্থায় শুয়ে ছিলেন কদমতলী থাকা আসা এক আড়তের শ্রমিক; যার পায়ে, তলপেটে গুলি লেগেছে। 

কিছুক্ষণ পর পড়ে থাকা লাশগুলো চাদর দিয়ে ঢেকে বুকে নাম হিসেবে ‘অজানা’ লেখা কাগজ এঁটে নিয়ে যাওয়া হয় মরচুয়ারিতে।

সন্ধ্যার পর ঢাকা মেডিকেল যেন আর আহত মানুষ নিতে পারছিল না। সন্ধ্যার আগে পল্টন থেকে মাথায়, বুকে ছররা গুলি নিয়ে হাসপাতালে আসেন বেসরকারি চ্যানেল ডিবিসির সাংবাদিক মাসুদুর রহমান। তাকে জরুরি বিভাগ থেকে নিউরো ইমার্জেন্সিতে রেফার্ড করেন চিকিৎসকেরা। নিউরো ইমার্জেন্সিতে তাকে বসিয়ে চিকিৎসা দিতে না দিতেই হইচই করে স্ট্রেচারে মধ্যবয়সী এক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হয়। 

তারও নাম মাসুদ, বয়স ৫২, মাথার ডান পাশে গুলি লেগে খুব গুরুতর ক্ষত হয়েছে। জ্ঞান নেই, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, খালি ঘড়ঘড় শব্দ আসছে। কক্ষে ঢুকেই প্রচুর বমি করলেন, কেবলই রক্ত বের হল। স্ট্রেচারে রেখেই ডাক্তারেরা গজ নিয়ে রীতিমতো যুদ্ধ করলেন। প্রচুর রক্ত যাচ্ছে, তার সঙ্গে আসা ব্যক্তিরা তার রক্তের গ্রুপও জানেন না। পা থেকে রক্ত টেনে নার্সরা ওই ব্যক্তিকে বয়ে নিয়ে আসা লোকজনকে দিয়ে দিলেন পরীক্ষা করে গ্রুপ জানার জন্য, এরপর রক্তও জোগাড় করতে বললেন।

চিকিৎসক খালিদ সাইফুল্লাহ বলে দিলেন, রোগীর অবস্থা খুবই খারাপ যেকোনো সময় এক্সপায়ার করতে পারেন, দ্রুত রক্ত জোগাড় করতে হবে।

এদিকে সাংবাদিক মাসুদুরের সিটি স্ক্যান রিপোর্ট দেখে ডাক্তাররা বললেন, ছররা গুলিগুলো ওনার খুলি পর্যন্ত যায়নি। ওষুধ দিলেই সেরে উঠবেন তিনি। পাশের ঘরে গিয়ে ড্রেসিং করে নিতে বললেন। 

মাসুদুরকে নিয়ে পাশের ড্রেসিং কক্ষের টুলের ওপর বসাতে না বসাতেই নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে ছয় বছরের রিয়াকে নিয়ে হুড়মুড় করে ঢুকলেন তার বাবা-মা। মাথার পেছনে একটা ব্যান্ডেজ কোনোরকমে বেঁধে দিয়েছে সেখানকার কোনো হাসপাতাল। 

ডাক্তাররা তাকে সেখানেই শুইয়ে ব্যান্ডেজটা খোলা মাত্রই ‘ইয়া আল্লাহ’ বলে চোখ বুঁজে প্রায় কেঁদে ফেললেন চিকিৎসক খালিদ। শিশুটির মাথার পেছনে গুলি লেগেছে, তাতে কিছু মগজও বেরিয়ে এসেছে। ডাক্তাররা প্রথমেই রক্ত বন্ধ করতে ভালোভাবে ব্যান্ডেজ করার চেষ্টা করতে করতেই বাবাকে ডেকে বললেন রক্ত লাগবে। 

শিশুটির বাবা-মা কাঁদতে কাঁদতে চিকিৎসকের পা জড়িয়ে ধরলেন। ডাক্তারও কাঁদো কাঁদো। বললেন, ‘দোয়া করেন, আমরা চেষ্টা করছি’। এই শিশুটিরও রক্তের গ্রুপ জানা নেই। বাবা ছুটলেন রক্তের নমুনা নিয়ে। আর মা সামনের বারান্দায় কেঁদেকেটে লুটিয়ে পড়লেন। তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার লোকটিও নেই। মা বলছিলেন, শিশুটি ছাদে উঠেছিল কাপড় তুলতে। সেখানেই হঠাৎ সে পড়ে যায় দেখে তার বাবা ছুটে গিয়ে দেখেন, মাথার পেছনে রক্তের বন্যা, গুলি লেগেছে।

কারও পেটে গুলি, কারও তলপেটে, কারও বুকে, কারও মাথায়। একের পর এক রিকশা, সিএনজিতে করে আনা হচ্ছে আহতদের। সন্ধ্যা ৬টার কিছু পরে সিএনজি অটোরিকশায় করে এক তরুণকে নিয়ে আসা হলো। আসামাত্রই দৌড়ে ছুটে গেলেন ঢাকা মেডিকেলের কর্মীরা, একজন ছুটে গিয়ে জানতে চাইলেন নাম-বয়স। 

বলা হল ওমর ফারুক, বয়স ২৩। নামাতে নামাতেই ঢাকা মেডিকেলের একজন বললেন, “এইডা আর নাই, বুকে গুলি”। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওমর ফারুকের নাম দেখা গেল মর্গের (মৃতদের) রেজিস্ট্রারে। কবি নজরুল কলেজের ইসলামের ইতিহাস তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ওমর ফারুক গুলিবিদ্ধ হন ঢাকার বাজার এলাকায়। 

হাসপাতালে রক্তের জোগান দিতে একদল তরুণ হাসপাতালের কর্মীদের সহায়তায় বাইরের অ্যাম্বুলেন্স পার্কিংয়ের জায়গায় ‘রক্তদান কেন্দ্র’ খুলে বসেন। মাইকে আনসার সদস্যরা ও তরুণরা বারবারই সব শ্রেণির মানুষকে রক্ত দানের জন্য আহ্বান করতে থাকেন। 

হাসপাতালের প্রাঙ্গণে রক্তদানের আহ্বান জানিয়ে প্ল্যাকার্ড বহন করতে দেখা যায় নাজিমউদ্দীন রোড থেকে আসা মুক্তা হিজড়াকে। তিনিসহ কয়েকজন হিজড়া এসেছেন। তার সহযোগী হিজড়ারা প্রত্যেকজনের কাছে গিয়ে রক্ত দিতে বলছেন।

কারফিউ জারি

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় শুক্রবার সন্ধ্যায় আসে কারফিউ জারির ঘোষণা। শুক্রবার মধ্যরাত থেকে ঢাকায় সেনাবাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। জরুরি সেবা ছাড়া জনসাধারণের চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়। 

শনিবারের চিত্র

কারফিউ জারির পরেও শনিবার ঢাকার যাত্রাবাড়ী, রায়েরবাগ, ডেমরা, রামপুরা, বনশ্রী, মোহাম্মদপুরসহ কয়েকটি এলাকায় থেমে থেমে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘাত হয়। রাস্তায় যান চলাচল তেমন ছিল না। গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে অবস্থান নিয়ে ছিলেন সেনা সদস্যরা।

তাদের পাহারার মধ্যেই দিনভর সংঘাতে ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নিতে আসেন ১৮৯ জন, যাদের মধ্যে ৭৬ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দিন শেষে ঢাকা মেডিকেলে মারা যান ১২ জন। 

শনিবার দিনভর কয়েকটি জায়গায় থেমে থেমে সংঘাত চললেও জ্বালাও-পোড়াও বন্ধ হয়ে যায়। যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা-রামপুরা এলাকায় পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব, বিজিবি ও সেনাসদস্যরা সাঁজোয়া যান নিয়ে অবস্থান নেয়।

রোববার

সংঘাত ও কারফিউর মুখে রবি ও সোমবার সারা দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার, যা পরে মঙ্গলবার পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়।

সেনাবাহিনীর সহায়তায় পুলিশ ও বিজিবির অভিযানের মুখে ঢাকার সংঘাত কমে আসে। এর মধ্যেও যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, স্টাফ কোয়ার্টার, মোহাম্মদপুর এলাকায় থেমে থেমে সংঘর্ষের খবর শোনা যায়। 

এসব এলাকা থেকে দিনভর ৬৫ জন আহত ব্যক্তি ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নেন; যাদের মধ্যে ২০ জনকে ভর্তি করা হয়। রোববার সংঘাতে নিহত আটজনের লাশ ঢাকা মেডিকেলে ছিল, যাদের মধ্যে তিনজন সংঘাতে আহত হয়ে ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। 

সোমবার

সোমবার ঢাকায় তেমন সংঘাতের খবর পাওয়া যায়নি। দুদিন অনেকটা শান্ত থাকার পর মানুষ নানা প্রয়োজনে ঘর থেকে বেরিয়েছে। কারফিউ শিথিলের ৩ ঘণ্টায় অনেক রাস্তায় যানজটও লেগে যায়।

৩ পুলিশ ও ১ আনসারের প্রাণহানি

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছেন, সংঘাতময় পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে ৩ পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছে। সারাদেশে আহত হয়েছে ১ হাজার ১১৭ জন পুলিশ সদস্য, যাদের মধ্যে ১৩২ জনের অবস্থা গুরুতর, আইসিইউতে আছে তিনজন।

আনসার সদর দপ্তরের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) রুবেল হোসাইন জানান, সংঘাত থামাতে গিয়ে একজন আনসার সদস্য নিহত ও ৯৮ জন আহত হয়েছে। নিহত জুয়েল শেখ মতিঝিল থানায় অঙ্গীভূত হিসেবে ছিলেন। সেখানেই দাঙ্গাকারীদের সঙ্গে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার একপর্যায়ে তিনি নিহত হন।

ঢাকা মেডিকেলে ৭৯ লাশ, সোহরাওয়ার্দীতে ১১

সংঘাতের আট দিনে (১৫ থেকে ২২ জুলাই) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক হাজার ৭১ জনের ভর্তি হওয়ার তথ্য দিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুজ্জামান।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে মঙ্গলবার বলেন, ভর্তি হওয়াদের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ১৯ জন। এছাড়া সংঘাতের সময় মৃত অবস্থায় ৬০ জনকে হাসপাতালে আনা হয়।

চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ কতজন, এ প্রশ্নের উত্তরে আসাদুজ্জামান বলেন, “প্রথমদিকে যে আহতরা এসেছিল, সবার জখমের ধরন ছিল ইট-পাটকেল বা লাঠিসোঁটার আঘাত। বৃহস্পতিবার থেকে গুলিবিদ্ধ রোগী আসতে শুরু করে। বলতে পারেন, মোটামুটি মোট আহতের অর্ধেকের মতো গুলিবিদ্ধ রোগী।”

সংঘাতের সবচেয়ে ভয়াবহ দিন শুক্র ও শনিবার হাসপাতালের পরিস্থিতি কেমন ছিল, এ প্রশ্নের উত্তরে পরিচালক বলেন, “আমরা আমাদের সব রিসোর্স দিয়ে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি মানুষকে বাঁচাতে। সেদিন এতো রোগীকে গজ-ব্যান্ডেজ সরবরাহ করা থেকে শুরু করে তাদের চিকিৎসা দেওয়া ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জ। হাসপাতালের কোথাও কোনো জায়গা ছিল না। 

“এমনিতেই ঢাকা মেডিকেলে সিটের দ্বিগুণ রোগী প্রায় সবসময়ই থাকে। তার ওপর এতো রোগীকে আমরা কোথায় জায়গা দেব? জায়গা নেই, বিছানা নেই- সবকিছু ম্যানেজ করতে গিয়ে আমাকে রাতে হাসপাতালেই থাকতে হয়েছে।”

চিকিৎসকদের আনা-নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত অ্যাম্বুলেন্সও দাঙ্গাবাজদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি জানিয়ে তিনি বলেন, “কয়েকশ ডাক্তার শহরের বিভিন্ন জায়গায় থাকেন। আমরা ডাক্তারদের বিভিন্ন জায়গা থেকে অ্যাম্বুলেন্সে আনা-নেওয়া করেছি। 

“এর মধ্যেই উত্তরা থেকে আসার সময় ডাক্তারদের বহনকারী একটি অ্যাম্বুলেন্সে হামলা চালায় দাঙ্গাকারীরা। তাতে গাড়িটি ভেঙে গেলেও ডাক্তাররা অক্ষত ছিলেন। অ্যাম্বুলেন্স চালক টান দিয়ে চলে আসে।”

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক শফিউর রহমান বলেন, তার হাসপাতালে সংঘাতে ১১ জনকে মৃত অবস্থায় আনা হয়। চিকিৎসা নিয়েছেন চার শতাধিক। মঙ্গলবার পর্যন্ত সেখানে সংঘাতে ৩৫ জন আহত রোগী ভর্তি ছিলেন।

ঢাকার মুগদা, মিটফোর্ড, কুয়েতমৈত্রী হাসপাতালসহ সরকারি হাসপাতালগুলোতে সংঘাতে হতাহতরা চিকিৎসা নিয়েছেন। ওই সব হাসপাতালেও মৃত অবস্থায় অনেককে আনা হয়েছে, আবার অনেকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তবে সেগুলোর বিষয়ে সরকারি কোনো ভাষ্য পাওয়া যায়নি।