Published : 21 Nov 2025, 12:58 PM
ভূমিকম্পে কাঁপুনিতে ভবন কেঁপে উঠতেই ভয়ে আতঙ্কে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর সামিনা ইয়াসমিন সন্তানের হাত ধরে আর কোলে পোষ্য নিয়ে হুড়মুড় করে তিনতলা থেকে নিচে নেমে আসেন। একই ভবনের আওলাদ হোসেনও ভয় পেয়েছিলেন প্রচণ্ড, তবুও তিনি নিচে না নেমে ঘরের দেয়ালের কোনায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।
সামিনা ইয়াসমিন, আওলাদ হোসেনের মত এই শহরে বহুতল ভবনে বাস করা বহু মানুষ ভূমিকম্পের সময় যে যেমন অবস্থায় ছিলেন, সে অবস্থাতেই শিশু সন্তানদের সঙ্গে নিচে নেমে আসেন নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেন। তবে যেসব বাসায় বয়স্ক এবং অসুস্থ মানুষ আছেন, তারা ঘরেই ছিলেন।
কলাবাগানের লেক সার্কাস রোড, হাতিরপুল, সেন্ট্রাল রোড, ধানমন্ডি ২৭ নম্বর, এলিফেন্ট রোড, মিরপুর, গুলশান, পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায়, মানুষকে দ্রুত ভবন ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় কে কার আগে নামবেন তা নিয়ে তাদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কিও হয়।
নিচে নেমে অনেককে ভিডিও করতে দেখা যায়। এছাড়া সোশাল মিডিয়ায় কেউ কেউ বাসার দেওয়ার ফেটে যাওয়ার ভিডিও পোস্ট করেছেন।

বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা রুবায়েত কবীর জানান, শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে এ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫.৭ ।
মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র ছিল ঢাকা থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে, ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে।
ছুটির দিনে শহরের মানুষের দিনটি শুরু হয় কিছুটা ঢিলেঢালাভাবে। কেউ সবে সকালের নাস্তা সেরেছেন। কেউ ঘরের কাজ করছিলেন, কারো কারো সকালের ঘুমও ভাঙেনি। এমন সময় শক্ত ঝাঁকুনিতে কেঁপে ওঠে ঘরবাড়ি, ঢাকাসহ সারা দেশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
কম্পন চলাকালে চিৎকার ও আর্তনাদ শোনা যায় বিভিন্ন ভবন থেকে। শিশুরা বেশি ভয় পেলে কান্নার আওয়াজ চতুর্দিকে ছড়িয়ে যায়।
যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় ভূমিকম্প শুরু হলে নারী, পুরুষ ছোটোবড় সবাই ভবন থেকে বেরিয়ে গলি ও সড়কে অবস্থান নেয়।
কাজলায় সামিনা ইয়াসমিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এমন কাপাকাপি শুরু হল, মনে মনে ভাবলাম এই শেষ, বিল্ডিং ভাঙবেই। তাই বাচ্চা আর বিড়াল নিয়ে দৌড়ে তিন তলা থেকে নামলাম।”
ভবনের বিমের নিচে আশ্রয় নেওয়া আওলাদ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, " দেয়াল ধরে দাঁড়িয়েছিলাম। ভাবলাম একটু কমলে নামবো। দেয়ালই তো দোলাদুলি শুরু করলো। এমন দোলুনি যে এই বুঝি ভাঙবে। তাই আর নামিনি, জীবনেও এমন ভূমিকম্প দেখিনি।”
একে তো কম্পন বেশি ছিল তাও আবার অনেক সময় ধরে হয়েছে বলে মন্তব্য করেন আওলাদ হোসেন।

যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা আবু তালেব বলেন, “ভুমিকম্পটা কিন্তু বেশ ভয়াবহ ছিল। আমি যে ভবনে থাকি সেটি ৮ তলা। যেভাবে দুললো মনে হচ্ছিল, এই বুঝি পড়ে যাবে মাথার উপর।”
জাতীয় প্রেস ক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে চলছিল জাতীয়তাবাদী মৎসজীবী দলের অনুষ্ঠান ছিল। কম্পন শুরু হলে অনুষ্ঠানস্থলে থাকা কয়েকশ মানুষকে দ্রুত খোলা স্থানে চলে যেতে দেখা যায়
পুরানা পল্টনে একটি ভবনের সাততলায় থাকা আবিদুর রহমান বলেন, “ভূমিকম্প হঠাৎ পুরো বিল্ডিং কেঁপে উঠে। দ্রুত নামবো সেটাও কোনা উপায় ছিলো না। দুই ছেলে আর স্ত্রীকে নিয়ে এক কোনায় দাঁড়িয়েছিলাম আল্লাহকে স্মরণ করছিলাম।
“পরে শুনেছি সিঁড়িতে দিয়ে অনেকে নেমে নিচে রাস্তায় গেছেন।”
ধানমন্ডি ১ নম্বর সড়কের বাসিন্দা উদ্যোক্তা তানভীন তিশা বলেন, “বুঝতে এক মুহূর্ত সময় লাগে যে ভূমিকম্প হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে আমার পাঁচ বছরের ছেলেকে কোলে নিয়ে পাঁচতলা থেকে সিড়ি দিয়ে নেমে নিচে গ্যারেজে নেমে আসি। আমার স্বামী এবং শাশুড়িও সঙ্গে ছিলেন। জীবনে এমন ভূমিকম্প আমি দেখিনি। এখনো মনে হলে ভয় পাচ্ছি।”
একই বাড়িতে থাকা চিকিৎসক রেজওয়ানা বুশরা বলেন, ছুটির দিন হওয়ায় দেড় বছরের মেয়েকে নিয়ে তিনি ঘুমাচ্ছিলেন।
“ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙে গেল। বেশ ভয় পেয়েছি।”
এলিফেন্ট রোডের বাসিন্দা উর্মিলা বসাক থাকেন ১৬ তলা ভবনের নয়তলায়। কম্পন শুরু হতেই পোষ্যকে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে বাইরে আসেন।

তিনি বলেন, “যে দুলুনি হয়েছে, বুঝছি যে ঘরের ভেতরে থাকা যাবে না। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামব। কিন্তু আমার পোষা কুকুর ভয় পাচ্ছে নিচে যেতে। কি করব বুঝতে পারছিনা।”
হাতিরপুল থেকে এলিজা পারভীন জানালেন বাড়িতে তার বয়স্কা মা অসুস্থ মানুষ আছেস।
“মাকে নিয়ে ৬ তলা থেকে নিচে নামতে পারিনি। কিছু হলে এখানেই হবে। বিপদ ঠেকাতে পারবো না। ভয় পেয়েছি অনেক।”
এই শহরে এর চেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতি পরিমাণ বলে হয়ত শেষ করা যাবে না বলে মন্তব্য করেন এই চিকিৎসক।
মিরপুরের কাজী আব্দুল বাসেত জানিয়েছেন, তিনি দুইতলায় থাকলেও ভূমিকম্পের কম্পন ভালোই বুঝতে পেরেছেন।
“রুমের সব ফার্নিচার কাঁপছিল। আমার স্ত্রী ওই সময়ে ছাদে ছিলেন। তাকে নিচে নামতে নিষেধ করলাম।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের রিপোর্টার নিফাত সুলতানা বলেন, “আমরা সবাই কাজ করছিলাম। ১৭ তলা ভবনের সবকিছু দুলে ওঠে।”
থেমে যাওয়ার পর আবার কম্পন শুরু হয় কী না সেই আতঙ্কে ছিলেন নিফাত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরর হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের তিনতলা ও মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের চারতলা থেকে নিচে লাফ দিয়ে তিন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।
ওই সময়ে আবাসিক হলের শিক্ষার্থীরা নিচে নেমে খোলা জায়গায় জড়ো হন।