১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ দেওয়া ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত

‘এখতিয়ারের বাইরে’ গিয়ে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 12 Aug 2026, 10:20 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:49 PM

ইসলামী ব্যাংকের যে কর্মকর্তা সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দিয়েছিলেন, তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

ইসলামী ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ কর্পোরেট শাখার ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ ইয়াসীন আলীকে মঙ্গলবার সাময়িক বরখাস্ত করে ট্রেনিং একাডেমিতে সংযুক্ত করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। 

ইসলামী ব্যাংক থেকে ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, সাইফুল আলমসহ (এস আলম) ৩৮ জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের জন্য দুদকে অভিযোগ করেছিলেন ইয়াসীন আলী। সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পাঁচ দিন পরই গেল ২৯ জুলাই ইসলামী ব্যাংকের পক্ষে ইয়াসীন দুদকে অভিযোগটি জমা দেন।

ব্যাংক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ মনে করছে, ইয়াসীন আলীর বিরুদ্ধে ‘এখতিয়ারের বাইরে’ গিয়ে কাজ করেছেন।  তবে দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে ইয়াসীনকে ইসলামী ব্যাংকের ‘ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কাছে ইয়াসীনকে সাময়িক বরখাস্তের তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ইয়াসিনকে সাময়িক বরখাস্ত করে এখন বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

আলতাফ হোসেন বলেন, “তার এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে এ ধরনের কাজ করার কারণে ম্যানেজমেন্ট মনে করেছে, তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে দেখা দরকার তিনি কেন কাজটি করেছেন, কোন প্রেক্ষাপটে করেছেন এবং এর পেছনে যৌক্তিক কারণ আছে কি না। 

“যদি দেখা যায় যৌক্তিক কারণ আছে, তাহলে তার সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার হবে। আর যদি দেখা যায়, কাজটি করার এখতিয়ার তার ছিল না, তাহলে সার্ভিস রুল অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটাই নিয়ম।”

কী ধরনের নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে ইয়াসীনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত বলতে চাননি আলতাফ। 

জানতে চাইলে তিনি বলেন, “না, না, এটা আমি মিটিংয়ের মধ্যে আছি। আমার সামনে অন্তত ২০ জন লোক। এখন সব বলতে পারব না এখন। আর আমার অফিসের ইন্টারনাল ভায়োলেশন আমি কীভাবে আপনাকে বলব?”

২৯ জুলাইয়ে দেওয়া  ওই অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ‘অনুমোদিত শাখা’ ফরেন এক্সচেঞ্জ কর্পোরেট শাখার পক্ষে ‘ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি’ হিসেবে ইয়াসীন দুদকে আবেদনটি করেছেন। অভিযোগপত্রে তার পদবি লেখা হয়েছে ‘ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট’। সেখানে তাকে ‘দরখাস্তকারী’ হিসেবেও দেখানো হয়েছে।

ইসলামী ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, দুদকে অভিযোগ দেওয়ার জন্য মোহাম্মদ ইয়াসীন আলীকে লিখিতভাবে ক্ষমতা দিয়েছিল ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। গত ২৭ জুলাই ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ কর্পোরেট শাখা থেকে দেওয়া ক্ষমতাপত্রে বলা হয়, “ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেড, গ্যালাক্সি সোয়েটার ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ করবেন ইয়াসীন।সক্ষমতাপত্রে অভিযোগের বিষয়টি পরিচালনার দায়িত্বও ইয়াসীনকে দেওয়া হয়।”

গত ২৯ জুলাই দুদকের দৈনিক ও সাম্প্রতিক অভিযোগ সেলে আবেদনটি জমা দেন ইয়াসীন। অভিযোগের বিষয় হিসেবে লেখা হয়, ইসলামী ব্যাংকের বৈদেশিক বাণিজ্য কর্পোরেট শাখা থেকে সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেডের নামে-বেনামে ঋণের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ।

এতে সদ্য রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়।

সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক ও ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। ব্যাংকের অভিযোগ, ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ঋণসীমা জালিয়াতির মাধ্যমে বাড়ানো হয়।

প্রতিষ্ঠানটির ঋণসীমা ১০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি টাকা করা হয়। পরে ওই ঋণের অর্থ তুলে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ব্যাংকটি।

অভিযোগে বলা হয়েছে, অ্যাননটেক্স গ্রুপের ইউনুস বাদলের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেডকে অবৈধভাবে ঋণ পাইয়ে দিতে এস আলম ভূমিকা রাখেন।

তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের সদস্য সাহাবুদ্দিন এবং ব্যাংকের সাবেক কয়েকজন ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখেন এবং আর্থিকভাবে লাভবান হন বলেও অভিযোগের তুলে ধরা হয়। 

ইসলামী ব্যাংকের দাবি, চারটি অডিট ফার্মের মাধ্যমে বিষয়টি তদন্ত করা হয়েছে। সেখানে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণে বিভিন্ন অনিয়ম ও অসংগতি পাওয়ার পর দুদকে অভিযোগ করা হয়।

দুদকে দেওয়া অভিযোগে সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতি পরিচয় উল্লেখ করেনি ইসলামী ব্যাংক। তাকে ব্যাংকটির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দেখানো হয়েছে। সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। চলতি বছরের ২৪ জুলাই অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করেন।

রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে সাহাবুদ্দিন দুদকের কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

তবে ইসলামী ব্যাংকের অভিযোগটি এখনই আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধানে যাচ্ছে না । দুদকে বর্তমানে কমিশন না থাকায় পরবর্তী প্রক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। 

মঙ্গলবার সাংবাদিকদের দুদক সচিব সাইদুর রহমান খানও বলেন, “বর্তমানে দুদকের কমিশন নেই। এ ধরনের অভিযোগ কমিশনের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়। শিগগিরই নতুন কমিশন গঠিত হবে বলে আমরা আশা করছি। এরপর অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”