২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭ আশ্বিন ১৪৩৩

মহাসড়কে ‘থাবা পার্টি’ হানা দেয়, পুলিশকে বলেও ‘সহায়তা মেলে না’

জ্যাঠার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে গত ১৪ ডিসেম্বর মাঝরাতে গাড়ি ভাড়া করে পরিবারের কয়েকজনকে নিয়ে ঢাকা থেকে চাঁদপুরে রওনা হয়েছিলেন চাকরিজীবী সুবীর শীল অপু। পথে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থানা এলাকার মেঘনা সেতুর আগে যানজটের মধ্যে পড়েন ডাকাতের কবলে।

গোলাম মর্তুজা অন্তু গোলাম মর্তুজা অন্তু

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 01 Mar 2022, 12:19 AM

Updated : 02 Aug 2022, 03:01 PM

কিছু বুঝে ওঠার আগেই ১০-১২ জন গাড়ির কাচ ভেঙে প্রথমে চাবি নিয়ে নেয়। এরপর অস্ত্রের মুখে পাঁচটি মোবাইল ফোন, নগদ ৫৩ হাজার টাকা ও আট ভরির মতো স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে যায়।

স্বজনের মৃত্যুতে মুহ্যমান পরিবারটির কাছে ডাকাতির শিকার হওয়ার পরের অধ্যায়টাও কম কষ্টের নয়। তা হচ্ছে পুলিশের আচরণ।

সুবীর বলেন, ডাকাতির পরপরই তিনি ৯৯৯ এ ফোন করে সোনারগাঁ থানার একজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি একে গুরুত্বই দেননি।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মেঘনা সেতুর টোল প্লাজার আগে এবং ইউলুপগুলোতে তৈরি হওয়া যানজটের মধ্যে এরকম ডাকাতির ঘটনা বেশ ঘটছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। যানজটের মধ্যে হুট করে দেশি অস্ত্রশস্ত্র নিয়েই পালিয়ে যায় ডাকাতরা।

Image
সোনারগাঁয় এমন যানজটের মধ্যে ঘটে ডাকাতির ঘটনা।

সোনারগাঁয় এমন যানজটের মধ্যে ঘটে ডাকাতির ঘটনা।

নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সদস্যরা এদের নাম দিয়েছে ‘থাবা পার্টি’। তারা বলছে, এই দুর্বৃত্তরা টহলের ফাঁকে দেড় থেকে দুই মিনিটের মধ্যেই ডাকাতি করে পালিয়ে যায়। ফলে টহলে থাকলেও অনেক সময় ধরা যায় না।

ডিসেম্বরের পর গত ১৮ ফেব্রুয়ারি রাতেও মেঘনা সেতুর টোল প্লাজার যানজটে পৃথকভাবে ডাকাতির শিকার হন তিন প্রবাসী।

ওই রাতে সৌদি আরব থেকে ঢাকার হজরত শাহজালার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামেন কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের আলকরা ইউনিয়নের গেয়াসউদ্দীন সবুজ, কাজী জামালউদ্দীন ও জাহিদ হাসান। তিনজনই পরস্পরের আত্মীয়। মধ্যরাতের দিকে তারা দুটি মাইক্রোবাসে করে বিমানবন্দর থেকে বাড়িতে রওনা হয়েছিলেন। মেঘনা সেতুর যানজটে থেমে থাকা অবস্থায় তাদের দুটি গাড়িতে হামলা হয়। লুটে নিয়ে যায় লাগেজ, ফোন, টাকা, স্বর্ণালঙ্কার।

গেয়াসউদ্দীন ও জামালউদ্দীন ছিলেন একটি গাড়িতে। তারা সোনারগাঁ থানায় গেলে পুলিশ তাদের কাছ থেকে মামলা না নিয়ে পাসপোর্ট হারানোর জিডি নিয়েছিল।

তবে ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর রোববার তাদের মামলা নিয়েছে সোনারগাঁ থানা পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয়েছে দুজনকে।

ওই সড়কে এরকম ডাকাতির কবলে পড়েছেন, এমন আরও তিনজন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, ঘটনার পর তারা পুলিশের সাহায্য পাননি।

বিমানবন্দর থেকে ফেরার পথে টোল প্লাজার কাছে ডাকাতি, ৩ প্রবাসীর মামলা ‘নেয়নি’ থানা  

যেভাবে হয় ডাকাতি

ডাকাতির শিকার সুবীর ১৪ ডিসেম্বর রাত ১১টার দিকে জ্যাঠার মৃত্যুর খবর পান। তারপর একটি গাড়ি ভাড়া নিয়ে চাঁদপুরে রওনা হয়েছিলেন। রাত আড়াইটার দিকে সোনারগাঁ থানাধীন পিরোজপুর এলাকায় যানজটে পড়ে তার গাড়ি।

তিনি বলেন, তাদের গাড়িটি রাস্তার একদম ডানপাশে ডিভাইডার ঘেঁষে চলছিল। সামনে-পেছনে আরও গাড়ি ছিল।

“হঠাৎ দেখি দুজন লোক রাস্তায়, আমি ভেবেছি বোধহয় তারা রাস্তা পার হবে। এরপর তাদের পেছনে দেখি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আরও ৮-১০ জন। তারা এসেই গাড়ির কাচ ভাঙল, চাবিটা নিয়ে নিল। গাড়ির চারপাশ ঘিরে তারা অস্ত্র দেখিয়ে সব নিয়ে গেল।”

সব মিলিয়ে মহাসড়কের মাঝখানে পাঁচ মিনিটের মধ্যে তারা লুটপাট চালিয়ে চলে যায়।

ডাকাতির পর গাড়ি চালিয়ে মেঘনা সেতু পেরিয়ে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া এলাকায় গিয়ে থামে সুবীরের গাড়ি। সেখান থেকে ৯৯৯ এ ফোন করলে গজারিয়া থানার একজন এসআইকে যুক্ত করে দেওয়া হয় তাকে।

“কিছুক্ষণের মধ্যে ওই এসআই এসে আমাদের সঙ্গে দেখা করেন, ঘটনা শুনে তিনি সোনারগাঁ থানায় যোগাযোগ করতে বলেন। এরপর আবার ৯৯৯ এর মাধ্যমে সোনারগাঁ থানার ওই এলাকায় টহলে থাকা এসআইয়ের সঙ্গে যুক্ত হই আমরা। কিন্তু তিনি বারবারই বলছিলেন যে তিনি ওখানে টহলে আছেন, সেখানে তো কিছুই হয়নি। আমি বললাম, ভাই আমি তো ভুক্তভোগী।”

ভোরে গাড়িসহ সোনারগাঁ থানায় যান সুবীর ও তার স্বজনরা। সুবীর বলেন, “থানায় আরও অদ্ভুত পরিবেশ। সেখানকার পুলিশ সদস্যরা বারবারই বলছেন, ‘আপনাদের তো কিছুই হয়নি, অমুক ব্যবসায়ীর ৪৫ লাখ নিয়ে গেছে, তমুককে কুপিয়ে রেখে গেছে’। এসব শুনিয়ে তারা আমাদের ঘটনাকে একেবারেই খুব স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখার চেষ্টা করছিল।”

পরে সুবীরের জ্যাঠাতো ভাই ডা. সঞ্জয় শীল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেন। ওই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে শেষ পর্যন্ত কী হয়েছে, সেটা এখনও তারা জানেন না।

সুবীর বলেন, “ওই ঘটনার পর এখনও ট্রমা কাটেনি। রাতের বেলায় বের হওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। যারা এরকম ঘটনার শিকার হননি, তারা কখনোই বুঝবেন না যে মনের মধ্যে কী ভয় কাজ করে।”

Image
মেঘনা সেতুর টোল প্লাজার আগে যানজটের মধ্যে ডাকাতির শিকার হওয়া তিন প্রবাসী। ফাইল ছবি

মেঘনা সেতুর টোল প্লাজার আগে যানজটের মধ্যে ডাকাতির শিকার হওয়া তিন প্রবাসী। ফাইল ছবি

ওই রাস্তায় নিয়মিত চলাচলকারী ট্রাক ও পিকআপ চালকেরা বলছেন, তারা এ রকম ঘটনা ঘটতে দেখেছেন। কখনও কয়েকজন ট্রাকচালক মিলে ধাওয়াও করেছেন। তবে পুলিশের কাছে কোনো সাহায্য পাওয়া যায়নি।

রাসেল খান নামে একজন ট্রাকচালক বলেন, মালামাল আনা-নেওয়া করতে প্রায়ই তাকে ট্রাক নিয়ে ‘ফ্রেশ কোম্পানিতে’ (মেঘনা গ্রুপ) যাতায়াত করতে হয়। এই পথে তিনি মোগরাপাড়া, নাঙ্গলবন্দ ও মেঘনা টোল প্লাজার কাছে ডাকাতি হতে দেখেছেন। রাসেল বলেন, “পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয় না। ডাকাতগুলান সব আশপাশের টোকাই পোলাপাইন। কাম কইরাই ওরা পালায়। পুলিশ চাইলে ওদের বাসা থেকে ধরে আনতে পারে।”

মো. মোক্তার নামে এক পিকআপভ্যানচালক বলেন, “ওই এলাকায় রাতের বেলায় যানজটে আটকালে ছোট ট্রাক বা পিকআপগুলোতেও ডাকাতেরা হামলা করে। কিন্তু পুলিশ কোনো হেল্প করে না।”

বেলাল আলম নামে আরেক ভুক্তভোগী বলেন, গত বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি একই স্থানে ফজরের নামাজের সময় তিনি ডাকাতদের হামলার শিকার হয়েছিলেন। ডাকাতদের মারধরে আহতও হয়েছিলেন।

তখন পুলিশকে জানিয়েছিলেন জানিয়ে বেলাল বলেন, “তারা বলে, তাদের কিছুই করার নেই। অথচ পুলিশ চাইলেই ওদের ধরতে পারত।”

এ বিষয়ে বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মহাসচিব নূর খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অপরাধীর বিরুদ্ধে পুলিশ পদক্ষেপ নেবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের পুলিশ এমন একটা ব্যবস্থা চালু করেছে, যাতে তারা অপরাধের ঘটনাগুলো দেখেও না দেখার ভান করে এড়াতে চায়।”

কেন তা হয়- সে বিষয়ে তিনি বলেন, “এর একটা কারণ হতে পারে যে, কোনো থানায় ডাকাতির মামলা নিলে পুলিশের উপর তা উদঘাটনের একটা চাপ তৈরি হয়। এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ইন্ডিকেটরে ওই থানার অবস্থান নিচে নেমে যায়। যার কারণে তারা মামলা নিতে চান না। কিন্তু এই ব্যবস্থাকে বদলাতে হবে।”

৩ প্রবাসীর ডাকাতির ঘটনায় অবশেষে মামলা, গ্রেপ্তার ২  

‘চেষ্টা করেও পারে না’ পুলিশ

মহাসড়কের ওই এলাকার নিরাপত্তায় একযোগে কাজ করছে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ এবং হাইওয়ে পুলিশ। উভয় ইউনিটের কর্মকর্তারাই দাবি করছেন, তাদের চেষ্টার কমতি নেই, কিন্তু পারছেন না।

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের ‘খ’ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ বিল্লাল হোসেন বলেন, রাতে মহাসড়কের মেঘনা সেতু থেকে লাঙ্গলবন্দ পর্যন্ত সাতটি টহল দল মোতায়েন থাকে।

“আমরা সর্বোচ্চভাবে চেষ্টা করি, যাতে রাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে। কিন্তু তারপরও হয় কী… বিশেষ করে জ্যাম লাগলে এ ধরনের ঝামেলাগুলো বেশি হয়।”

তিনি বলেন, “আমাদের অবজারভেশন হচ্ছে মেঘনা টোলপ্লাজায় যখন জ্যাম লেগে যায়, তখন এমন অবস্থা হয় যে দুই-তিনশ গজ দূরেও কিছু হলে সেটা টের পাওয়া যায় না। আর তখন তো গাড়ি এগোতে পারে না। হেঁটে হেঁটে মুভ করতে হয়। আর হেঁটে মুভ করে এরকম হাইওয়েতে কাভার করাটা খুব টাফ হয়ে যায়।”

এ ধরনের ঘটনা এড়াতে টোল নেওয়ার গতি বাড়ানোর উপর জোর দিচ্ছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

“আর যে ইউলুপগুলো আছে সেগুলোতে যানজট লেগে গেলেও ঝামেলাগুলো হয়। যেটার জন্য আমরা ইউলুপগুলোতে আমরা ফোর্স বাড়িয়েছি। রাতে ইউলুপে অবশ্যই লোক থাকে এবং সিনিয়র অফিসাররা এটা তদারকি করেন। হাইওয়ে পুলিশের রাতে ২-৩টা পার্টি থাকে তারাও কাজ করে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টাটা করছি। এর আগেও একাধিক গ্রুপ ধরা হয়েছে, মামলা হয়েছে।”

ডাকাতির পর থানায় গেলে পুলিশের সহায়তা পাওয়া যায় না- এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে অতিরিক্ত এসপি বিল্লাল বলেন, “কেউ অভিযোগ করলে আমরা অবশ্যই মামলা নিই।”

হাইওয়ে পুলিশের নারায়ণগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার অমৃত সূত্রধর বলছেন, ওই এলাকায় হাইওয়ে পুলিশের একটা টহল পার্টি জেলা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে রাত ৮টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত টহল দেয়। তাদের এলাকা মদনপুর থেকে মেঘনা সেতু পর্যন্ত।

তিনি বলেন, “অনেক সময় হয় যে রাতের বেলায় টোল প্লাজায় যখন শিফট চেঞ্জ হয় বা ওদের একটা বুথ বন্ধ রাখতে হয়, তখন যানজট পড়ে যায়। আর তখনই এ ধরনের সমস্যাগুলো বেশি হয়। তারপরও আমরা চেষ্টা করি সবসময় ওয়্যারলেসে যোগাযোগ রাখতে আর বলে দিই, যখন যেখানে যানজট পড়বে, তখন সেখানে টহল দল যেন একটু বেশি সময় দেয়।”

পুলিশের সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ নিয়ে এএসপি অমৃত বলেন, “আমরা টহল দলকে বলে দিই যে কোনো ভিকটিম যদি যোগাযোগ করে, তাহলে দ্রুততম সময়ে ওই স্পটে গিয়ে বা ভিকটিমের কাছ থেকে পুরো ঘটনা শুনে যদি সম্ভব হয় তাহলে ব্যবস্থা নেবে।

“কিন্তু সমস্যা হল এগুলো তো ঘটে হুটহাট। ওরা (ডাকাতরা) খোঁজ রাখে, যখন দেখে আশপাশে কোনো পুলিশ নাই হয়ত পুলিশ অন্য এলাকায় আছে, তখনই রাস্তায় এসে এক-দেড় মিনিটের মধ্যে কাজ সেরে চলে যায়। তারপরও আমাদের নির্দেশনা হচ্ছে কোনো ভিকটিম যোগাযোগ করলে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তাদের সহায়তা করা। আমরা আসামি গ্রেপ্তার করতে না পারলে তাদের থানায় পাঠানোর ব্যবস্থা করি। যাতে তারা ইচ্ছুক হলে মামলা করতে পারেন। যা হবার হয়েছে, এরকম বলার সুযোগ নেই কোনো পুলিশ সদস্যের।”

কাচপুর হাইওয়ে থানার ওসি সাজ্জাদ করিম খান বলেন, পুলিশ যানজট ছোটাতে মনোযোগী হলে সেই ফাঁকে ডাকাতির মতো ঘটনা ঘটে যায়।

“এই সুযোগে ওখানকার কিছু লোকাল পোলাপান মাঝেমাঝে দেখা যায় রাস্তার পাস থেকে পুট করে এসে এক মিনিটে কাজ সেরে চলে যায়।”