সীমান্তে প্রাণক্ষয় অপরাধের কারণে: জয়শঙ্কর

বাংলাদেশ সীমান্তে প্রাণক্ষয়ের পেছনে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে মূল কারণ হিসেবে দেখছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 4 March 2021, 09:53 AM
Updated : 4 March 2021, 06:58 PM

বৃহস্পতিবার ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জয়শঙ্কর এ কথা বলেন।

সীমান্ত হত্যা নিয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “আমি মনে করি, আমরা একমত হয়েছি, যে কোনো মৃত্যুই দুঃখজনক। কিন্তু আমাদের নিজেদের জিজ্ঞেস করতে হবে, সমস্যাটি কেন হচ্ছে। এবং আমরা জানি সমস্যাটি কী। সমস্যা হচ্ছে অপরাধ।

“সুতরাং আমাদের মিলিত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ‘অপরাধহীন ও মৃত্যহীন’ সীমান্ত। আমি নিশ্চিত, আমরা যদি এটা করতে পারি, অপরাধহীন ও মৃত্যহীন সীমান্ত, তাহলে একসাথে এই সমস্যার সমাধান করতে পারব।”

জয়শঙ্কর বলেন, “যেটাকে আমরা সীমান্ত হত্যা বলি, মূলত অনেকগুলো মৃত্যু হয় ভারতের বহু ভেতরে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী (মোমেন) এবং আমি এ ব্যাপারে আলোচনা করেছি, যেভাবে প্রতিবেশী ও বন্ধুর সঙ্গে আলোচনা হওয়া দরকার।”

রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির সময়সীমা নিয়ে এক প্রশ্নে কৌশলী উত্তর দিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। খুব শিগগির আমাদের সচিবদের বৈঠক রয়েছে। আমি নিশ্চিত, তারা এ বিষয়ে পরবর্তী আলোচনা চালিয়ে নেবেন।

“আমি মনে করি, আপনারা এক্ষেত্রে ভারত সরকারের অবস্থান জানেন, যা এখনো পরিবর্তন হয়নি।”

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সফর চূড়ান্ত করতে বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকায় পৌঁছান জয়শঙ্কর।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসেন; প্রায় দেড় ঘণ্টা চলে তাদের এই বৈঠক।

যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “সম্পর্কের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যা নিয়ে আমরা বর্তমানে কাজ করছি না। আমাদের সম্পর্ক সত্যিকার অর্থে ৩৬০ ডিগ্রি। মানুষের সম্পর্কের সব ক্ষেত্রে আমরা কিছু না কিছু করছি। যতই কাজ করছি, ততই নতুন নতুন সম্ভাবনা উন্মোচিত হচ্ছে।”

পঞ্চাশ বছরের সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় যোগাযোগকে ‘বড় পরিসরে গুরুত্ব দেওয়া দরকার’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “কানেক্টিভিটির এই জায়গাকে আমরা বড় লক্ষ্য হিসাবে ধরে এগোতে পারি।”

রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বৃহস্পতিবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

জয়শঙ্করের মতে, ভারত ও বাংলাদেশ যদি কানেক্টিভিটির জায়গায় ঠিকমত কাজ করতে পারে, তাহলে পুরো অঞ্চলই বদলে যাবে; বঙ্গোপসাগরীয় এলাকাকে তখন অন্যরকম মনে হবে।

”আমরা উভয়দেশ মনে করি এটা সম্ভব। আজকের দিনে আমাদের আলোচনার বড় অংশজুড়ে ছিল এটা। আমরা চাইলে এক্ষেত্রে তৃতীয় কোনো দেশকেও একীভূত করতে পারি। যেমন জাপান, যাদের সঙ্গে আমাদের উভয়দেশের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। বঙ্গোপসাগরীয় এলাকায় জাপান অনেক কানেক্টিভিটি প্রকল্পে যুক্ত।”

এর আগে লিখিত বক্তব্যে জয়শঙ্কর বলেন, ”আমাদের সম্পর্ক গৎবাঁধা অংশীদারিত্বের ঊর্ধ্বে এবং আমি বিশ্বাস করি যে, আমাদের বন্ধন শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ এবং প্রগতিশীল দক্ষিণ এশিয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের কেন্দ্রবিন্দু।

”এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে উভয় পক্ষই এ সম্পর্কের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে, বিশেষত ২০১৪ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে।”

বাংলাদেশের সঙ্গে এই সম্পর্ক ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথমে’ এবং ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির প্রাসঙ্গিকতার মধ্যেই নিহিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জয়শঙ্কর বলেন, “আমরা বাংলাদেশকে কেবল দক্ষিণ এশিয়াতেই নয়, বিস্তৃত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলেও একটি মূল প্রতিবেশী এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করি।

”আমাদের সম্পর্কের প্রতিটি অর্জন সমগ্র অঞ্চলকে প্রভাবিত করে। সবাই জানেন যে, আমরা অন্যদের কাছে এই সম্পর্ককে একটি অনুকরণীয় উদাহরণ হিসেবে উদ্ধৃত করি।”

এ কারণেই নিরাপত্তা, বাণিজ্য, পরিবহন ও সংযোগ, সংস্কৃতি, মানুষে-মানুষে সম্পর্ক থেকে শুরু করে জ্বালানি ও অভিন্ন সম্পদ এবং প্রতিরক্ষা সম্পর্কের যৌথ বিকাশসহ সব ধরনের ক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণে কাজ চলছে বলে জানান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক কার্যক্রমগুলো ‘সাধারণ পরামর্শ এবং প্রস্তাবের ঊর্ধ্বে’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, এসব কাজে মাঠ পর্যায়েও বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে।

“সাম্প্রতিক কয়েকটি উদাহরণ হল- চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আগরতলায় পরীক্ষামূলকভাবে পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা, ত্রিপুরাকে আপনাদের জাতীয় নৌপথে সংযুক্ত করার জন্য অভ্যন্তরীণ নৌপথে দুটি নতুন প্রোটোকল রুট যুক্ত করা, ১০টি ব্রডগেজ লোকোমোটিভ হস্তান্তর, কন্টেইনার ও পার্সেল ট্রেন চলাচল শুরু এবং জ্বালানি খাতে একটি যৌথ উদ্যোগ গঠন।”

প্রত্যেকের অগ্রাধিকারকে পরস্পরের জন্য কীভাবে লাভজনক করা যায়, তার ওপর ভিত্তি করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন।

তিনি বলেন, “এই মাসের শেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফর আমাদের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। আমরা আনন্দিত, তিনি মুজিববর্ষ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী এবং ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৫০ বছর পূর্তির আয়োজনে অংশ নেবেন।”

ঢাকায় শিগগিরই বঙ্গবন্ধু ও মহাত্মা গান্ধীর ওপর ডিজিটাল প্রদর্শনীর উদ্বোধন হবে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “দুই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। করোনাভাইরাসের টিকাদানের ক্ষেত্রে দুই দেশের সমন্বিত উদ্বেগকে আমরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করি।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক