Published : 22 Apr 2020, 10:44 PM
এদিকে লকডাউনের মধ্যে খুব প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হতে বারণ করা হলেও তাতে গা করছেন না অনেকেই। পাঁচ-সাতজনের জটলা পাকিয়ে চলছে আড্ডা, ঘরে কাজ নেই তাই বাইরে বের হয়েছেন কেউ কেউ।
এই অবস্থা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী জুবায়ের হোসেন বলে উঠলেন, “আমরা ভালো হলাম না!”
মোহাম্মদপুরের টাউনহল মার্কেটের পেছনে গড়ে উঠা দীর্ঘদিনের কাঁচাবাজারটি মঙ্গলবার সরিয়ে টাউনহল মাঠে আনে পুলিশ। বুধবার সেখানে গিয়ে দেখা যায় হাতে গোনা কয়েকটি দোকান, প্রায় পুরো মাঠ খালি।
পুরানো জায়গায শতাধিক দোকান থাকলেও মাঠে দশটি দোকানও স্থানান্তর না হওয়ায় ওই ক্ষোভ উগরে দেন জোবায়ের। খোলা মাঠে কাঁচাবাজার বসেছে শুনে সেখানে বাজার করতে এসেছিলেন তিনি।
হতাশার সুরে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সবার ভালোর জন্য পুলিশ ব্যবস্থা নিল, কিন্তু কেউ কথা শুনছি না।”
তার কথায় সায় দেন বাজারের পাশের একটি বাড়ির বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব গোলাম আলম। তিনি বাড়ির সামনের রাস্তার পাশে থাকা একটি ভ্যানের উপরে বসে বাসা থেকে আনা চা খাচ্ছিলেন। পাশেই দুই-তিন জায়গায় ৪-৫ জন করে মানুষ বসে বা দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। ভাইরাস সংক্রমণ থেকে সুরক্ষায় ন্যূনতম দূরত্বের বিষয়টি তাদের জানা আছে কি না দেখে বোঝা গেল না।

তিনি আঙ্গুল উঁচিয়ে আশপাশের দৃশ্য দেখিয়ে বললেন, “কে মানছে নিয়ম-কানুন? রাস্তায় বের না হতে পারলে মানুষ খাবে কী? পুলিশই বা কী করবে?”
মাঠে ফাঁকা জায়গায় কেন দোকান বসছে না জানতে চাইলে কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী শাহজাহান বলেন, পুরনো জায়গা থেকে সরে টাউন হল মাঠে আসলে ক্রেতা পাওয়া যাবে না। তাছাড়া রোদ বৃষ্টির মধ্যে ফাঁকা জায়গার মধ্যে থাকাটা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হচ্ছে।
তিনি বলেন, পুরানো জায়গায তার দোকান রয়েছে। মঙ্গলবার মাঠে আসার সিদ্ধান্তের পর তিনি কারওয়ানবাজার থেকে বুধবার ভোরে কোনো কাঁচামাল আনেননি। আগে মাঠের ব্যবসা দেখে বুঝে তারপরে সিদ্ধান্ত নেবেন।

তার কথার সাথে সুর মেলান টাউনহল সিটি করপোরেশন কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি লূৎফর রহমান বাবুলও।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সাথে কথা বলে আগের জায়গায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছি।”
তাদের এই দাবি মেনে নেওয়া হবে না জানিয়ে মোহাম্মদপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুল আলীম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জনস্বার্থে টাউন হল মাঠে যে কাঁচাবাজার বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে তা বহাল থাকবে। কোনোভাবেই আর পূর্বের জায়গায় ফিরে যাবে না। পূর্বের জায়গায় এখন বাজার বসতে দেওয়া হবে না।”

সে কারণেই কাঁচাবাজারটি সরিয়ে মাঠে খোলা জায়গায় নেওয়া হয়েছে। তবে মাছের বাজার সরানো যায়নি। মাছ ব্যবসাযীরা সেখান থেকে সরতে নারাজ।
বেলা সাড়ে ১২টার দিকে টাউন হল মাছ বাজারে গিয়ে দেখা যায় সেই পুরনো দৃশ্য। আগেরমতোই একজন আরেকজনের গা ঘেঁষে কেনাকাটা করছেন। করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে সরকার যে লকডাউন দিয়েছে, তা তাদের জানা আছে কি না তা নিয়েই সংশয় দেখা দিল।
এই অবস্থার উত্তরণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের আরও কঠোর হওয়া দরকার বলে মন্তব্য করেন মাছ ব্যবসায়ী লোকমান হোসেন।

এখানকার মাছ ব্যবসায়ীরা না সরলেও মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট সংলগ্ন সিটি করপোরেশন কাঁচাবাজারের মাছ ব্যবসায়ীরা পুলিশের কথা শুনেছেন। তারা কৃষি মার্কেটের দক্ষিণ দিকের রাস্তায় বসা শুরু করেছেন। তবে কাঁচাবাজার ভেতরেই রয়েছে।
কৃষি মার্কেটের দক্ষিণ দিকে যে রাস্তাটি কাঁচা বাজার এবং মাছের বাজারকে আলাদা করেছে সেই রাস্তায় মাছ ব্যবসায়ীরা বসার পরেও সেখানে আরও অনেক জায়গা পড়ে রয়েছে। এসব মাছ ব্যবসায়ীদের অধিকাংশই অবাঙালি। পাশের জেনেভা ক্যাম্প বা বাজার ক্যাম্পে থাকেন তারা।

তাদের একজন মুরাদ হোসেন বললেন, “কিছু করার নেই। বাসায় বসে কী করব?”
কৃষি মার্কেটের কাঁচাবাজারের ফুটপাতের ব্যবসায়ী সালাম শেখ বলেন, তারা ভেতরের রাস্তায় থেকেই ব্যবসা করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রাস্তায় মাছের বাজারের কাছে যাবেন না।
“সেখানে গেলে ক্রেতা পাওয়া যাবে না।”
এখানে ভিড়ের কথা বললে এই ব্যবসায়ী বলেন, “আমাদের দোষ কোথায়, ক্রেতারাই তো ঠেলাঠেলি করে বাজার করেন। তাদের তো বাসা থেকে ডেকে আনা হয় না।”
বাজারগুলোই শুধু নয়, মোহাম্মদপুর এলাকার প্রধান সড়কগুলোতেও যানবাহন ও জনসাধারণের চলাচলে খুব একটা কমতি চোখে পড়েনি।

সেই জাপান গার্ডেন সিটি এলাকায় মূল সড়কের পাশে একটি সুপারশপ এবং ঠিক রাস্তার বিপরীতে আরেকটি সুপারশপ রয়েছে। এই দুটি সুপারশপের সামনের রাস্তার দুই দিকে আগের মতোই গাড়ির সারি দেখা গেল। এখানে গাড়ি রেখে ওই সুপারশপগুলোতে কেনাকাটা করতে গেছেন মালিকরা।
এলাকার বাজার, রাস্তাঘাটে লোকজনের সমাগম নিয়ে কথা হয় তেজগাঁও বিভাগের উপ- কমিশনার বিপ্লব বিজয় তালুকদারের সাথে।
তিনি বলেন, “অচলায়তন ভাঙা একদিনে সম্ভব নয়। সময় বলে দেবে। বাস্তবতা ভিন্ন। আমরা যে যার মতো কাজ করলে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।”
আরও কাঠোর হওয়া প্রয়োজন কি না প্রশ্ন করা হলে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “এসব আমরা এখন না ভাবি। এই মুহূর্তে বাসায় থাকাটা সবচেয়ে নিরাপদ। আর সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাচলসহ কিছু নির্দেশনা মেনে চললে করোনাভাইরাস দূর হয়ে যাবে।”