গুলশানে জিম্মি সঙ্কটের রক্তাক্ত অবসান

ছয় হামলাকারীকে হত্যা আর ২০ জনের মরদেহ উদ্ধারের মধ্যে দিয়ে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারির জিম্মি সঙ্কটের অবসান ঘটেছে। জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে এক জাপানি ও দুই শ্রীলঙ্কানসহ মোট ১৩ জনকে।

লিটন হায়দারবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 2 July 2016, 01:48 AM
Updated : 2 July 2016, 01:48 AM

১২ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি শেষ হয় শনিবার সকালে মাত্র ১২ থেকে ১৩ মিনিটের ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ নামের কমান্ডো অভিযানের মধ্য দিয়ে।

অভিযানের পর আন্তঃবাহিনী পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে শুরু হওয়া কমান্ডো অভিযানে ছয় হামলাকারী নিহত হয়েছেন। একজন ধরা পড়েছে।

তবে অভিযান শুরুর আগে রাতেই জিম্মিদের ২০ জনকে ধারাল অস্ত্রের আঘাতে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা, যাদের লাশ ক্যাফের ভেতরে পাওয়া যায় বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

রাজধানীর কূটনীতিকপাড়ায় বিদেশিদের লক্ষ্য করে চালানো এই হামলার দায়িত্ব স্বীকার করে আইএসের নামে বার্তা আসার খবর এলেও তার সত্যতা নিশ্চিত করেনি বাংলাদেশ সরকার।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ঘটনাকে বলেছেন ‘জঙ্গি হামলা’।

উৎকণ্ঠা নিয়ে রাতভর ৭৯ নম্বর রোডের মোড়ে অপেক্ষায় থাকা এক স্বজনের প্রশ্নের জবাবে সকালে অভিযান শেষে পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক বলেন, “১৩ জন সেইফ।”

এর আগে শুক্রবার প্রথম দফায় হামলা ঠেকাতে গিয়ে গুলিতে নিহত হন বনানী থানার ওসি সালাউদ্দিন ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) রবিউল ইসলাম।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এ হামলার নিন্দা এবং হতাহতের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ধরনের জঙ্গি তৎপরতা প্রতিরোধে জনগণকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। জঙ্গি নির্মূলে সরকারকে দলমত নির্বিশেষ ‘সমন্বিত উদ্যোগ’ গ্রহণের আহবান জানিয়েছেন বিএনপি চেয়পারপারসন খালেদা জিয়া।

হলি আর্টিজান বেকারিতে জিম্মি সঙ্কট শুরুর ঘণ্টাপাঁচেক পর মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস ঘটনার দায় স্বীকার করেছে বলে খবর আসে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে।

আইএসের মুখপত্র আমাক নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে এসব খবরে দাবি করা হয়, ‘তাদের’ এই হামলায় ২৪ জন নিহত হয়েছেন; আহত হয়েছেন ৪০ জন, যাদের কয়েকজন বিদেশি। 

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েকজনের রক্তাক্ত লাশের ছবি দেখিয়ে সেগুলো হলি বেকারিতে জিম্মি বিদেশি নাগরিকদের বলে দাবি করেছে ‘আমাক’।

তবে কারা এই হামলার পেছনে রয়েছে, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো কর্মকর্তা।

প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ অনুযায়ী, শুক্রবার রাত পৌনে ৯টার দিকে ‘আল্লাহু আকবর’ বলে একদল অস্ত্রধারী স্প্যানিশ মালিকানাধীন হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালালে সেখানে অবস্থানরত ব্যক্তিরা আটকা পড়েন।

হামলার পরপরই ভবনটির দোতলার ছাদ থেকে লাফিয়ে বাইরে চলে আসতে সক্ষম হন বেকারির সুপারভাইজার সুমন রেজা ও আরেকজন কর্মী।

সুমন জানান, আট থেকে ১০ জন যুবক হঠাৎ সেখানে ঢুকে পড়ে; তাদের একজনের হাতে তলোয়ার এবং বাকিদের কাছে ‘ছোট আকারের বড় ম্যাগাজিনের’ আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। হামলাকারীরা ১০-১২টি বোমা বিস্ফোরণও ঘটায় বলে জানান তিনি।

আইএসপিআরের সংবাদ সম্মেলনে সেনাবাহিনীর মিলিটারি অপারেশন্সের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাঈদ আশফাক চৌধুরী জানান, ওই ক্যাফের ভেতর থেকে একটি একে-২২ রাইফেল, চারটি পিস্তল, চারটি অবিস্ফোরিত আইইডি উদ্ধার করা হয়।

হামলার আধাঘণ্টা পর পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে ব্যাপক গোলাগুলি হয়। সেসময় ওসি সালাউদ্দিন ও এসি রবিউলসহ অন্তত ২৫ জন আহত হন।

রাতে হামলার পরপরই ক্যাফে থেকে অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন এমন একজন কর্মী বলেছিলেন, অন্তত ২০ জন বিদেশি সেখানে ছিলেন তখন। গণমাধ্যমে আসা তথ্য অনুযায়ী, সব মিলিয়ে জিম্মির সংখ্যা ছিল আরও বেশি। 

রাত ১টার পর থেকে কমান্ডো অভিযানের প্রস্তুতির আঁচ পাওয়া যেতে থাকে। রাত ১টার দিকেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন নৌবাহিনীর একটি কমান্ডো দল; সেনাবাহিনীর একটি প্রতিনিধি দলকেও দেখা যায়। এক পর্যায়ে ৭৯ নম্বর সড়কের মোড়ে পুলিশের কয়েকটি সাঁজোয়া যান এনে রাখা হয়। অ্যাম্বুলেন্সের পাশাপাশি প্রস্তুত রাখা হয় ফায়ার সার্ভিস এবং বিদ্যুৎ বিভাগের গাড়ি।

সকালে সামরিক বাহিনীর কমান্ডো দল উদ্ধার অভিযান শুরু করলে ঘণ্টাখানেক ব্যাপক গোলাগুলি চলে। প্যারা কমান্ডোদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান অংশ নেয় অভিযানে।

আধা ঘণ্টায় সহস্রাধিক রাউন্ড গুলির পাশাপাশি বেশ কয়েকটি বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায় দূর থেকেও। 

কূটনৈতিক পাড়ায় হলি আর্টিজান বেকারি নামের ওই ক্যাফে থেকে আনুমানিক ৫০ গজ দূরের এক বাড়ির বাসিন্দা জানান, তিনি পাশের প্রায় খালি একটি ভবন থেকে টেলিস্কোপ লাগানো স্নাইপার রাইফেল দিয়ে গুলি ছুড়তে দেখতে পান। গুলি ছোড়া হয় সাঁজোয়া যান থেকেও।

পরে সেনা সাঁজোয়া যান হলি বেকারির দেয়াল ভেঙে ভেতরে ঢোকে। ওই কম্পাউন্ডের বাইরের দিকে থাকা পিজা কর্নার এ সময় গুঁড়িয়ে যায়।

হলি বেকারিতে সাঁজোয়া যান নিয়ে ঢোকার সময় লাগোয়া লেক ভিউ ক্লিনিকের পার্কিংয়ে রাখা দুটি গাড়ি দুমড়ে যায়।

যে সড়কে ওই বেকারি, সেই ৭৯ নম্বর সড়কের মোড় থেকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রতিবেদক বলেন, ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের ফায়ার এক্সটিংগুইশার নিয়ে তিনি ওই ভবনের দিকে যেতে দেখেন। কিছু সময় পর একদল চিকিৎসকও স্ট্রেচার নিয়ে ওই ক্যাফের ভেতরে যান।

অন্তত একজন বিদেশি নাগরিক সেখানে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেলেও পুলিশ কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। 

সকাল ৯টার পর আরও কয়েক দফা বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায় ক্যাফের ভেতর থেকে। পরে জানা যায়,হামলাকারীদের পরিত্যক্ত গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছিল বোমা নিষ্ক্রিয়কারী

 
তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক