Published : 13 Apr 2026, 08:17 PM
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর উপাত্তে দেখা যায়, দেশে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বাড়ছে। কিন্তু রাজস্ব আয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ছে না। তাহলে জিডিপি বাড়ছে কীভাবে?
জবাবে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার পাল্টা প্রশ্ন করেন, দশ বছর আগে এভাবে বলতে পেরেছিলেন?
সোমবার বিবিএস আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নে জবাব দিচ্ছিলেন।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পরিসংখ্যান ভবন মিলনায়তনে ‘ত্রৈমাসিক মোট দেশজ উৎপাদন (কিউজিডিপি) এবং জেলাভিত্তিক মোট দেশজ উৎপাদন (ডিজিডিপি) উন্নয়ন’ প্রকল্পের ওপর এই সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
সেমিনারে প্রশ্নোত্তর পর্বে এক সাংবাদিক বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে তথ্য কারসাজি করে জিডিপির আকার বড় দেখানো হয়েছে। জিডিপির আকার ও প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, কিন্তু রাজস্ব আয়ে কোনো প্রতিফলন নেই; বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে তার প্রতিফলন নেই। জিডিপি একা একা বড় হয়ে গেল কীভাবে?
জবাবে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা সচিব আলেয়া আক্তার বলেন, “এক সাংবাদিক জানতে চেয়েছে, জিডিপি একা একা ‘গ্রো’ করলো কেমনে? তার এই দৃপ্ত কণ্ঠকে স্বাগত জানাই। কিন্তু ১০ বছর আগে কি একইভাবে দৃপ্ত কণ্ঠে বলতে পেরেছিলেন? কেন জিডিপি এক একা গ্রো করছে, আশেপাশের ‘ফ্যাক্টর’গুলো কেন বাড়ছে না?”
তখন সাংবাদিকরা একসঙ্গে বলে ওঠেন তারা প্রশ্ন করেছেন।
পরে সচিব বলেন, “যদি হতো, তাহলে জিডিপিসহ অন্যান্য ‘ফ্যক্টর’গুলোতে আরেকটু ‘কারেকশন’ হতে পারতো।”
এক সাংবাদিক বলেন, বিবিএস নিজে কোনো ডেটা সংগ্রহ করে না। ৬৩টি এজেন্সি থেকে ডেটা নিয়ে প্রতিবদন তৈরি করে। ফলে এজেন্সিগুলো সঠিক ডেটা বিবিএসকে দেয় না।
তার জবাবে আলেয়া আক্তার বলেন, “১০ বছর পরে এসে যদি প্রশ্ন করা হয়, আমরা সেকেন্ডারি ডেটা ব্যবহার করি। সেই দায় আমাদের দিলে আর কিছু করা থাকবে না। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেটা যতক্ষণ ‘রিভাইস’ বা ‘আপডেট’ না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদেরটা ‘রিভাইস’ করতে পারবো না। এটা আমাদের নির্ভরতা।”
কিছুটা পুরনো ডাটা নিয়ে কাজ করার, কেনার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বরেন, “আমাদের প্রকল্পভিত্তিক জরিপ, তাই হালনাগাদ ডেটা নিতে পারি না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা ‘সেকেন্ডারি’ ডেটা নিয়ে কাজ করি, কিছু কিছু সার্ভে ডেটা, যেটা আপডেট না...এই সেমিনারটাই করা হয়েছে, আপনাদের ‘আউটপুট’ নিয়ে আরো বেশি নির্ভুল করতে চাইছি। আমরা আপনাদের আরও আস্থা অর্জন করতে চাইছি।”
তবে কিছু কিছু ডেটা বিবিএস সংগ্রহ করে, বলেছেন সচিব।
‘তৈরি করা’ বাস্তবতা ‘মানবেন না’ প্রতিমন্ত্রী
‘গালগল্প’ বাদ দিয়ে জিডিপির সঠিক তথ্য তুলে ধরার কথা বলেছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।
তিনি বলেন, “আমাদের সরকারপ্রধানের অঙ্গীকার তথ্য উপাত্তের সঠিক উন্নয়ন ঘটানো। কোন গাল-গল্প নয়। তৈরি করা বাস্তবতা মানবো না। কেননা সরকার মানুষের জীবনের উন্নতি ও বৈষম্যহীন অর্থনীতি গড়তে চায়।”
বর্তমান সরকার ‘আদেশ’ দিয়ে ডেটা তৈরি করতে চায় না, সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত থাকার কথা বলেছেন জোনায়েদ সাকি।
“বরং একটি শক্ত প্রতিষ্ঠানিক পেশাদারি জায়গায় যেতে চায় যেখানে উপাত্ত নির্ভরযোগ্য হয়।...সেটা দাঁড়ালেই আমরা সত্যিকার অর্থে হিসাব করতে পারবো, কি মাত্রায় উন্নতি করছি, কেন করতে পারছি না, আমাদের সীমাবদ্ধতা কী, সংকটের জায়গাগুলো কী এবং তার সমাধানের পথটা কী!”
রাজস্ব সংগ্রাহে ঘাটতির বিষয়টি তুলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের কথা বাদই দিলাম, কর সংগ্রহের দক্ষতা-সেখানে অনেক সমস্যা আছেই। কর না বাড়িয়ে কর জাল সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব সংগ্রহ অনেক বাড়তে পারে। কর হার কামিয়েও রাজস্ব বাড়ানো যায়। এটা নিয়ে বিতর্ক চাই না।”
দেশের অর্থনীতির বাস্তব চিত্র বুঝে যথাযথ প্দক্ষেপ নিতে হলে সঠিক তথ্যের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। সেই জন্যই উপাত্ত সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওার কথা বলেন তিনি।
মাঠে পর্যায়ে পাওয়া তথ্য ও উপাত্তকে অর্থনীতির বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে মেনে নেওয়ার উপরেও জোর দিয়েছেন জোনায়েদ সাকি।
তার মতে, “তথ্য এখন একটি ক্ষমতা, যেটা আগেও ছিল, দিনে দিনে সেটা আরো ক্ষামতাবান হয়ে উঠছে। এ কারণেই যথার্থ তথ্য জরুরি। না হলে, অপতথ্য প্রধান্য বিস্তার করবে। যথার্থ তথ্য জানলে অপতথ্যের ক্ষমতা কমবে।
“সঠিক তথ্য ও উপাত্তকে বাস্তবতার সত্যিকার প্রতিফলনে হিসেবে মেনে নিতে হবে। সরকারে কাজ নির্ধারণ করার জন্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রাহের প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমত বাড়াতে হবে।”
বিবিএসর মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. ফরহাদ সিদ্দিকের সভাপতিত্বে সেমিনারে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম।
সেমিনার সঞ্চালনা করেন বিবিএসর পরিচালক মুহাম্মদ আতিকুল কবীর।