তিন দশকের ঘূর্ণিঝড়
স্বাধীনতার পর ১৯৯১ সালের ৩০ এপ্রিলের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে ফেলেছিল বাংলাদেশকে। ওই এক ঝড়েই মৃত্যু হয়েছিল অন্তত দেড় লাখ মানুষের।
ঝড়-জ্বলোচ্ছ্বাস প্রবণ বাংলাদেশে মূলত এপ্রিল-মে এবং অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। গত তিন দশকে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট প্রায় দেড় ডজন ঘূর্ণিঝড় এ অঞ্চলের জানমালের ক্ষতির কারণ হয়েছে।
তবে দুর্যোগ মোকাবেলায় সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় গত কয়েক দশকে ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানি এবং ক্ষয়ক্ষতি পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে৷
১৯৯১ সালের ৩০ এপ্রিল বয়ে যায় প্রলয়ঙ্করী ঝড়। ভারত মহাসাগরে উৎপত্তি ছিল সেই ঝড়ের, পরে তা ঘণ্টায় ২২৫ কিলোমিটার গতির ঘূর্ণিবায়ু নিয়ে আছড়ে পড়ে চট্টগ্রাম ও বরিশালের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে। প্রায় দেড় লাখ লোকের প্রাণহানি ঘটে ওই ঝড়ে।
১৯৯৭ সালের ১৯ মে বাংলাদেশের সীতাকুণ্ড ও এর আশেপাশের এলাকায় আরেকটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। ঘণ্টায় ২৩২ কিলোমিটার বেগের বাতাসের সঙ্গে ১৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় এলাকা প্লাবিত হয়৷
২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে বিধ্বস্ত হয় দেশের দক্ষিণ উপকূল। উত্তর ভারত মহাসাগরে আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কাছে সৃষ্ট এ ঝড়ের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২৬০ থেকে ৩০৫ কিলোমিটার। এতে তিন হাজরের বেশি মানুষ মারা যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৩২টি জেলার ২০ লাখ মানুষ। উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৬ লাখ টন ধান নষ্ট হয়ে যায়। সুন্দরবনের প্রাণীদের পাশাপাশি ব্যাপক গবাদিপশু প্রাণ হারায়।
২০০৮ সালের অক্টোবরে ঘণ্টায় ৮৫ কিলোমিটার বেগের বাতাস নিয়ে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় রেশমিতেও প্রাণহানি ঘটে।
২০০৯ সালের ২১ মে ভারত মহাসাগরে সৃষ্টি হয় ঘূর্ণিঝড় আইলা, যার অবস্থান ছিল কলকাতা থেকে ৯৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে। চার দিনের মাথায় ২৫ মে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ ও ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাংশে আঘাত হানে এই ঝড়। সেই ঘূর্ণিঝড় ভারতের ১৪৯ জন ও বাংলাদেশের ১৯৩ জনের প্রাণ কেড়ে নেয়। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে উপকূলে প্রায় ৩ লাখ মানুষ বাস্তুভিটা হারায়।
২০১৩ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় ‘মহাসেন’-এ প্রাণ হারান ১৭ জন। ওই ঝড়ে বাতাসের গতি ছিল ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার৷
২০১৪ সালের ৬ অক্টোবর আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় হুদহুদ। ঘণ্টায় ১৮০ কিলোমিটার গতির বাতাসের সেই ঝড়ে ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ ও ওড়িশার ব্যাপক ক্ষতি হয়, মৃত্যু হয় শতাধিক মানুষের। তবে বাংলাদেশে ক্ষতির পরিমাণ ছিল তুলনামূলকভাবে কম।
২০১৫ সালের ৩০ জুলাই ঘূর্ণিঝড় কোমেনে দেশের চার জেলায় অন্তত চারজন মারা যান। ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার বেগের ঝড়ো হাওয়া নিয়ে সন্দ্বীপের কাছ দিয়ে চট্টগ্রাম উপকূল অতিক্রম করে সেই ঝড়।
২০১৬ সালের ২১ মে পূর্ণিমায় ভরা জোয়ারে আঘাত হানে রোয়ানু। সেই ঝড়ে লাখখানেক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, চট্টগ্রামে মৃত্যু হয় ২৪ জনের।
২০১৭ সালের ৩০ মে ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার বেগের বাতাসের শক্তি নিয়ে কক্সবাজার উপকূলে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় মোরা।
২০১৯ সালের ৩ মে ঘূর্ণিঝড় ফণী ভারতের ওড়িশা উপকূলে আঘাত হানার পর বাংলাদেশে প্রবেশ করে, কেড়ে নেয় অন্তত ৯ জনের প্রাণ। তবে ফসলের ক্ষতি ছিল অনেক বেশি।
২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে আঘাত হানার পর প্রবেশ করে বাংলাদেশে। সেই ঝড়ে মৃত্যু হয় অন্তত আটজনের, ক্ষতি হয়েছে সুন্দরবনেরও৷
২০২০ সালের ২১ মে করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে সুপার সাইক্লোন আম্পান শক্তি কিছুটা হারিয়ে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় রূপে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে আঘাত হানে। পরে রাতে এ ঝড় প্রবেশ করে বাংলাদেশে। এ সময় আট জেলায় অন্তত ১৫ জনের প্রাণহানি হয়।
ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ ২০২১ সালের ২৬ মে ভারতের ওড়িশা উপকূল দিয়ে অতিক্রম করে।তখন বাংলাদেশ উপকূলে কোথাও কোথাও স্বাভাবিকের চেয়ে ৭ থেকে ৮ ফুট বেশি উচ্চতার জোয়ারে প্লাবিত হয়। দেশের উপকূলীয় ৯টি জেলার ২৭টি উপজেলায় ক্ষতি হয়েছে বলে জানায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ঘূর্ণিঝড় ‘গুলাব’ ও ডিসেম্বরে ঘূর্ণিঝড় ‘জোয়াদ’ হলেও অন্ধ্র প্রদেশ ও ওডিশা উপকূলে এলেও বাংলাদেশে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেনি।
২০২২ সালের বছর ৯ মে ঘূর্ণিঝড় ‘আসানি’ অন্ধ্র উপকূলে দুর্বল হয়ে পড়ে। এসময় বাংলাদেশেও বেশ বৃষ্টি হয়।
সবশেষ ২০২২ সালের ২৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় ভোলার কাছ দিয়ে বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং। উপকূল অতিক্রম করার সময় বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার। ঝড়ের তাণ্ডব থামলে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হতে থাকবে।
