সাবেক গভর্নর আতিউরের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান: বাংলাদেশ ব্যাংকে ফের দুদকের চিঠি
এস আলম গ্রুপের ব্যাংক মালিকানা, টাকা ছাপিয়ে সহায়তা ও রিজার্ভ চুরির অনুসন্ধান প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন নথি চাওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমানসহ অন্যদের বিরুদ্ধে একগুচ্ছ অভিযোগ অনুসন্ধানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আবারও তথ্য ও নথি চেয়ে চিঠি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে গত ১১ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো চিঠিতে ৩০ জুন সকাল ১১টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট তথ্য ও রেকর্ডপত্র সরবরাহের অনুরোধ করা হয়।
চাওয়া নথির মধ্যে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে জানিয়ে দুদক বলছে, সেগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে।
দুদকের জনসংযোগ শাখার সহকারী পরিচালক মো. তানজির আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। এর পর কিছু তথ্য পাওয়া গেছে।”
চাহিদা অনুযায়ী সব তথ্য এসেছে কি না, তা যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
তবে যেসব তথ্য পাওয়া যায়নি, সেগুলোর জন্য আবারো তাগিদপত্র দেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম, ঋণখেলাপিদের ছাড় দিয়ে নীতিমালা জারি, রিজার্ভ চুরি, হলমার্ক জালিয়াতি, এস আলম গ্রুপের ঋণ জালিয়াতিসহ বিভিন্ন ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতির সুযোগ দিয়ে গত ১৫ বছরে ব্যাংক খাতকে ‘ধ্বংস করার’ অভিযোগ অনুসন্ধানে এসব তথ্য চাওয়া হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, অভিযোগ অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দুদকের উপপরিচালক মো. মোমিনুল ইসলামকে দলনেতা করে তিন সদস্যের অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়েছে।
দলের অন্য দুই সদস্য হলেন উপপরিচালক রণজিৎ কুমার কর্মকার এবং উপসহকারী পরিচালক মো. ইয়াছিন মোল্লা।
অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট তথ্যসহ রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করা ‘একান্ত প্রয়োজন’ বলে মনে করছে দুদক।
যেসব নথি তলব করেছে দুদক
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব অফ-সাইট সুপারভিশন ও ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি ডিপার্টমেন্ট থেকে ২০১৬ এবং ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইস্যু করা সব অনাপত্তিপত্রের সত্যায়িত কপি চেয়েছে দুদক।
সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজার লিমিট, লার্জ লোন রিশিডিউল ও রিস্ট্রাকচারের ক্ষেত্রে এসব অনাপত্তিপত্র চাওয়া হয়েছে।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক বোর্ডের সব সদস্যের বিস্তারিত তথ্যও চাওয়া হয়েছে। এসব তথ্যের মধ্যে রয়েছে নাম, ঠিকানা, কার্যকাল, ফোন নম্বর, এনআইডি নম্বর ও পাসপোর্ট নম্বর।
বিআরপিডি সার্কুলার নং-০৮/২০২০-এ বর্ণিত আর্থিক প্রণোদনার আওতায় শিল্প ও সার্ভিস সেক্টরের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে সহজ শর্তে দেওয়া ঋণ বা বিনিয়োগ সুবিধা গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকা এবং তাদের নেওয়া প্রণোদনার পরিমাণ জানতে চেয়েছে দুদক।
এস আলম গ্রুপকে কয়েকটি ব্যাংকের মালিকানা দেওয়ার অনুমোদনপত্র এবং এ সংক্রান্ত নোটশিটের সত্যায়িত ফটোকপিও চাওয়া হয়েছে।
এছাড়া সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সময়ে এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন কয়েকটি ব্যাংককে টাকা ছাপিয়ে নগদ সহায়তা দেওয়ার অনুমোদন ও নোটশিটের সত্যায়িত ফটোকপি চেয়েছে অনুসন্ধান দল।
রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সাইবার সিকিউরিটি উপদেষ্টা তানভীর দোহার অনুসন্ধান প্রতিবেদনের কপিও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে চাওয়া হয়েছে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হন আতিউর রহমান। দুই মেয়াদে প্রায় সাত বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি।
২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জালিয়াতির মাধ্যমে সুইফট কোড ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়। ওই অর্থের বড় অংশ ফিলিপিন্সে পাঠানো হয়েছিল।
বাংলাদেশের মানুষ বিষয়টি জানতে পারে ঘটনার এক মাস পর, ফিলিপিন্সের একটি পত্রিকার খবরের মাধ্যমে।
বিষয়টি চেপে রাখায় সমালোচনার মুখে গভর্নরের পদ ছাড়তে বাধ্য হন আতিউর রহমান; কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ে আনা হয় বড় ধরনের রদবদল।
পরে ওই বছরের ১৫ মার্চ রাজধানীর মতিঝিল থানায় মামলা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা। প্রায় এক দশকের তদন্ত শেষে ওই মামলায় অভিযোগপত্র দিতে যাচ্ছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি।
তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমানসহ দেশি-বিদেশি ৬৪ ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সেখানে অভিযোগ আনা হচ্ছে বলে সিআইডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
আতিউর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগের অনুসন্ধান এবং রিজার্ভ চুরি সংশ্লিষ্ট আরেকটি অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের অংশ হিসেবে এর আগেও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে একাধিকবার তথ্য চেয়েছিল দুদক।
একটি চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান ১৯ জন কর্মকর্তা এবং রিজার্ভ চুরির ঘটনা খতিয়ে দেখার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই বিদেশি পরামর্শকের বিষয়েও তথ্য চাওয়া হয়।
তাদের মধ্যে ছিলেন সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান, ফজলে কবির ও আব্দুর রউফ তালুকদার; সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী, এস এম মনিরুজ্জামান, আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান, আবু ফরাহ মো. নাছের ও আহমেদ জামাল।
এছাড়া সাবেক বিএফআইইউ প্রধান মাসুদ বিশ্বাস ও কাজী সায়েদুর রহমান; নির্বাহী পরিচালক দেবদুলাল রায়, মেজবাউল হক ও শুভঙ্কর সাহা; পরিচালক তফাজ্জল হুসাইন; অতিরিক্ত পরিচালক মসিউজ্জামান খান ও মাসুম বিল্লাহ; আইসিটি বিভাগের কর্মকর্তা রাহাত উদ্দিনের তথ্যও চাওয়া হয়েছিল।
রিজার্ভ চুরির পর বাংলাদেশ ব্যাংকে পরামর্শক হিসেবে কাজ করা ভারতীয় নাগরিক নীলা ভান্নান ও রাকেশ আস্তানার বিষয়েও তথ্য চেয়েছিল দুদক।
তাদের সবার কার্যকাল, দায়িত্ব, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, মোবাইল নম্বর এবং এনআইডি, পাসপোর্ট ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের সত্যায়িত ফটোকপি সরবরাহ করতে বলা হয়েছিল।
