Published : 26 Dec 2025, 07:10 PM
বাংলাদেশে ‘চরমপন্থিদের হাতে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অবিরাম শত্রুতার’ ঘটনায় ‘গভীর উদ্বেগের’ কথা বলেছে ভারত সরকার।
শুক্রবার এক ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, “বাংলাদেশে হিন্দু, খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধসহ সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে চরমপন্থিদের অবিরাম শত্রুতা গভীর উদ্বেগের।
“আমরা সম্প্রতি ময়মনসিংহে হিন্দু যুবকের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনার নিন্দা জানাচ্ছি। আশা করি, অপরাধে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা হবে।”
তিনি বলেন, “স্বতন্ত্র সূত্রগুলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে দুই হাজার ৯০০ সহিংসতার তথ্য সংগ্রহ করেছে। যার মধ্যে রয়েছে হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও জমি দখলের ঘটনা।
“এসব ঘটনাকে সংবাদমাধ্যমের অতিরঞ্জন হিসেবে একপাশে ঠেলে দেওয়া কিংবা রাজনৈতিক সহিংসতা হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পর ক্ষমতায় আসা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে টানাপড়েন চলছে।
এর মধ্যে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে ভারত সরকারের বক্তব্য এবং দেশটির গণমাধ্যমের বিভিন্ন খবরকে ‘অতিরঞ্জন’ বলে আসছে ঢাকা। ‘রাজনৈতিক সহিংসতাকে’ সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা হিসেবে দেখানোর কথা বলা হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের তরফে।
এর মধ্যে ১৮ ডিসেম্বর রাতে ময়মনসিংহে ধর্ম অবমাননা অভিযোগে হিন্দু যুবক দিপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা এবং লাশ পোড়ানোর ঘটনার নিন্দা জানিয়ে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার আহ্বান জানিয়েছে ভারত সরকার।
এ ঘটনার পর ভারতে বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশন ঘিরে বিক্ষোভ করে হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন সংগঠন। এর মধ্যে ২০ ডিসেম্বর রাতে দিল্লির কূটনৈতিক এলাকায় বাংলাদেশ হাই কমিশন ও হাই কমিশনারের বাসার সামনে বিক্ষোভ হয়। ওই সময় হাই কমিশনারকে হুমকি দেওয়ার কথাও বলেছে ঢাকা।
এর মধ্যে দিপু দাসকে হত্যার প্রতিবাদ বিক্ষোভ থেকে শিলিগুড়িতে বাংলাদেশ ভিসা সেন্টারে ভাঙচুরও চালিয়েছে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
বাংলাদেশ হাই কমিশনের সামনে ওই রাতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছিলেন, “বাংলাদেশের কিছু গণমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর প্রপাগান্ডা আমরা দেখেছি। সত্যটা হচ্ছে, ২০ ডিসেম্বর ২০ থেকে ২৫ জন যুবক নয়া দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনের সামনে জড়ো হয়ে দীপু দাসের নৃশংস হত্যার প্রতিবাদে স্লোগান দিয়েছে এবং বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার আহ্বান জানিয়েছে।
“নিরাপত্তা বেষ্টনী লঙ্ঘন কিংবা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির মত কোনো প্রচেষ্টা সেখানে ছিল না।”
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জয়সওয়াল বলেন, “কয়েক মিনিট পরই ওই দলটিকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ সদস্যরা। এই ঘটনার ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে।”
বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির ওপর ভারত ‘নজর রাখছে’ মন্তব্য করে জয়সওয়াল বলেন, “বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগে রাখছেন আমাদের কর্মকর্তারা। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিষয়ে আমাদের জোরালো উদ্বেগ জানানো হয়েছে। আমরাও দীপু দাসের বর্বর হত্যার ঘটনায় দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানাচ্ছি।”
ভারতের এমন অবস্থানের সমালোচনা করে বাংলাদেশ বলছে, “একজন বাংলাদেশি নাগরিক, যিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের, তার ওপর বিচ্ছিন্ন আক্রমণকে গোটা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ হিসেবে দেখানোর যে চেষ্টা ভারত সরকার করেছে, আমরা তা প্রত্যাখ্যান করছি।
“এই ঘটনার সন্দেহভাজনদের দ্রুততার সঙ্গে গ্রেপ্তার করেছে বাংলাদেশ সরকার। বাংলাদেশে আন্তঃধর্মীয় পরিস্থিতি দক্ষিণ এশিয়ার অন্য অনেক অঞ্চলের তুলনায় ভালো। বাংলাদেশ বিশ্বাস করে, নিজ নিজ দেশের সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এই অঞ্চলের সব সরকারের দায়িত্ব।”
এদিকে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার মূল সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম মাসুদের পালিয়ে ভারত যাওয়ার খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ালে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী বিক্ষোভ হয়।
রামপুরা থেকে ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনমুখী একটি বিক্ষোভ ঠেকিয়ে দেয় পুলিশ। রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনায় ভারতীয় মিশন ঘিরে বিক্ষোভ হয়।
১৮ ডিসেম্বর হাদির মৃত্যুর পর চট্টগ্রামে ভারতের সহকারী হাই কমিশনারের বাসার সামনে বিক্ষোভ ও ঢিল ছোঁড়ার ঘটনা ঘটে।
১৪ ডিসেম্বর ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করে দিল্লিতে থাকা শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার পাশাপাশি হাদির ওপর গুলিবর্ষণকারীদের গ্রেপ্তারে সহযোগিতা চায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
হাদির ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে আটক করা হলেও ফয়সালের অবস্থান এখনও শনাক্ত করতে না পারার কথা বলেছে সরকার।
বাংলাদেশ থেকে ভারতবিরোধী বক্তব্য প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, এ বিষয়ে গত কয়েক দিনে বেশ কয়েকটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে ভারত সরকার।
“বাংলাদেশে যে মিথ্যা বয়ান প্রকাশ করা হচ্ছে, আমরা সেটা প্রত্যাখ্যান করেছি। আপনারা বুঝবেন, বাংলাদেশ আইনশৃঙ্খলা আর নিরাপত্তা পরিস্থিতি কিংবা যা কিছু সেখানে ঘটছে, তা দেখার দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকারের। পরিস্থিতিকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যাওয়ার যে বয়ান, সেটা সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং আমরা সেটা প্রত্যাখ্যান করি।”
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এবং ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে এক প্রশ্নে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের অবস্থান অব্যাহতভাবে একই রকম ও সুস্পষ্ট।
“বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চায় ভারত। আমরা বাংলাদেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে।”
নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা বাংলাদেশে অবাধ, নিরপেক্ষ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে, যা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হতে হবে।”
প্রায় দেড় যুগের নির্বাসন শেষে বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “বাংলাদেশে অবাধ, নিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনকে সমর্থন করে ভারত। এই ঘটনাকে সেই প্রেক্ষাপট থেকেই দেখা উচিত।”