Published : 30 Aug 2024, 10:43 PM
কেবল এবারের ভয়াবহ বন্যাতেই নয়, যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে ডাক পড়ে চিকিৎসা সহকারী শহীদুল্লাহর। ফোনে খবর আসা মাত্রই ছুটে যান তিনি, দিন-রাত যেকোনো সময়। চিকিৎসার পাশাপাশি কিছু ওষুধ দেন বিনামূল্যে। এই ভাদ্রের আকস্মিক বন্যায় তার হাতে জন্ম হয়েছে দুই শিশুর।
শহীদুল্লাহর বাড়ি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের জিরতলী ইউনিয়নে, গ্রামের নাম করমূল্যারপুর। স্বাভাবিক সময়ে সেখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা বেশ ভালো, তবে বানের পানি করমূল্যারপুরকে দিয়েছে দুর্গম এলাকার তকমা।
গ্রামটিতে পৌঁছাতে প্রধান সড়ক থেকে অটোরিকশায় লাগে সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট। তবে দুর্যোগের কালে নৌকা আর হাঁটু সমান পানি ডিঙিয়ে সেখানে পৌঁছাতে লাগল প্রায় দুই ঘণ্টা।
স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা গেল, প্রধান সড়ক থেকে অনেকটা ভেতরে এবং যাতায়াতে অসুবিধা হওয়ায় বন্যা দুর্গত গ্রামটিতে পৌঁছায়নি কোনো ত্রাণ। আর স্বাস্থ্য সেবার কথা তো চিন্তাই করা যাচ্ছে না।
এর মধ্যেই গর্ভবতী নারীর সন্তান জন্মদানে সহায়তা থেকে শুরু করে ডায়রিয়া, চর্মরোগ, জ্বরের মতো অসুখে ভরসার নাম হয়ে উঠেছেন চিকিৎসা সহকারী শহীদুল্লাহ।

বন্যার মধ্যে নিজের গ্রাম করমূল্যারপুর ও কামদেবপুরে দুই শিশুকে ভূমিষ্ঠ করানোর গল্প শোনালেন তিনি। দুই প্রসূতির নাম জানতে চাইলে শহীদুল্লাহ বলেন, “একজন শরীফের স্ত্রী, আরেকজন বাবুলের মেয়ে।"
নির্ধারিত দিনের কথা মনে করতে না পারলেও জানালেন, কয়েকদিন আগে একটা বিকাল ৫টায় এবং আরেকটা পরদিন সকাল ৮টায় ‘ডেলিভারি’ করিয়েছেন।
শহীদুল্লাহ বলেন, “বন্যার ভিতরে দুইটা ডেলিভারি আমার হাত দিয়ে হইছে। বৃষ্টিতে কোমর পানি ভাঙ্গি কাজটা করি আসছি। একটা এইখানে কাছেই, আরেকটা প্রায় এক কিলোমিটার দূরে কামদেবপুর গ্রামে। প্রায় লোকের কাছে আমার ফোন নাম্বার আছে, তারা সবাই ফোন দেয়।
“ফোনে খবর পাই, গিয়ে আমি অবস্থা দেখি। গ্রামের ধাত্রী আছে, এদের কাছ থেকে বিস্তারিত জানি। কোন সিচ্যুয়েশনে আছে, আদৌ কি আমি রাখতে পারব নাকি হসপিটালে পাঠাইতে হইব- দেখি। তাদের এনসিউরের উপরে আমি ওষুধ অ্যাপ্লাই করি।"
তিনি বলেন, “যদি না যাইতাম, আমি না থাকলে তো উপরওয়ালা ফয়সালা করি দিতো। অবশ্যই অন্যকিছু হইতে পারতো।"
জরুরি কোনো খবর এলে কীভাবে যাচ্ছেন, এ প্রশ্নের উত্তরে শহীদুল্লাহ বলেন, “কীভাবে গেলাম এ বর্ণনা দিয়ে লাভ নাই। অ্যানিকস্ট আমাকে যাইতেই হবে এখানে। গামছা লাগাই হোক, নৌকাযোগে হোক, অ্যানিকস্ট আমাকে যাইতে হবে।"
৪৬ বছর বয়সী শহীদুল্লাহ জানালেন, বয়সের অর্ধেক সময় অর্থ্যাৎ ২৩ বছর ধরে তিনি এলাকায় সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তার এক মেয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী, আরেকজন চতুর্থ শ্রেণি পড়ুয়া। তার ‘চেম্বার কাম ডিসপেনসারি’ আছে স্থানীয় মিলন মার্কেটে।
ডায়রিয়া ও চর্মরোগের প্রকোপ
বন্যা কবলিত জিরতলী ইউনিয়নে বেড়েছে ডায়রিয়া ও বিভিন্ন চর্মরোগের রোগী। সুপেয় পানির অভাবের পাশাপাশি বানের পানিতে হাঁটাচলা ও গোসলের কারণে এসব রোগী বাড়ছে। এরমধ্যে অনেককে নিজে সেবা দিচ্ছেন শহীদুল্লাহ, আবার কাউকে প্রাথমিক সেবা দিয়ে পাঠাচ্ছেন হাসপাতালে।

শহীদুল্লাহ বলেন, “এখন সবাই আসতেছে পায়ের সমস্যা নিয়া, বিভিন্ন পেচরা নিয়া (চর্মরোগ)- এগুলা নিয়া আসতেছে। খাওয়ার পানির সমস্যা নিয়া আসতেছে। খাওয়ার পানির সমস্যাতো আমি সমাধান করতে পারতাম নো।
“মেডিসিন যেটা লাগে দিতেছি। কালকে রাতে ময়মনসিংহ থেকে একটা পার্টি এসে কিছু ওষুধ দিয়ে গেছে। এগুলা অনেকেরেই দিতেছি, আরও কিছু আছে ওরস্যালাইন আছে, দিতেছি।"
ডায়রিয়ার প্রকোপ দেখা দিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “গতকালকে ডায়রিয়ার এক রোগীকে আমি ১০০০ মিলি স্যালাইন দিছি। একদম খারাপ সিচ্যুয়েশন ছিল। আগে স্যালাইনটা দিয়ে পানি ব্যালান্স করি হসপিটালে পাঠায় দিছি।
“যাইতে পাইরতোনো হসপিটালে। অবস্থা খুবই খারাপ। যখন স্যালাইনটা দিছি- ব্যালেন্স আসছে, তখন কইলাম- হসপিটালে নি যান।"
পৌঁছায়নি দেশি ত্রাণ
জিরতলী ইউনিয়নের করমূল্যারপুর গ্রামের বাসিন্দারা বৃহস্পতিবার বলছিলেন, ১১ দিন ধরে বন্যা কবলিত হয়ে থাকা এই গ্রামে দেশের কেউ ত্রাণ পৌঁছাতে পারেনি।
স্থানীয় হারুন অর রশীদ বলেন, “এই গ্রামে প্রবাসীরা যা টুকটাক দিছে, বাইরের কোনো কিছু আইয়েনো। মেইন রোড পর্যন্ত আইয়ে, হিয়নতুন মানুষরে দেয়। আমাগরে দায়িত্ব দিলেত আমরা নৌকাত করি নিয়ে আসতে পারি।
“না খাই মরে এলাকার মানুষ। হেদিন প্রবাসীরা ৫ কেজি চাল দিছে। মাডির চুলা বানাই টিনের উফরে বওয়াইছি। এ দিয়া কোনোমতোন চইলতেছি। কেউ দয়া করেন যদি এলাকর লাই।"

কামাল উদ্দীন নামে আরেকজন বলেন, “ধরেন আপনে আমারে দায়িত্ব দিছেন। আমি আমার মতো লই যাইগই। কেউ ৫০ গা পায়, কেউ না খাই মরে। যদি লিস্ট করি করি প্রত্যেক বাড়িত্তুন একজনরেও দিতো তাইলেও সবাই পাই যাইতো।"
তিন মেয়েকে বিয়ে দেওয়া বয়োজ্যেষ্ঠ মানিক স্ত্রীকে নিয়ে পানির মধ্যে ঘরেই আছেন।
তিনি বলেন, “সবার করুণ অবস্থা। সব ঘরবন্দি, কেউ ঘরের মধ্যি মাচান বান্ধি উপরে আছে। কেউ খাটের উপরে খাট দি আছে। প্রত্যকের পাকঘর ডুবি গেছে।"
ইয়াসিন আরাফাত নামে এক তরুণ বলেন, "সরকারি ফান্ডের তোন, জেলা প্রশাসক, বিভিন্ন বাহিনী বা সংগঠনের কোনো ত্রাণ এ এলাকাত আসেনো।"
হাত বাড়িয়েছেন প্রবাসীরা
এলাকার প্রবাসীদের অনেকেই নিম্নবিত্তদের সহায়তার জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের টাকাতেই প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস কিনে অনেকের বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছেন কিছু তরুণ।

তরুণদের একজন আব্দুল হান্নান রাসেল বলেন, “পানিটাতো হঠাৎ করি হইছে। এরকম হইবো কেউ আশা করেনি। আমাদের এলাকায় কিছু একবারে গরিব আছে। সবজায়গাতেই পানি। দুইটা ফ্যামিলি একেবারে গরিব, তাগোরে স্কুলে উঠাইছি।
“আর আমাদের যে প্রবাসী ভাইরা আছে, তাদের সহায়তায় আমরা একটা ফান্ড তৈয়ার করছি। আজকে কেনাকাটার জন্য পাডাইছি, কালকে বিতরণ করমু।"
এছাড়া যেকোনো প্রয়োজনে তরুণরা পাশে দাঁড়াচ্ছেন। কারও কিছু প্রয়োজন হলে তাদের জানালে নৌকায় করে পৌঁছে দিচ্ছেন। জরুরি প্রয়োজনে কাউকে আনা-নেওয়ার দরকার হলে তারা নৌকা নিয়ে প্রস্তুত থাকছেন।
বিপদে পাশে দাঁড়ানোর উদাহরণ দিতে গিয়ে এমরান হোসেন বলেন, “কয়দিন আগে কাজ করি আসি আমরা বসছিলাম। একজনের ঘরে আগুন ধরি গেছে। ইট দি রান্না করি ভাত খাইতে বসছিল, চুলর কয়লা থাকি ঘরে আগুন লাগি গেছে। আমরা দৌড়ি যাই আগুন নিভাইছিলাম।"

করমুল্যাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিন মেয়ে, দুই ছেলে ও স্বামীসহ আশ্রয় নিয়েছেন বিবি কুলসুম।
তিনি বলেন, “ঘরে কোমর পানি, এইখানে আসছি সপ্তাহখানেক হই গেছে। এইখানে কোনমতোন রান্দি কিছু খাইতেছি। বাইরেত্তুন কিছু দেয়নো। এলাকার চেনাজানা লোক কিছু দিছে আরকি।"