Published : 25 May 2026, 12:58 PM
ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে স্বজন, পরিজন নিয়ে দলে দলে বাড়ি ফিরছেন কর্মজীবী মানুষেরা। এই ঘরমুখী মানুষের স্রোতে ঢাকার সঙ্গে সংযুক্ত সবগুলো মহাসগড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছে।
তবে সোমবার দুপুর পর্যন্ত কোথাও দীর্ঘ যানজটের খবর শোনা যায়নি। কোথাও কোথাও গাড়ি কেবল ধীর গতিতে চলছে। তাই ঢাকা থেকে উত্তরের পথের এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, পদ্মাসেতু হয়ে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের যাত্রীদের ঈদযাত্রা স্বস্তি নিয়েই শুরু হয়েছে।
হাইওয়ে পুলিশ বলছে, নিয়মিত সদস্যদের বাইরে অতিরিক্ত এক হাজার পুলিশ সদস্য হাইওয়েগুলোতে কাজ করছে। পাশাপাশি জেলা পুলিশের নিয়মিত সদস্যরাও দায়িত্বে আছেন।
ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গ মহাড়সক, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, পদ্মাসেতু হয়ে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে মোট ৯৪টি যানজটপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে সেগুলোতে অতিরিক্ত জনবল মোতায়েন করেছে হাইওয়ে পুলিশ।
ঈদ উপলক্ষে সাত দিনের সরকারি ছুটি শুরু হয়েছে এদিন, রোববার থেকে সরকারি-বেসরকারি অফিসগুলো ছুটি দেওয়ার পর সন্ধ্যা থেকে রাজধানীর বাস টার্মিনালগুলোতে ঘরমুখো মানুষের ঢল নামে।
গত কয়েকমাস ধরে উত্তরবঙ্গগামী বাসগুলো গাবতলী থেকে ছাড়লেও রোববার সন্ধ্যা থেকে সেগুলোকে শ্যামলী-কল্যাণপুরের দিকে আসার অনুমোদন দেয় পুলিশ। কল্যাণপুর কাউন্টারে আগের সন্ধ্যাতেই জমে ভিড়।
দিনাজপুরগামী বাসযাত্রী রবিউল ইসলাম বলছেন, “রাত ১০টার দিকে গাড়িতে উঠলাম সুন্দরমত সকাল ৮টার মধ্যেই আমরা দিনাজপুর ঢুকে গেছি। গাড়িতে উঠার পর গাড়ি ছাড়তে একটু লেট করছে। গাবতলী ছাড়ার পর বাইপাইলে একটু জ্যাম পাইছি, এরপর চন্দ্রায়। এছাড়া আর কোথাও যানজট পাইনি।”
এদিন ভোরে ব্যাক্তিগত গাড়িতে ঠাকুরগাঁওয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন চিকিৎসক শামীম আজিজ। বেলা ১১টার দিকে তিনি জানান, তারা বগুড়া পার হচ্ছেন।
শামীম বলেন, “রাস্তায় তেমন যানজট নেই। তবে যানবাহনের প্রচুর চাপ রয়েছে, কোথাও কোথাও একটু ধীর গতিতে চলতে হয়েছে।”

সকালে টাঙ্গাইলে ১৫ জন ট্রাক যাত্রীর প্রাণহানির পরেও সড়কগুলোতে ট্রাকে যাত্রীবহন চলছে জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন চিকিৎসক শামীম আজিজ। তিনি বলছেন, “প্রায় প্রত্যেকটা ট্রাকে দেখি যাত্রী নিয়ে যাচ্ছে। অথচ আমরা টাঙ্গাইলে দেখে এসেছি ট্রাক উল্টে রডের তলে পড়ে কতোগুলো মানুষ মারা গেছে। আবার বাইপাইলের মতো ব্যস্ত জায়গায় দেখলাম বড় বড় ট্রাক উল্টোপথে চলছে। এগুলোর ভালো ব্যবস্থাপনা থাকা দরকার। যে কোন সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”
সাংবাদিক গোলাম মোহাম্মদ রাজীব হোসেন ব্যাক্তিগত গাড়িতে সকালে ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে যশোরের ঝিকরগাছার উদ্দেশ্যে বেড়িয়েছিলেন। বেলা ১১টার দিকে তার গাড়ি নড়াইল পৌঁছেছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
রাজীব বলেন, “এমনিতে তেমন যানজট নেই। পদ্মা সেতুর ১৫-২০ কিলোমিটার আগে থেকে গতি খুব ধীর ছিল। টোল প্লাজার কারণে অনেক যানবাহন জমে এরকম পরিস্থিতি হয়েছে সেখানে। এছাড়া রাস্তার পরিস্থিতি বেশ ভালো।”
শ্যামলী পরিবহনের একটি বাসের সুপারভাইজার জহিরুল ইসলাম বলছেন, “আমরা রাতে ট্রিপ নিয়ে চিটাগং আইছিলাম, এহন আবার ফেরত যাইতাছি। কুমিল্লায় জ্যাম লাগছেস বইলা শুনছি। দেখি কী হয়।”
অন্য সব জায়গায় যানজট না থাকলেও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যানজট পিছু ছাড়েনি।
মামুন পরিবহনের একজন কর্মী বলছেন, “ব্রাহ্মনবাড়িয়ার ওইদিকটায় রাস্তার কাজ চলতেছে। একটু বৃষ্টি হইলেই মনে করেন খবর হয়ে যায়। আপনি কাঁচপুর ব্রিজ বা কাঞ্চন ব্রিজ যেদিক দিয়াই যান না কেন জ্যামে পড়বেনই। আবার নরসিংদী, ভৈরব, ব্রাহ্মনবাড়িয়া রোড এদিকেও এখনো কাজ শেষ হয়নি।”
চাপ আছে, যানজট নেই
হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশন্স) মুনতাসিরুল ইসলাম বলছেন, প্রত্যেকটা মহাসড়কে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ আছে। তবে সেরকম যানজট নেই।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তার সঙ্গে যখন কথা হয় তখন তিনি ছিলেন ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কে কাঁচপুর সেতু এলাকায়।
এই কর্মকর্তা বলেন, “আমরা ৯৪টি যানজটপ্রবণ স্পট নিয়ে মাস খানেক আগে থেকেই কাজ করছি। আমাদের একটা হোম ওয়ার্ক ছিল যানজটপ্রবণ এলাকাগুলোর ম্যানেজমেন্ট নিয়ে। এগুলো ম্যানেজ করার জন্য আমরা অতিরিক্ত ফোর্স চেয়েছিলাম। এক হাজার এপিবিএন ও আরআরএফ সদস্য দেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে তাদের মোতায়েন করা হয়েছে। যার কারণে আমরা টহল বাড়াতে পেরেছি।”
মুনতাসিরুল ইসলাম বলেন, “ঈদের সময় যানজটের মেজর কারণ হচ্ছে ঢাকা থেকে বের হওয়ার পয়েন্টগুলো। যেমন, বাইপাইল, চন্দ্রা, কাঁচপুর, কাঞ্চন সেতু এসব জায়গায় বড় বড় কাজ এখনো চলছে। সেখানে রাস্তা এখনো প্রিপেয়ার না। এর মধ্যে বৃষ্টি হয়েছে। এই তালিকাগুলো সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে আগেভাগেই দিয়েছি।”
মহাসড়কের যানজটপ্রবণ কেন্দ্রগুলোতে কন্ট্রোল রুম বসিয়ে, ক্লোজডসার্কিট ক্যামেরা, মাইক লাগিয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন বলেও জানিয়েছেন মুনতাসিরুল ইসলাম।
তিনি বলছেন, “হাটিকুমরুল, গোবিন্দগঞ্জ যে জায়গাগুলোতে যানবাহনের অনেক চাপ থাকে সেখানে কন্ট্রোল রুমে সিনিয়র অফিসারররাা উপস্থিত থেকে মনিটর করছেন। চন্দ্রা ও হাটিকুমরুলে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। মাইকে কিছু নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে, আবার লোকজন যাতে অজ্ঞানপার্টি বা মলম পার্টির খপ্পড়ে না পড়ে সে বিষয়েও প্রচারণা চালানো হচ্ছে।”
মুনতাসিরুল বলেন, “রোজার ঈদের শুধু ঢাকা থেকে মানুষ বের হয়। কিন্তু কোরবানি ঈদে ট্রাফিক থাকে দুই মুখী। গরুর ট্রাকগুলো আসে ঢাকার বাইরে থেকে। আমি দেখতেছি বোথ সাইডেই প্রেসার আছে। কালকে রাতেও প্রায় আড়াই-৩টা পর্যন্ত মনিটরিং করছি।

“এখন পর্যন্ত আমি কোথাও দীর্ঘ যানজটের খবর আসেনি। তবে বৃষ্টি হলে বা কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। যাই হোক আমাদের এবার সব রকমের প্রস্তুতি আছে।”
কোরবানির ঈদ উযাপিত হবে আগামী ২৮ মে। ঈদ ঘিরে টানা সাত দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঈদ উপলক্ষে দেশের সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত এবং বেসরকারি অফিস সোমবার থেকে আগামী ৩১ মে পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।