মানবপাচারের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ১০ দেশে গেছে ৪১ হাজারের বেশি বাংলাদেশি
বাংলাদেশ থেকে গত ২১ মাসে টিআইপি রিপোর্ট অনুযায়ী মানবপাচারের সর্বোচ্চ ঝুঁকি থাকা দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মী গেছে কম্বোডিয়ায় ১৫ হাজার ৯৬৩ জন।
বাংলাদেশ সরকার মানবপাচার দূরীকরণের ন্যূনতম মানদণ্ড পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি, তবে তা অর্জনে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দপ্তরের ‘ট্রাফিকিং ইন পারসন্স (টিআইপি) রিপোর্ট’- এ তথ্য উঠে এসেছে।
রিপোর্টে বলা হয়, মানবপাচার দূরীকরণ নিয়ে বিগত মূল্যায়নের সময়ের তুলনায় বাংলাদেশ সরকার সার্বিকভাবে তাদের প্রচেষ্টা বাড়িয়েছে। তারপরও এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর তালিকার ‘টিয়ার ২’ বা দ্বিতীয় স্তরেই রয়ে গেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, মানবপাচারের সর্বোচ্চ ঝুঁকি থাকা ‘টিয়ার ৩’ বা তৃতীয় ধাপে অবস্থান করা ১০ দেশে গত ২১ মাসে ৪১ হাজারের বেশি কর্মী পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। ‘টিয়ার ৩’ ভুক্ত তালিকায় স্থান পাওয়া ওই দশ দেশ হল- কম্বোডিয়া, রাশিয়া, লাওস, কঙ্গো, বেলারুশ, সুদান, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, লিবিয়া ও ইয়েমেন।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই দশ দেশে মোট ৪১ হাজার ২৩১ জন বাংলাদেশি কর্মী কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছেন।
আন্তর্জাতিকভাবে মানবপাচার প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও বিচার নিশ্চিতের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের অগ্রগতি মূল্যায়নে টিআইপি রিপোর্টকে অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই মূল্যায়নে ‘টিয়ার ৩’ ক্যাটাগরি বলতে বোঝায়- সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার মানবপাচার নির্মূলে ন্যূনতম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করছে না এবং সে বিষয়ে পর্যাপ্ত পদক্ষেপও নিচ্ছে না।
এমন ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমবাজারে এত বিপুল সংখ্যক কর্মী পাঠানোর খবরে তাদের নিরাপত্তা, নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং সরকারের ঝুঁকি মূল্যায়ন নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
তালিকার শীর্ষে কম্বোডিয়া ও রাশিয়া
বিএমইটির তথ্যানুযায়ী, গত ২১ মাসে বাংলাদেশ থেকে টিআইপি রিপোর্ট অনুযায়ী ‘টিয়ার ৩’ এ থাকা দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মী গেছে কম্বোডিয়ায় ১৫ হাজার ৯৬৩ জন। এছাড়া রাশিয়ায় ৭ হাজার ৭৫২ জন এবং লাওসে ৭ হাজার ৫৩২ জন কর্মী পাঠানো হয়েছে।
অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে কঙ্গোয় ৫ হাজার ৪৩৮ জন, বেলারুশে ৩ হাজার ৪৮৪ জন, সুদানে ৪২১ জন, সোমালিয়ায় ৩৪৩ জন, লিবিয়ায় ১৭২ জন, দক্ষিণ সুদানে ৬৯ জন এবং ইয়েমেনে ৫৭ জন বাংলাদেশি গেছেন।
কী আছে প্রতিবেদনে
টিআইপি প্রতিবেদন অনুযায়ী ‘টিয়ার-২’-তে থাকা বাংলাদেশ সম্পর্কে বলা হয়, মানবপাচার দূরীকরণ নিয়ে বিগত মূল্যায়নের সময়ের তুলনায় বাংলাদেশ সরকার সার্বিকভাবে তাদের প্রচেষ্টা বাড়িয়েছে। গৃহীত এসব প্রচেষ্টার মধ্যে রয়েছে মানবপাচার রোধে আইনি কাঠামো শক্তিশালী করতে ‘মানবপাচার ও অভিবাসী পাচার প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ ২০২৬’ জারি করা, তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া বাড়ানো, মানবপাচার অপরাধ ও ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ নির্দেশিকা হালনাগাদ করা এবং সুরক্ষা সেবাগুলোতে স্থানান্তরের সমন্বয় ও গতি আনতে ডিজিটাল এনআরএম পাইলটিং করা।
এছাড়া সরকার অভিবাসী শ্রমিকদের পাচারের ঝুঁকি কমাতে তাদের সুরক্ষাও জোরদার করেছে। তবে বেশ কয়েকটি প্রধান ক্ষেত্রে সরকার ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। সরকার আগের তুলনায় কম সংখ্যক পাচারকারীকে দোষী সাব্যস্ত করেছে এবং অভ্যন্তরীণ পাচার অপরাধ দমনে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেয়নি, যা ব্যাপক আকারেই রয়ে গেছে।
আবার সরকার পাচারের শিকার কম সংখ্যক ভুক্তভোগীকে শনাক্ত করতে পেরেছে। অপর্যাপ্ত রয়ে গেছে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসন প্রচেষ্টাও; বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও প্রত্যাবাসিত বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে। এ ছাড়া সরকার শ্রমিক নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে শ্রমিকদের কাছ থেকে নিয়োগ ফি নেওয়ার অনুমতি বজায় রেখেছে, যা অনেক অভিবাসী শ্রমিককে ঋণগ্রস্ত করে পাচারের চরম ঝুঁকিতে ফেলছে।
প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, গন্তব্য দেশগুলোতে বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ায় প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ এবং দূতাবাসের কূটনৈতিক সুরক্ষার পরিধি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
পাশাপাশি রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে মানবপাচারকারী চক্রের তৎপরতা এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনে পর্যাপ্ত সুরক্ষার অভাব চিহ্নিত করা হয়েছে।
সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ সরকারকে অবৈধ নিয়োগ ফি বাতিল করা, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ওপর কঠোর তদারকি চালানো, ভুক্তভোগীদের পরিচয় দ্রুত শনাক্ত করে পর্যাপ্ত আইনি ও মানসিক স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া এবং মানবপাচার ট্রাইব্যুনালগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
অভিজ্ঞতা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন
সাম্প্রতিক সময়ে কম্বোডিয়ার সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডগুলোতে ভালো চাকরির লোভ দেখিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আটকে রেখে সাইবার অপরাধে বাধ্য করা, নির্যাতন ও মানবপাচারের একাধিক ঘটনা আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
অন্যদিকে রাশিয়ায় উচ্চ বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে কর্মী নিয়ে গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর মত ঘটনাও ঘটেছে।
এর পরও কেন আন্তর্জাতিক সতর্কতা উপেক্ষা করে ঝুঁকি মূল্যায়ন ছাড়াই এসব দেশে কর্মী পাঠানো অব্যাহত রাখা হল, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ব্যক্তিপর্যায়ে শিক্ষার্থী বা পর্যটক ভিসায় গমনে সরকারের সরাসরি নজরদারি কঠিন হলেও, বিএমইটি ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল ক্লিয়ারেন্স নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে দায় পুরোপুরি সরকারের। গুণগত সুরক্ষার চেয়ে কেবল সংখ্যা বাড়ানোর প্রবণতার কারণেই এমন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
“কম্বোডিয়া বা রাশিয়ার মত দেশে ভুক্তভোগী কর্মীরা প্রতারিত হলে বা অঙ্গহানির মত ঘটনার শিকার হলেও কর্তৃপক্ষ দায় রিক্রুটিং এজেন্সির ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। অথচ বিতর্কিত রিক্রুটিং এজেন্সিকে অনুমোদন দেওয়া ও তাদের কার্যক্রম নজরদারির মূল দায়িত্ব বিএমইটির।”
তথ্য যাচাইয়ে গাফেলতির অভিযোগ করে তিনি বলেন, “যেসব দেশে বাংলাদেশ মিশন বা দূতাবাস নেই, সেসব দেশের প্রকৃত পরিস্থিতি অনলাইন বা প্রবাসী বাংলাদেশীদের মাধ্যমে যাচাই না করে ঢালাওভাবে কর্মী ছাড়পত্র দেওয়া স্পষ্টত সরকারি গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতার পরিচয়।”
এ বিষয়ে জানতে প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক ও বিএমইটি মহাপরিচালক জামিল আহমেদকে একাধিকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি।
ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “স্রেফ কর্মী পাঠানোর পরিসংখ্যান বৃদ্ধিই রাষ্ট্রের সাফল্য হতে পারে না। একই সঙ্গে তাদের কর্ম পরিবেশ, চুক্তি অনুযায়ী বেতন নিশ্চিত হওয়া এবং সামগ্রিক নিরাপত্তার হিসাব রাখাও রাষ্ট্রের সমান দায়িত্ব।”
ঝুঁকিপূর্ণ এসব দেশে কর্মী পাঠানোর পর তাদের বর্তমান অবস্থা তদারকি করতে রাষ্ট্রের প্রস্তুতি নিয়ে মূলত ৫টি প্রধান বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করছেন তিনি। এগুলো হল-
পূর্ববর্তী ঝুঁকি মূল্যায়ন: এসব দেশে কর্মী পাঠানোর আগে মানবপাচার, জোরপূর্বক শ্রম, প্রতারণা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট দেশভিত্তিক সমীক্ষা করা হয়েছিল কি না?
নিয়োগকর্তার সত্যতা: ভুয়া চাকরির প্রস্তাব ও প্রতারণা বন্ধে গন্তব্য দেশগুলোর নিয়োগকর্তা ও কর্মপরিবেশ যাচাইয়ের কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?
কর্মীদের হালনাগাদ তথ্য: পাঠানো ৪১ হাজার ২৩১ জনের মধ্যে কতজন চুক্তিমত কাজ পাচ্ছেন, কতজন শোষণ বা পাচারের শিকার হয়েছেন এবং কতজনের সঠিক তথ্য বর্তমানে সরকারের কাছে আছে?
জরুরি সুরক্ষা ও উদ্ধার: বিপদে পড়া কর্মীদের দ্রুত উদ্ধার, আইনি সহায়তা, নিরাপদ আশ্রয় এবং দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক কী ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে?
নীতিগত পরিবর্তন: কম্বোডিয়া ও রাশিয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতার পর সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির জবাবদিহি এবং তদারকি ব্যবস্থায় কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা হয়েছে কি না?
