বাড়ি ফেরার তোড়জোড়, অপেক্ষা ঈদের ছুটির

বাচ্চাদের স্কুল ছুটির পর একটি দিনও ঢাকায় থাকতে চান না আফরোজা ইসলাম।

কাজী নাফিয়া রহমানবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 23 March 2024, 03:16 AM
Updated : 23 March 2024, 03:16 AM

ব্যস্ত নগরজীবন ছেড়ে বছর ঘুরে বাড়ি ফেরার সুযোগ এনে দেয় ঈদ। বাড়তি সময় নিয়ে স্বজনদের সঙ্গ পেতে এই সময় আগেভাগেই গ্রামের পথ ধরেন রাজধানীবাসীর একাংশ।

এবারও রোজার মাঝামাঝিতে রাজধানী ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন অনেকে। ঈদযাত্রার শেষ সময়ে ভোগান্তিতে পড়তে চান না তারা।

অনেকে জানালেন, দ্রুত রাজধানী ছাড়তে কাজের ফাঁকে ঈদের কেনাকাটা সেরে নিচ্ছেন। সবমিলিয়ে ঈদছুটি শুরুর দুই সপ্তাহ আগেই ব্যাগ গোছানোর তোড়জোড় চলছে অনেক বাসায়।

চাঁদ দেখা অনুযায়ী, আগামী ১০ বা ১১ এপ্রিল বাংলাদেশে ঈদুল ফিতর হতে পারে। ঈদের সরকারি ছুটি শুরু হতে পারে ৯ বা ১০ এপ্রিল থেকে। এরপর সাপ্তাহিক ছুটি ও বাংলা নববর্ষ মিলিয়ে ছুটি চলবে ১৪ এপ্রিল রোববার পর্যন্ত।

ঈদের সরকারি ছুটি শুরু হওয়ার আগে ৫ ও ৬ এপ্রিল সাপ্তাহিক ছুটি রয়েছে। পরদিন ৭ এপ্রিল শবে কদরের ছুটি। পরের ১ বা ২ দিন ছুটি নিলে সরকারি চাকরিজীবিরা এবার ঈদে ছুটি পাবেন টানা ১০ দিন।

বেসরকারি চাকুরেদের এত আগে ছুটি না মিললেও রোজায় শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ অনেকেই বাড়তি ছুটি পেয়ে থাকেন। স্কুল বন্ধ থাকায় অনেক অভিভাবকও রোজার শুরুতে বাড়ি যেতে পারেন।

তবে এ বছর রোজায় ক্লাস চলায় তাদের বাড়ি ফেরা পিছিয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রোজার প্রথম দশদিন ক্লাস চলেছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বৃহস্পতিবার ক্লাস শেষে ছুটি দিয়ে দিয়েছে। ছুটি পেয়ে অনেকে শুক্রবার থেকেই বাড়ি ফেরা শুরু করেছে।

সরকারি প্রাথমিক স্কুল ছুটি হয়ে গেলেও ঢাকার অনেক বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখনো ক্লাস চলছে। এছাড়া নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সরকারি সূচি অনুযায়ী ক্লাস চলবে ১৫ রোজা পর্যন্ত।

অভিভাবকদের কেউ কেউ বলছেন, স্কুল ছুটির পরই বাচ্চাদের বাড়িতে পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন তারা।

ঢাকার মধুবাগ এলাকার বাসিন্দা মহসিন হোসেন এক ঈদে ছুটি পেলেও অন্য ঈদে তাকে অফিস করতে হয়।

বেসরকারি এই চাকরিজীবী এবার রোজার ঈদে ঢাকায় থাকবেন, তবে পরিবারের সদস্যদের পাঠাবেন চাঁদপুরের গ্রামের বাড়িতে। এজন্য আগেভাগেই কেনাকাটা করেছেন তিনি।

মহসিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গ্রামে দাদা-দাদি আছে, সেজন্য বাচ্চারা খুব আগ্রহ নিয়ে থাকে। গ্রামের খোলা পরিবেশ, আত্মীয়দের বাড়ি বেড়াতে যাওয়া ওরা খুব পছন্দ করে। বছরে এতো বড় ছুটি তো আর পায় না তারা।

“এবার তো ছুটি কমে গেলে। সেজন্য তারা এখনই সব গুছিয়ে রেখেছে। স্কুল ছুটি হলেই মায়ের সঙ্গে ওদের পাঠিয়ে দিব। ঢাকায় তো দম ফেলার সুযোগ নেই, ঈদে বাড়ি যাওয়াই ওদের সবচেয়ে বড় আনন্দ।”

মিরপুরের লিটল ফ্লাওয়ারস প্রিপারেটরি স্কুলের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী আরিয়ান অন্যান্যবার রোজার আগেই বাড়িতে চলে যায়। এবার ক্লাস চলায় তা আর হয়ে ওঠেনি।

কবে গ্রামে যাওয়া যাবে, দাদা-দাদীর সঙ্গে কখন দেখা হবে- এই স্কুলের অন্য অনেক বাচ্চার মত আরিয়ানও এখন এমন অপেক্ষা নিয়ে আছে।

তার ভাষ্য, “অনেকদিন দাদা বাড়ি যাই না। ছুটি হলেই চলে যাব। অনেক ঘোরাঘুরি করব, খেলব, মজা করব। একসাথে ঈদ করব।”

আরিয়ানের মা আফরোজা ইসলাম জানান, বাচ্চাদের গ্রামের সঙ্গে পরিচয় রাখতে সুযোগ পেলেই নিয়ে যান। এবার স্কুল ছুটির পরদিনই বাড়ির পথ ধরতে চান তিনি।

“পুরো বছরে এই সময়টাতেই ছুটি থাকে। এক মাসের মত গ্রামে দাদা-দাদু, নানা-নানুর সাথে থাকার সুযোগ হয়। সরকারি স্কুল তো ১০ রোজায় বন্ধ হয়ে গেছে। তবে ছেলের স্কুলে ছুটি হবে ১৫ রোজার পরে।”

বাচ্চার স্কুল চলায় সাপ্তাহিক ছুটির দিনে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সেরে নিচ্ছেন বলে জানালেন আফরোজা ইসলাম।

“এবার যেহেতু ঈদের ছুটি কম পাচ্ছি, তাই আগে থেকেই সবার জন্য টুকটাক করে কেনাকাটা করে রাখছি। স্কুল ছুটির পর একদিনও ঢাকায় থাকতে চাই না।”

শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকরাও ছুটি পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন।

মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজের শিক্ষক লামিয়ুন্নাহার জানান, বাচ্চাদের স্কুল ও নিজের কলেজের ছুটির পর কিশোরগঞ্জের বাড়িতে যাবেন।

বাচ্চারা আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গ ও গ্রামের পরিবেশ উপভোগ করে, সেজন্য যতটা সম্ভব ছুটির সময়টি কাজে লাগাতে চান তিনি।

তিনি বলেন, “১৫ রোজার পরে আমাদের সবার ছুটি হয়ে যাবে। তারপরই আমরা গ্রামে চলে যাবো। পরিবারের সবার সঙ্গে এক সাথে সময় কাটাতে পারব। শহুরে বন্দীদশা থেকে কিছুদিনের জন্য মুক্তি মিলবে।”

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা তানবীন সবুজ ঢাকায় চাকরির প্রস্তুতির পাশাপাশি টিউশনি করান। ঈদ যাত্রায় গণপরিবহনের ভোগান্তি এড়াতে আগামী সপ্তাহেই ঢাকা ছাড়তে চান তিনি।

তানবীন সবুজ বলেন, “অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ৪ এপ্রিল থেকেই বাস, ট্রেন, লঞ্চে চাপ পড়বে। যানজট, ধাক্কাধাক্কি, বাড়তি ভাড়া, সিট না পাওয়া- এসব ঝামেলায় যেতে চাই না। আর এ সময়টায় সবাই বেপরোয় হয়ে যায়, অনেক দুর্ঘটনাও ঘটে।

“যেহেতু আমার কোনো ধরাবাধা নেই, তাই ঠিক করছি আগেই চলে যাব, যাতে শান্তিতে ও নিরাপদে বাড়ি যেতে পারি।”

একই কারণে ১০ রোজার পর বাড়ি যাওয়ার পরিকল্পনা নেন ইডেন মহিলা কলেজের ছাত্রী আরাফাত আইরিন। সেজন্য দিনাজপুরের ট্রেনের ২৩ মার্চের টিকেট কেটে রেখেছেন আইরিন।

এই শিক্ষার্থী বলেন, “আমার বাড়ি তো অনেকটা দূরের পথ, একটু রিল্যাক্সে যেতে চাই। পরে টিকেট পাওয়া যায় না। আবার অনেক ভিড় হয়, রোজা রেখে কষ্ট হয়ে যায়।

“ঢাকায় তো কয়েক বছর ধরে হলে একা থাকি, বাড়িতে বাবা-মা সবার সাথে ঈদ করার মজাই আলাদা।”

বেসরকারি চাকরিজীবী আব্দুস সবুর মিলন জানালেন, ঈদের আগেও কয়েকদিন বাড়িতে থাকতে চান। ছুটি পেলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেই গ্রামে যেতে চান তিনি।

“কোরবানির ঈদে সবার ছুটি কম থাকে। এই ঈদটায়ই একটু সময় পাওয়া যায়। সারা বছর তো সবাইকে একসাথে পাওয়ার তেমন সুযোগ হয় না। বন্ধু-বান্ধবরা গ্রামে আসে ঈদ করতে, তাদের সঙ্গে দেখা করার আনন্দই আলাদা। কাজের জন্য ঢাকায় থাকা, কিন্তু আমাদের সবকিছু তো গ্রামে।”

ঈদযাত্রার যাওয়া-আসা যেন ভোগান্তিমুক্ত হয়, সেদিকে সরকারকে সক্রিয় তৎপরতা চালাতে বলেছেন তিনি।