বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে ঢাকা-বেইজিংয়ের ঐক্য চান চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মন্ত্রী
বর্তমানে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক দৃঢ় অবস্থানে থাকার কথা তুলে ধরেন লিউ হাইশিং।
বিশ্বব্যাপী ‘একতরফাবাদের উত্থান আর জঙ্গলের আইন’ চর্চার বিরুদ্ধে বেইজিং ও ঢাকার একসঙ্গে কাজ করার উপর জোর দিয়েছেন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিং।
দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে বুধবার ঢাকায় এক গোলটেবিল আলোচনায় এ নিয়ে কথা বলেন তিনি।
লিউ হাইশিং বলেন, “বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এটা শান্ত অবস্থা থেকে অনেক দূরে। যে পরিবর্তন এক শতাব্দীতে দেখা যায়নি, সেটা এখন ত্বরান্বিত হচ্ছে এবং একতরফাবাদ, ক্ষমতার রাজনীতির উত্থান ও জঙ্গলের আইনের চর্চা আমরা দেখছি। বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাত মাথাচাড়া দিচ্ছে।
“এমন পরিস্থিতির বিপরীতে, আন্তর্জাতিক ঝুঁকি মোকাবেলা এবং বিশ্বশান্তি রক্ষায় চীন ও বাংলাদেশের মত শান্তিপ্রিয় দেশগুলোর এক হওয়া খুবই প্রয়োজন।”
ঢাকা সফররত লিউ হাউশিং দুপুরের পর ঢাকার একটি হোটেলে ‘যেখানে ইতিহাস আলোকিত করে ভবিষ্যতকে: চীন-বাংলাদেশ পলিটিক্যাল পার্টিজ প্লাস’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় মূল বক্তব্য দেন। ঢাকার চীন দূতাবাসের আয়োজনে ওই অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশ-চায়না সেন্টার ফর পার্টি অ্যান্ড স্টেট গভর্নেন্স স্টাডিজ’-এর উদ্বোধন করেন অতিথিরা।
হাজার বছরের সংযোগের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক দৃঢ় অবস্থানে থাকার কথা তুলে ধরেন লিউ হাইশিং।
ভবিষ্যৎ সম্পর্কের দিকে দৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “চলার পথে আমাদের দৃঢ় থাকতে হবে এবং যৌথ আস্থার পথ তৈরি করতে হবে। অভ্যন্তরীণ বা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির যে পরিবর্তন হোক না, চীন ও বাংলাদেশকে বন্ধুত্বের প্রতি অবশ্যই অঙ্গীকারাবদ্ধ এবং বিশ্বস্ত বন্ধু, প্রতিবেশী ও অংশীদার হিসাবে দৃঢ়ভাবে পাশে দাঁড়াতে হবে।
“পরস্পরের মৌলিক স্বার্থ ও প্রধান উদ্বেগগুলোকে মাথায় রেখে আমাদের অবশ্যই একে অপরকে সম্মান জানাতে হবে, বুঝতে হবে এবং সমর্থন দিতে হবে।”
সময়ের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সহযোগিতা গভীর এবং জোরদার হওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জুনের বৈঠকে চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডোর করার প্রস্তাব দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
“সব আকারে অবকাঠামোর প্রকল্প কিংবা ছোট পরিসরেরর জীবিকার প্রকল্প, এসব বাস্তবিক সহযোগিতা মধ্য দিয়ে দুদেশের জনগণের জীবনমানের উন্নয়নে অবদান রেখেছে।”
বাংলাদেশে চীনের দ্বিতীয় রাষ্ট্রদূত হিসাবে তার বাবা লিউ শুচুইংয়ের ঢাকায় দায়িত্ব পালনের কথা স্মরণ করেন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির এই নেতা।
তিনি বলেন, “আমার বাবা ৪৬ বছর আগে বাংলাদেশের দ্বিতীয় চীনা রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সে সময় আমি খুবই ছোট ছিলাম। চীনের তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী, কূটনীতিকরা তাদের সন্তানদের কর্মস্থলে রাখতে পারতেন না।
“তিনি এখানে দুই বছর কাজ করেছেন এবং একজন কূটনীতিক হিসাবে চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব গড়ার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছিলেন। চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের যে প্রাসাদ, সেখানে একটি ইট লাগিয়েছিলেন। দীর্ঘ ৪৬ বছর পার হয়ে গেছে এবং আজকেও অনেক বন্ধু আমার বাবার নামটি স্মরণ করেছেন। আমি ভীষণভাবে অভিভূত “
অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, “বাংলাদেশ ও চীনের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং বহুমুখী সহযোগিতা নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে বর্তমান সরকার ও বিএনপি বদ্ধপরিকর।”
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “এই উচ্চপর্যায়ের সফর দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্বে নতুন গতি এনেছে। বিশেষ করে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় বড় বড় অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও যোগাযোগখাতে চীনের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।”
বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে চীনের সুসম্পর্ক থাকার কথা তুলে ধরেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরাতে চীন সরকারকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “রোহিঙ্গারা তাদের নিজভূমে ফিরে না গেলে এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্টের আশঙ্কা করা হচ্ছে।”
বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে এবং শিক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। শিক্ষা খাতে সহযোগিতার প্রস্তাব করে তিনি বলেন, “আসুন বৃত্তি, যৌথ ডিগ্রি এবং শিক্ষক বিনিময়ের ব্যবস্থা এবং কারিগরি ও ভোকেশনাল ট্রেইনিং, রোবোটিক্স ও ডিজিটাল দক্ষতায় সহযোগিতা করি।”
দলগুলোর মধ্যে সংলাপের আহ্বান জানিয়ে নাহিদের প্রস্তাব, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে নিজস্ব সংলাপ করতে প্রস্তুত এনসিপি। নিয়মিতভাবে বহু দলীয় সংলাপ এবং বাংলাদেশ-চীন ইয়ুথ ফোরামকেও আমরা স্বাগত জানাই।
ঢাকায় চীনের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত লিউ ইউয়িনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সেন্টার ফর অল্টারনেটিভসের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ, চীন-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (সিবিসিসিআই) সভাপতি খোরশেদ আলম, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মাসেকুর রহমান বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কৃষি উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, নারী ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিন, বিএনপি নেতা আলতাফ হোসেন চৌধুরী, বিএনপির এমপি খায়রুল কবির খোকন, জামায়াত এমপি সাইফুল আলম খান মিলন, নুরুল ইসলাম বুলবুল, নাজিবুর রহমান মোমেন, ব্যারিস্টার আরমান, সাবিকুন্নাহার এবং নুরুন্নিসা সিদ্দিকা, এনসিপির এমপি হাসনাত আবদুল্লাহ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতনসহ বিভিন্ন দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া বাংলাদেশের কয়েকজন সাবেক কূটনীতিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ব্যবসায়ী এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
