Published : 30 Aug 2026, 02:13 AM
বিভিন্ন সময়ে ‘গুম’ হওয়া প্রায় ২৫০ জনের অভিযোগকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে না দেখে ‘ব্যাপক ও পদ্ধতিগত’ মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে একটি মামলায় বিচারের আওতায় আনতে চাইছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।
এজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা তুলে ধরে প্রসিকিউশনের তরফে বলা হয়েছে, সব প্রক্রিয়া পরিকল্পনামাফিক এগোলে চলতি সেপ্টেম্বরের মধ্যেই এসব ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুতের কাজ শেষ হবে।
এসব ‘গুমের’ ধরন ও পদ্ধতিতে মিল থাকার কারণে এগুলোকে ‘ব্যাপক ও পদ্ধতিগত’(ওয়াইডস্প্রেড অ্যান্ড সিস্টেমেটিক) অপরাধ হিসেবে তদন্ত করার কথা বলছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম।
এ তালিকায় অনেকের নাম রয়েছে, যারা ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের আগ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ‘গুমের’ শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ পেয়েছে প্রসিকিউশন।
গত সপ্তাহে প্রায় ৬০টি পরিবারের সদস্য ট্রাইব্যুনালে এসে বক্তব্য দিয়েছেন। আগামী ৬ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টায় আরও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের ডাকা হয়েছে। তাদের বক্তব্য শোনার পাশাপাশি তাদের কাছে থাকা তথ্য ও আলামত উপস্থাপনের জন্যও ট্রাইব্যুনালের তরফ থেকে বলা হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালন করা হয় ৩০ অগাস্ট। এদিন বাংলাদেশেও বিভিন্ন আয়োজন রয়েছে।
চব্বিশের গণআন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এ সরকারের দেড় দশকে ‘গুম’ এর অনেকগুলো ঘটনার অভিযোগ সামনে আনেন ভুক্তভোগীরা। এসব অভিযোগের অনেকগুলো আমলে নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা বিচারাধীন এবং অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে।
বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে গুমের অভিযোগ ইতোমধ্যে ৫০০ ছাড়ানোর তথ্য মিলেছে প্রসিকিউশনের তরফে।
ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁশুলী আমিনুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রত্যেকের অপহরণের সিস্টেমটা বা প্যাটার্নটা ছিল একই। রাস্তায় আটক করে নিয়ে যাওয়া, কারও বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া কিংবা ধরেন চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া, মাইক্রোবাস ব্যবহার করা, কখনও সাদা পোশাকে আসা, কখনো পোশাকে আসা বা একইভাবে নিয়ে পরবর্তীতে তাদের সন্ধান সম্পর্কে তাদের তথ্য গোপন রাখা এবং অস্বীকার করা ছিল এসব গুমের কমন প্যাটার্ন।”
দেশের বিভিন্ন এলাকার এমন অনেকগুলো ঘটনা বিশ্লেষণ শেষে ২৫০ ভুক্তভোগীর দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকার ঘটনাকে স্বতন্ত্র ‘গুম’ না ধরে ‘ওয়াইডস্প্রেড ও সিস্টেমেটিক’ অপরাধ হিসেবে ট্রাইব্যুনালে চিহ্নিত করার কথা বলেন তিনি।
একই মামলার আওতায় আনা হলেও প্রত্যেক ভুক্তভোগীর জন্য আলাদা অভিযোগপত্র ও আসামির পরিচয় থাকবে তুলে ধরে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, “আলাদা আলাদাভাবে বিচারের চেয়ে আমরা যদি একটা বিচারের মধ্যে নিয়ে আসি, তাহলে সেটা ট্রাইব্যুনালের যে ওয়াইড স্প্রেড ও সিস্টেমেটিক স্পিরিট সেটা আদালতের কাছে সেটা পরিষ্কার করে তুলে ধরার সুযোগ থাকবে এবং সময় বাঁচবে।”
তার ভাষ্য, “যে প্রক্রিয়ায় চিন্তা করছি, সেভাবে অনুসন্ধানটা শেষ করতে পারলে এটা নিশ্চয়ই বাংলাদেশের মধ্যে ঐতিহাসিক একটা বিচার হবে।”
তদন্ত প্রতিবেদন কবে?
‘গুমের’ ওসব ঘটনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে অগ্রাধিকার দিয়ে পাঁচজন বিশেষজ্ঞ তদন্ত কর্মকর্তা কাজ করছেন। প্রধান কৌঁসুলিসহ কয়েকজন প্রসিকিউটর সরাসরি এ তদন্তের তদারকি করছেন।
ইতোমধ্যে ভুক্তভোগীদের কোথা থেকে, কবে এবং কীভাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেসব তথ্য চিহ্নিত করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের ছবি সংগ্রহ ও পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। কিছু সিসিটিভি ফুটেজসহ পাওয়া আলামতও জব্দ করার তথ্য দেন আমিনুল ইসলাম।
‘গুমের’ এসব ঘটনার অনেক ক্ষেত্রে তথ্য-প্রমাণ গোপন করার অভিযোগের বিষয়টি সামনে এনে তিনি বলেন, “কল রেকর্ড (সিডিআর), ভিডিও ফুটেজসহ বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল প্রমাণের ওপর তদন্তে নির্ভর করতে হচ্ছে। তদন্ত দলের সদস্যরা বিভিন্ন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সেগুলোর মানচিত্র তৈরির কাজও করছেন।“
ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ৬ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের পর প্রতি সপ্তাহে গুমের তদন্তের অগ্রগতি পর্যালোচনা করার কথাও বলেন তিনি।
“সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই ২৫০ ভুক্তভোগীর বিষয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুতের চেষ্টা চলছে।”
দীর্ঘদিন গুম থাকার পর উদ্ধার হয়ে আসা ব্যক্তিদের অভিযোগের তদন্ত আলাদাভাবে করা হচ্ছে।
এক জিয়াউলের বিরুদ্ধে ২ শতাধিক গুমের অভিযোগ
ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ২০০টির বেশি গুমের অভিযোগ থাকার কথা বলেছেন আমিনুল ইসলাম। বলেন, “তার মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে।”
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে কান্নায় ভেঙে পড়েন গুমের শিকার ঝালকাঠির রাজাপুরের বিএনপিকর্মী মিজান জমাদ্দারের স্ত্রী নাসিমা বেগম
আরও দু-একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়ার পর মামলাটি শেষ করার উদ্যোগ থাকার কথা বলেন তিনি।
ডিজিএফআইয়ের জেআইসি (জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল) এবং র্যাবের টিএফআই (টাস্ক ফোর্স ফর ইন্টারোগেশন) সেলে সংঘটিত গুম ও নির্যাতনের দুই মামলার বিচারও নিয়মিত চলছে এবং আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ অব্যাহত রয়েছে।
প্রধান কৌঁসুলি বলেন, “সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমীকে ডিজিএফআইয়ের জেআইসি সেলে এবং ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাশেম আরমানকে র্যাবের টিএফআই সেলে বছরের পর বছর অবৈধভাবে বন্দি রেখে নির্যাতন করা হয়েছিল। ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে এই দুই গোপন বন্দিশালায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের তথ্য-প্রমাণ ও সাক্ষীদের জবানবন্দি উপস্থাপন করা হচ্ছে।”
বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর গুমের সঙ্গেও জিয়াউল আহসানসহ কয়েকজন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার দাবি করে তিনি বলেন, “কিছু কল রেকর্ড, কয়েকজন আসামিকে গ্রেপ্তারের পর তাদের বক্তব্য এবং জিয়াউল আহসানের মামলায় ইমরুল কায়েস নামে একজন সাক্ষীর জবানবন্দিসহ অন্যদের বক্তব্য থেকে ইলিয়াস আলীর গুমের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।”
ট্রাইব্যুনালে গুমের পাঁচ শতাধিক অভিযোগ
ট্রাইব্যুনালে গুমের অভিযোগ ইতোমধ্যে ৫০০ ছাড়ানোর তথ্য দিয়ে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, ‘মায়ের ডাক’ থেকে ১১০টি অভিযোগ এসেছে। ‘গুম ফাউন্ডেশন’ এর কাছেও প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জনের অভিযোগ রয়েছে। এর বাইরে ব্যক্তিগত অভিযোগও রয়েছে।
সব মিলিয়ে অভিযোগের সংখ্যা ৫০০ থেকে সাতশর মত হওয়ার অনুমান করছেন তিনি।
তার ভাষ্য, সব অভিযোগই ট্রাইব্যুনালে বিচারযোগ্য হবে না।
“যেগুলো স্বতন্ত্র অভিযোগ, এগুলো আমাদের ট্রাইব্যুনালে রাখব না। এগুলো নিচের কোর্টে পাঠায় দিব।”
আরও পড়ুন
গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচারে বৈশ্বিক ঐক্যের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
গুমে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে সংসদে বিল, গোপন আটককেন্দ্র করাও হবে অপরাধ
সর্বোচ্চ শাস্তির পাশাপাশি ক্ষতিপূরণের বিধান রেখে গুম আইনের খসড়া