Published : 30 Mar 2026, 02:58 PM
বহুল আলোচিত মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ বা এমটিএফইয়ের প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশে পাচার হওয়া ৪৪ কোটি টাকা ফেরত আনতে পেরেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
তবে এখন ওই টাকা গ্রাহকদের হাতে ফেরত দেওয়া ‘কঠিন’ বলে মনে করেছেন সিআইডির একজন কর্মকর্তা।
টাকা ফেরত আনার বিষয়ে জানাতে সোমবার রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের ডিআইজি মো. আবুল বাশার তালুকদার।
তিনি বলেন, "টাকা এখন সিআইডির অ্যাকাউন্টে রয়েছে। তবে দেশে ফিরিয়ে আনা গেলেও তা গ্রাহকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া অনেক কঠিন। এখানে আইনের অনেক মারপ্যাঁচ আছে। আদালতের অনুমোদন লাগবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন লাগবে।
“এই প্রসেসগুলো আসলেই জটিল। কাজেই এ প্রসেসগুলোতে না ঢুকতে চাইলে দেশবাসীকে অনুরোধ জানাচ্ছি আপনারা কেউ এই ধরনের প্লাটফর্মে ইনভেস্ট করবেন না।"
এক প্রশ্নের জবাবে সিআইডি কর্মকর্তা বলেন, "এগুলো ফরেন অ্যাপ। আমাদের দেশের মানুষকে তারা বিভিন্নভাবে এনগেজ করছে।"
দেশে এদের কোনো এজেন্ট আছে কিনা জানতে চাইলে ডিআইজি আবুল বাশার বলেন, "সেটা তো অবশ্যই আছে। এরা গ্লোবালি কাজ করে। এদের হাজারটা এজেন্ট আছে। যেদিন আমরা এজেন্ট ধরে ফেলতে পারব, সেদিন তো মামলা ডিটেক্ট হয়ে গেল।"
কত মানুষ এই এমটিএফইতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জানতে চাইলে আবুল বাশার বলেন, "এটা সুনির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব না। অনেকে লজ্জায় কাউকে কিছু বলছেন না বা মামলা করেননি। স্বামী টাকা খুইয়ে স্ত্রীকে বলতে পারেননি, ছেলেমেয়েরা তাদের বাবা-মাকে জানায়নি। আবার অনেকেই জানেন না এই ধরনের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কোথায় প্রতিকার পাওয়া যায়।"
মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ দুবাইভিত্তিক কোম্পানি হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকে। এমএলএম পদ্ধতিতে কাজ করা এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মের তৎপরতার বিষয়ে জানা যায় চার বছর আগে।
২০২৩ সালের দিকে এমটিএফই নামের এই অনলাইন প্রতারকদের তৎপরতা তুঙ্গে ছিল। সে সময় দেশের বিভিন্ন জায়গায় তারা অফিস খুলে লোকজনের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়।
রাজশাহী, কুমিল্লা, বরিশালসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজনের নিঃস্ব হওয়ার খবর আসে। ওই বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে আর টাকা তুলতে পারছিল না গ্রাহকেরা। এক পর্যায়ে সব অফিস বন্ধ করে দেশ থেকে উধাও হয়ে যায় তারা।
ওই বছরের অগাস্টে এ বিষয়ে খিলগাঁও থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন মারুফ রহমান মাহিম নামে এক ব্যক্তি। পরে সেই মামলার তদন্তভার পায় সিআইডি।
সোমবারের সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ফোরেক্স ট্রেডিংয়ে উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে পরিচালিত ‘প্রতারণামূলক বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম’ এমটিএফইয়ের বিরুদ্ধে তদন্ত করে বিদেশে পাচার করা অর্থের একটি অংশ, প্রায় ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী ৪৪ কোটি ১৪ রাখ ৬২ হাজার ৩০৩ টাকা) উদ্ধার করেছে সিআইডি।
এমটিএফই এর পঞ্জী স্কিমের প্রতারণার শিকার হয়ে একজন ভুক্তভোগী খিলগাঁও থানায় মামলা করেন। তবে সিআইডি তদন্তে নেমে এরকম ‘অসংখ্য’ বিনিয়োগকারীর কোটি কোটি টাকা খোয়ানোর তথ্য পায়।
সিআইডি বলছে, এমটিএফই একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ফোরেক্স ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম, যা দ্রুততম সময়ে উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করত। ২০২২ সালের জুন থেকে তারা বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে। তখন ঘরে বসে সহজে অর্থ উপার্জনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেইসবুক ও ইউটিউবে ব্যাপক প্রচার চালানো হয়।
তাদের ভিডিও ও বিজ্ঞাপন দেখে অনেকেই বিনিয়োগে আগ্রহী হন। ২০২৩ সালের শুরুতে প্ল্যাটফর্মটির বিস্তার দ্রুত বেড়ে যায়। ব্যবহারকারীদের ভার্চুয়াল ট্রেডিং অ্যাকাউন্ট দেওয়া হত, যেখানে জমা অর্থ ডিজিটাল ডলার হিসেবে দেখানো হত। তবে এটি ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া বা অস্তিত্বহীন। লাভ-ক্ষতির তথ্য কৃত্রিমভাবে তৈরি করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করা হত।
এমটিএফই স্কিম প্রাথমিকভাবে কিছু অর্থ পরিশোধ করে ব্যবহারকারীদের আস্থা অর্জন করে। পরে ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে এমটিএফই হঠাৎ সব কার্যক্রম বন্ধ করে উধাও হয়ে যায়। ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্টে প্রদর্শিত ভার্চুয়াল মুদ্রা ছিল সম্পূর্ণ কাল্পনিক। বিনিয়োগকারীদের অর্থ এমটিএফইয়ের মূল ওয়ালেটে জমা হয়ে সেখান থেকে বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেটে ছড়িয়ে দেওয়া হত। এভাবে বাংলাদেশের থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয় বলে সিআইডির তদন্তে উঠে আসে।
প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া অর্থের একটি অংশ, প্রায় ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার টেথার ক্রিপ্টোকারেন্সি হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ ওকেএক্স-এ সংরক্ষিত রয়েছে বলে সিআইডি জানতে পারে। পরে ব্লকচেইন বিশ্লেষণ টুল চেইনেনালাইসিস রিএ্যাক্টর ব্যবহার করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে ওই অর্থ এমটিএফই প্রতারণা চক্রের সাথে সংশ্লিষ্ট।
সিআইডি বলছে, এ বিষয়ে ওকেএক্স এক্সচেঞ্জের লিগ্যাল টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা আইনানুগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওই অর্থ ফেরত দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে।
এরপর আদালত পাচার হওয়া ওই অর্থ ফেরত আনতে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের মালিবাগ শাখায় যৌথ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে অর্থ গ্রহণ ও সংরক্ষণ করার নির্দেশ দেয়।
আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সোনালী ব্যাংকে একটি সরকারি হিসাব খোলা হয়। সেইসঙ্গে পাচার হওয়া ক্রিপ্টোকারেন্সি বৈধ মুদ্রায় রূপান্তর ও হস্তান্তরের জন্য যুক্তরাজ্যভিত্তিক সেট রিয়েলিটি লিমিটেডের সঙ্গে সিআইডির লিখিত চুক্তি হয়।
অ্যাসেট রিয়েলিটি লিমিটেড এর মাধ্যমে এভাবে প্রায় ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় রূপান্তর করে সোনালী ব্যাংকের সরকারি হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। সার্বিক প্রক্রিয়া শেষে সিআইডির হিসাব নম্বরে ৩৬ লাখ ২২ হাজার ৯৯৮ মার্কিন ডলার জমা হয়। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এর পরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৪ কোটি ১৪ লাখ ৬২ হাজার ৩০৩ টাকা।
এ কাজে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতার পাশাপাশি বাংলাদেশ-মার্কিন কূটনৈতিক সহায়তা ‘গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে’ বলে সিআইডির ভাষ্য।