Published : 16 Nov 2025, 12:39 AM
ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এক বাসায় গৃহকর্মীর কাজে গিয়ে নির্যাতনের শিকার ১৩ বছর বয়সী কল্পনা আক্তার গৃহকর্ত্রী ও তার ভাইয়ের বিচার চায়। কিন্তু ‘ভবিষ্যতের কথা ভেবে’ পাঁচ লাখ টাকায় আপস করে ফেলেছেন তার মা-বাবা, মামলা নিয়ে তাদের আর আগ্রহ নেই।
২০২৪ সালের ১৯ অক্টোবর ওই বাসা থেকে কল্পনাকে উদ্ধার করে পুলিশ। তার মা আফিয়া বেগম সেদিনই ভাটারা থানায় মামলা করেন।
মামলা হওয়ার পর গৃহকর্ত্রী দিনাত জাহান আদরকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। পরে তার ভাই নাজমুস সাকিব আনানকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি আদালতে জবানবন্দিও দেন।
তদন্ত শেষে চলতি বছরের ২৮ অগাস্ট দুই ভাইবোনের বিরুদ্ধে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র দেন তদন্ত কর্মকর্তা ভাটারা থানার এসআই মো. নেছার উদ্দিন।
মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ায় ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৯ এর বিচারক শাহিনা হক সিদ্দিকার আদালতে বদলি করা হয়েছে। আগামী সোমবার মামলার দিন ধার্য রয়েছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০২১ সালের ১ জুন থেকে বসুন্ধরার আবাসিক এলাকায় দিনাত জাহানের বাসায় কাজে যোগ দেয় কল্পনা। এরপর ২০২৪ সালের ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত তাকে কোনো দিনই ‘ঠিকমত খেতে দেওয়া হয়নি’।
অভিযোগে বলা হয়, দিনাত ও তার ভাই কারণে-অকারণে কল্পনাকে মারধর করতেন। চুল শুকানো ড্রায়ার দিয়ে ছ্যাঁকা দিতেন। কাপড় কাটার কাঁচি দিয়ে তার হাতের নখ উঠিয়ে ফেলা হয়। জুতার ব্রাশ দিয়ে মেরে পিঠের চামড়া তুলে ফেলা হয়।
মামলায় বলা হয়, ঘর মোছার ব্রাশ দিয়ে মুখে বাড়ি দেওয়ায় কল্পনার সামনের দুটো দাঁত ভেঙে যায়। মারধরের ফলে মুখ, হাত-পা, পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন ক্ষতস্থানে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। সেই গন্ধ দূর করতে পারফিউম ব্যবহার করা হত, তবুও তাকে ওষুধ দিতেন না গৃহকর্ত্রী। ক্রমাগত নির্যাতনে কল্পনার চেহারা বিকৃত হয়ে যায়।
ঢাকার তৎকালীন মেট্রোপলিটর ম্যাজিস্ট্রেট বেগম আফনান সুমীর কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে কল্পনাও এই বীভৎস নির্যাতনের বর্ণনা দেন।

আর নাজমুস সাকিব গত বছরের ২৬ অক্টোবর ঢাকার তৎকালীন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বেলাল হোসেনের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেন, দিনাত জাহানের সঙ্গে তাদের বাবা-মায়ের সম্পর্ক ভালো ছিল না। ২০১৮ সাল থেকে দিনাত বসুন্ধরার ওই ফ্ল্যাটে একা থাকতেন।
মাঝে মাঝে দিনাত ফোনে কান্নাকাটি করে বাসায় যেতে বলতেন। কোনো কোনো সময় বোনের জন্য খাবার নিয়ে ওই বাসায় যেতেন সাকিব।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, কল্পনা নামের মেয়েটি তার বোনের বাসায় কাজ করত এবং থাকতো। তাকে তিনি দেখেছেন। দিনাত তাকে ‘বকাঝকা ও মারধর’ করতেন। বিষয়টি তিনি জানতেন। এমনকি তার সামনেও কল্পনাকে কয়েকবার ‘খুব বাজেভাবে’ মারধর করেছেন।
সাকিবের দাবি, ঘটনার এক মাস আগে দিনাত তাকে ফোন করে বলেন “কাজের মেয়েটি তাকে নাকি খুন করতে চায়”। এ কথা শুনে তিনি বোনের বাসায় যান এবং কল্পনাকে ‘জিজ্ঞাসাবাদ’ করেন। কল্পনা সে কথা ‘স্বীকার’ করলে তাকে ‘চড় থাপ্পড় মেরে’ চলে আসেন। পরে শুনতে পান, পুলিশ তার বোনকে ধরে নিয়ে গেছে।
মামলার অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা নেছার উদ্দিন বলেন, আফিয়া বেগমের বোন রাজিয়া বেগম গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন দিনাত জাহানের বান্ধবী আলাবির বাসায়। সেই সুবাদে আলাবির মাধ্যমে দিনাত জাহানের সঙ্গে তাদের পরিচয়।
আফিয়া বেগম তার মেয়ে কল্পনাকে মাসিক ১০ হাজার টাকা বেতনে দিনাত জাহানের বাসায় কাজে দেয়। কিন্তু দিনাত জাহান তার সঙ্গে মেয়েকে দেখা করতে দিতেন না। প্রতি মাসে বিকাশে পাঁচ হাজার টাকা পাঠিয়ে দিতেন এবং কল্পনার বিয়ের সময় প্রতি মাসের বকেয়া থাকা ৫ হাজার টাকা একসঙ্গে পরিশোধ করার কথা বলতেন।
তদন্ত কর্মকর্তা লিখেছেন, কল্পনাকে ‘সার্বক্ষণিক নজরদারিতে’ রাখতেন দিনাত জাহান। তার ভাই সাকিব মাঝে মধ্যে বাসায় যেতেন। ঘর ঠিকমত পরিষ্কার হয়নি বলে স্টাম্প দিয়ে কল্পনাকে মারতেন। দুই ভাইবোন কল্পনাকে ‘নির্যাতন’ করতেন নানাভাবে।
এদিকে তদন্ত চলার মধ্যেই গত ১৬ জুলাই দুই পক্ষ অর্থের বিনিময়ে আপস করে ফেলে। সেই আপসনামা আদালতেও দাখিল করা হয়। সেখানে বলা হয়, কল্পনার সঙ্গে দিনাত জাহানের ‘মনোমালিন্য, বিতর্ক ও ভুল বোঝাবুঝির কারণে’ মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
যোগাযোগ করা হলে কল্পনার মা আফিয়া বেগম বলেন, "মামলা করছি, মাইর তো আর ফেরত আসবে না। মেয়েটা ১১০ দিন হাসপাতালে ছিল। টাকা লাগছে না হাসপাতালে? সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে তো কোনো সাহায্য করেনি।"
তিনি বলেন, "তারা আমাদের বাড়িতে এসে আপস করছে। পাঁচ লাখ টাকায় আপোস। চার লাখ টাকা দিছে। শাস্তি তো তারা পাইছেই। ছেলেটার (নাজমুস সাকিব) কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। বেশিদিন বাঁচবে না। অন্যায়ের বিচার তো পাচ্ছে। মানবিক দিক বিবেচনায় তাদের সাথে আপস করছি।"
আর কল্পনার বাবা শহিদ মিয়া বলেন, "ছেলেটার দুইটা কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। তাদের বাবার ক্যান্সার। শাস্তি তো পাইছে। এ কারণে একটু মায়া লাগছে, ছাড় দিছি। আমরা গরিব মানুষ, মায়া একটু বেশি। এ কারণে একটু ছাড় দিছি।''

তিনি বলেন, "মামলাটা আপস করতে সবাই রাজি। আমি কি কইতাম। কিন্তু ওরা যেমন কথা কয়ে আপস করছে, তেমনটা করেনি। পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও চার লাখ টাকা দিছে। বাকি টাকা না দিলে চিন্তা করব কি করা যায়।"
বাবার যুক্তি, “মেয়েটাকে বিয়ে শাদি দিতে হবে। অনেক টাকা খরচ হবে। ওই টাকা দিয়ে কল্পনার নামে জমি কিনে রাখব।”
কিন্তু কল্পনা চান, যারা তার ওপর দিনের পর দিন নির্যাতন করেছে, তাদের শাস্তি হোক।
“আমার আশা, ওদের সাজা হোক। কিন্তু আমার বাবা-মা মামলাটা শেষ করতে পাগল হয়ে গেছে। আমি বিচায় চাই। ওরা আমার সাথে যা করছে সব এখনো মনে আছে। বিচার না হলে এরকম আরও হবে।"
আপসের বিষয়ে প্রশ্ন করলে আসামিপক্ষের আইনজীবী মহসিন রেজা বলেন, "একটা ঘটনা ঘটেছে। দুইপক্ষই বেনিফিশারি হতে চায়। কেউ মামলা থেকে, কেউ টাকা পেয়ে। সেটায় হয়েছে এ মামলার ক্ষেত্রে। দুইপক্ষ মামলাটা আপস করেছে।"
তবে এ আইনজীবী স্বীকার করেছেন, যে ধারায় মামলা, তা আপসযোগ্য নয়।
আপসনামা জমা দেওয়া হলেও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি আদালত। অভিযোগ গঠনের শুনানির বিষয়টি এলে তখন বিচারক বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।
মামলার দুই আসামি দিনাত জাহান এবং নাজমুস সাকিব বর্তমানে জামিনে আছেন। আর বাবা-মায়ের সঙ্গে হবিগঞ্জের বাড়িতে আছে কল্পনা। সেখানে সে মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসাও চলছে।