‘শিশুদের তথ্য যাচাই শেখাতে হবে স্কুল পর্যায় থেকেই’
শিশুদের জন্য সাইবারজগৎ আরও নিরাপদ করতে যথেষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তাসনিম জারা।
নতুন প্রজন্ম তথ্যের জগতে বেড়ে উঠলেও কোনটি সত্য আর কোনটি মিথ্যা, তা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয় দক্ষতা তারা শিখছে না বলে মনে করছেন ‘ফ্যাক্টফেস্ট ২০২৬’-এর আলোচকেরা।
তাদের মতে, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই তথ্য যাচাইয়ের কৌশল শেখানো গেলে তারা নিজেরাই তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারবে। আর মানুষকে তথ্যের পুরো ব্যবস্থাটি বুঝতে ও বিশ্লেষণ করতে সক্ষম করে তুলতে পারলেই উন্নত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
‘মিডিয়া সেইফটি ইন দ্য ডিজিটাল এজ’ প্রকল্পের আওতায় ডিজিটালি রাইট ও ফোয়ো মিডিয়া ইনস্টিটিউটের যৌথ আয়োজনে ‘ফ্যাক্টফেস্ট ২০২৬’-এ জনআস্থা সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে তথ্য যাচাইয়ের ভূমিকা নিয়ে আয়োজিত প্যানেল আলোচনায় বক্তারা এ বিষয়ে কথা বলেন। এ আয়োজনে সহযোগিতা করে সুইডিশ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা (সিডা)।
আলোচনায় তরুণ রাজনীতিবিদ তাসনিম জারা প্রশ্ন তোলেন, শিশুদের জন্য সাইবারজগৎ আরও নিরাপদ করতে যথেষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কি না।
কয়েকটি গবেষণার উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, শিশুদের সহজ একটি নির্দেশিকার মাধ্যমে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় কোনো তথ্য নির্ভরযোগ্য কি না বা সেটি সত্য হওয়ার সম্ভাবনা বেশি নাকি মিথ্যা, তাহলে তারা নিজেরাই তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারে।
“প্রয়োজনীয় কিছু দক্ষতা শেখানো হলে সত্য-মিথ্যা আলাদা করার কাজটা ওরা নিজেরাই করতে পারে।”
জারার মতে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পাশাপাশি স্কুলের নিচের শ্রেণি থেকেই শিশুদের তথ্য যাচাইয়ের শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন, যাতে সচেতনতা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিয়েই তারা বেড়ে উঠতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) সোশ্যাল সায়েন্সেস স্কুলের ডিন ও মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সুমন রহমান বলেন, “শিশুরা যদি তথ্যের পুরো ইকোসিস্টেমটি বুঝতে পারে, তবেই আমরা একটি উন্নত সমাজ পাব।”
তিনি বলেন, “অপতথ্য প্রায়ই সত্যের চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কারণ সত্য সব সময় ততটা চিত্তাকর্ষক নয় এবং অনেকের কাছে তা পছন্দসইও নয়। এ কারণে ফ্যাক্টচেকারদের কাজ কঠিন হয়ে পড়ে।”
সুমন রহমানের মতে, সত্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে মানুষ সহজে বুঝতে পারে এবং তা তাদের নজর কাড়ে।
এআই ও আস্থার সংকট
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও আলোচনায় কথা বলেন সুমন রহমান। তার মতে, সাইবার নিরাপত্তা আইনের একটি সংক্ষিপ্ত অংশ হিসেবে না রেখে এআই নিয়ে আলাদা ও সুনির্দিষ্ট আইন করা উচিত।
প্যানেলের আরেক বক্তা ইউএনডিপি বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ গভর্ন্যান্স বিশেষজ্ঞ শীলা তাসনিম হক বলেন, ডিপফেইকের সময়ে তথ্য যাচাইকারীদের এআইয়ের নৈতিক ব্যবহার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান কীভাবে কার্যকরভাবে কাজ করে, তা সামগ্রিকভাবে বোঝার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
“পরিবর্তনের ধারা কীভাবে এগোবে এবং কীভাবে আস্থা নিশ্চিত করা হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
তার মতে, গণতন্ত্র মূলত আস্থার ওপর নির্ভরশীল এবং আস্থার সঙ্গে সত্যের সম্পর্ক রয়েছে। আস্থা না থাকলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে পর্যালোচনা করতে হয়।
‘সত্যকে ছড়িয়ে দিতে হবে’
ফোয়ো মিডিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক পল রাপাচিওলি বলেন, মোবাইল ফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট আছে এমন প্রত্যেকেই এখন কোনো না কোনোভাবে ‘একজন সম্পাদক’।
তার মতে, অতীতে তথ্যের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের তথ্যের নির্ভুলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। এখন তথ্য পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের কাছেও তথ্য যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফ্যাক্টচেককে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে হাস্যরস ও আকর্ষণীয় গল্প বলার পরামর্শ দেন তিনি।
রাপাচিওলির মতে, কোনো কিছু যত বেশি খাঁটি হয়, সেটিকে মানুষের কাছে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তাও তত বেশি।
ফ্যাক্টচেকিং এখন শুধু কোনটি সত্য তা নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, যাচাইকৃত তথ্য কীভাবে মানুষের কাছে পৌঁছানো যায় এবং তাদের আস্থা অর্জন করা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
‘সত্যকে ছড়িয়ে দাও’ শিরোনামের মূল বক্তব্যে তিনি গত এক দশকে তথ্যের পরিবেশের পরিবর্তন এবং ভুয়া দাবি সংশোধনের বাইরে ফ্যাক্টচেকারদের আরও বিস্তৃতভাবে চিন্তা করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
এ প্রসঙ্গে ২০১৬ সালের একটি ঘটনার বর্ণনা দেন তিনি। সুইডেন বড়দিনের আলোকসজ্জা নিষিদ্ধ করেছে—এমন একটি দাবি নিয়ে এক পাঠকের প্রশ্ন পাওয়ার কথা তুলে ধরে রাপাচিওলি বলেন, পরে অনুসন্ধানে দেখা যায়, নির্দিষ্ট কিছু সড়কবাতির খুঁটিতে বড়দিনের আলোকসজ্জা না ঝোলানোর একটি স্থানীয় সিদ্ধান্তকে ভুলভাবে উপস্থাপন করেই ওই ধারণার জন্ম হয়েছিল।
তার ভাষ্য, ছোট একটি সংবাদমাধ্যম ওই সিদ্ধান্ত ইংরেজিতে অনুবাদ করতে গিয়ে ধর্মীয় কারণের ইঙ্গিত দিয়ে একটি বাক্য যুক্ত করেছিল। পরে সেই বিকৃত বার্তাই ওয়েবসাইট, ব্লগ ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং মূল প্রতিবেদনের চেয়ে বহুগুণ বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
রাপাচিওলি বলেন, ফ্যাক্টচেকাররা পরে দাবিটিকে মিথ্যা প্রমাণ করেন এবং প্রকৃত ঘটনা ব্যাখ্যা করে ভিডিও তৈরি করেন।
তার মতে, এ ঘটনা দেখায়, সত্যের একটি ছোট অংশকে প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করলে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ পেতে পারে।
সংবাদ পাওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কনটেন্ট নির্মাতাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কথাও বলেন রাপাচিওলি। তার মতে, এআই এ ক্ষেত্রে নতুন পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
তথ্য যাচাইকারী, সাংবাদিক, গবেষক ও ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স পেশাজীবীদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি বলেন।
তথ্য যাচাইকারীদের কমিউনিটি
বাংলাদেশে সুইডেন দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস লাইনাস র্যাগনাস উইকস, ডিজিটালি রাইট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী এবং ফোয়ো মিডিয়া ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মারিয়া পিটারসনের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ফ্যাক্টফেস্ট ২০২৬-এর উদ্বোধন হয়।
মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বাংলাদেশে অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য মোকাবিলায় অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং উদ্যোগ আরও জোরদার করতে তথ্য যাচাইয়ের সঙ্গে যুক্তদের একটি কমিউনিটি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, অনেক দেশে তথ্য যাচাইয়ের কাজ অন্য কোনো পেশার শাখা হিসেবে শুরু হলেও বাংলাদেশে এটি শুরু থেকেই একটি স্বতন্ত্র পেশা ও কমিউনিটি হিসেবে গড়ে উঠেছে।
শিক্ষার্থীদেরও এ কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত করার ওপর জোর দিয়ে মিরাজ বলেন, এর মাধ্যমে তারা ফ্যাক্টচেকারদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি আরও শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারবে।
রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস বলেন, বাংলাদেশ যখন একটি নাজুক রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন এর সঙ্গে অপতথ্য এবং বিদ্যমান তথ্যপরিবেশের সম্পর্ক রয়েছে।
এমন পরিবেশে তথ্য যাচাই এবং তথ্যের নির্ভুলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে কাজ করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
উইকস বলেন, বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা জরুরি। প্রত্যেক মানুষের তথ্য পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য থেকে তাদের সুরক্ষার বিষয়ে সুইডেন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
