Published : 19 Jul 2025, 03:21 PM
ঢাকায় জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারের দপ্তর (ওএইচসিএইচআর)-এর নতুন মিশন কেন চালু করা হচ্ছে, তার ব্যাখ্যা দিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর। সেই সঙ্গে এর প্রেক্ষাপটও তুলে ধরা হয়েছে।
সরকারপ্রধানের দপ্তর বলছে, দেশের মানবাধিকার উন্নয়ন ও সংরক্ষণে সহায়তা দেবে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের এই মিশন।
শুক্রবার ওএইচসিএইচআর এর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও এ কথা বলা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাতিসংঘের মানবাধিকার হাই কমিশনার ফলকার টুর্ক ও পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এ সমঝোতা চুক্তিতে সই করেন।
তিন বছর মেয়াদী এই সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের বিষয়ে সে দিন প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের সংস্থাগুলোকে প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি সহায়তা দেবে এই মিশন।
এর লক্ষ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রতিশ্রুতি পূরণে সক্ষমতা উন্নয়ন, আইনি সহায়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করা।
সরকারপ্রধানের দপ্তর বলেছে, “এই উদ্যোগ আমাদের চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহিতার প্রতিশ্রুতিকে প্রতিফলিত করে—বিশেষত ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রেক্ষাপটে।”
ঢাকায় এই মিশন স্থাপনের জন্য গত ১০ জুলাই সমঝোতা স্মারকের খসড়া অনুমোদন করে উপদেষ্টা পরিষদ।
সরকারের এই উদ্যোগে ‘গভীর উদ্বেগ ও আশঙ্কা’ প্রকাশ করে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ সে সময় ঘোষণা দেয়, বাংলাদেশে তারা জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের কার্যালয় খুলতে দেবে না।
এ সংগঠনের আমির শাহ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী ৫ জুলাই ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেন, অতীতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘মানবাধিকারের’ নামে ইসলামি শরিয়াহ, পারিবারিক আইন ও ধর্মীয় মূল্যবোধে ‘হস্তক্ষেপের অপচেষ্টা’ করেছে।
“এসব হস্তক্ষেপ একদিকে যেমন জাতীয় সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত, অন্যদিকে মুসলিম সমাজের ধর্মীয় অনুভূতিরও পরিপন্থি। তাই বাংলাদেশে জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয় খুলতে দেওয়া হবে না।”
সরকারপ্রধানের দপ্তর বলছে, “আমরা স্বীকার করি, বাংলাদেশের কিছু গোষ্ঠী জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থাগুলোর আদর্শগত অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
“বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত সমাজ। আমাদের নাগরিকরা মনে করেন, যেকোনো আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বে আমাদের মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। সে কারণেই ওএইচসিএইচআর মিশনের কার্যক্রম গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধ ও প্রতিকারে এবং পূর্ববর্তী সরকারের সময় সংঘটিত অপরাধের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।”
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, “এই মিশন বাংলাদেশের প্রচলিত আইন, সমাজব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন কোনো সামাজিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হবে না।
“আমরা আশা করি মিশনটি স্বচ্ছতা বজায় রাখবে এবং স্থানীয় অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে। জাতিসংঘ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, তারা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বাস্তবতার প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করে কাজ করবে।”
সরকার প্রধানের দপ্তর বলেছে, “যদি ভবিষ্যতে এই অংশীদারিত্ব জাতীয় স্বার্থের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়, তবে সরকার এমওইউ থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার রয়েছে।”
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “যদি পূর্ববর্তী প্রশাসনের সময়ে এমন একটি মানবাধিকার অফিস থাকত, তবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গণগ্রেপ্তারের অনেক ঘটনাই তদন্ত, নথিভুক্ত এবং বিচারপ্রক্রিয়ার আওতায় আসতে পারত।
“আমাদের মানবাধিকার সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি কেবল আদর্শগত নয়, বরং ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে গঠিত হওয়া উচিত।

“সরকার এই অংশীদারিত্বকে আমাদের জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার এবং নাগরিকদের সুরক্ষা বৃদ্ধির একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে—যা আমাদের মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত, আমাদের আইনের ভিত্তিতে গঠিত এবং আমাদের জনগণের প্রতি জবাবদিহিতাশীল।”
গণঅভ্যুত্থানে গত ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটে, বিগত এ সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ আগে থেকেই ছিল।
অভ্যুত্থানে দমাতে ব্যাপক বলপ্রয়োগের ঘটনা ঘটে। এই আন্দোলন ঘিরে ১ জুলাই থেকে ১৫ অগাস্টের মধ্যে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাবলী নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সে সময় ১,৪০০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
শুক্রবার ওএইচসিএইচআর এর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত বছরের অগাস্টের পর থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয়ের সম্পৃক্ততা বেড়েছে। মানবাধিকার বিষয়ক সংস্কার এগিয়ে নিতে মানবাধিকার কার্যালয় বিভিন্ন অংশীজনদের সঙ্গে কাজ করছে এবং গণবিক্ষোভে রক্তক্ষয়ী নির্যাতনের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যানুসন্ধান করেছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার হাই কমিশনার ফলকার টুর্ক বলেন, বাংলাদেশের পটপরিবর্তনের এই সময়ে মানবাধিকারের সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি যে ‘অন্যতম ভিত্তি’ হিসেবে রয়েছে, সেই গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পাঠাচ্ছে এই সমঝোতা স্মারক।
“তথ্যানুসন্ধানের সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সহায়তা যাতে আরও ভালোভাবে দেওয়া যায়, সেক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে এই এমওইউ। পাশাপাশি মৌলিক সংস্কারের উদ্যোগগুলোর ক্ষেত্রে আমাদের অভিজ্ঞতা ও সহায়তা নিয়ে বাংলাদেশের সরকার, নাগরিক সমাজ এবং অন্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সরাসরি আমাদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে পারব।”