Published : 26 Mar 2026, 04:21 PM
ঢাকার উত্তরা থেকে তৃতীয় শ্রেণি পড়ুয়া সন্তানকে নিয়ে জাতীয় প্যারেড ময়দানে এসেছিলেন স্থপতি আব্দুল্লাহ রাজু। দেড় যুগ বাদে স্বাধীনতা দিবসে আয়োজিত বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ উপভোগ করেছেন তারা।
আয়োজন শেষে সন্তানের হাত ধরে বেরিয়ে যাওয়ার সময় এই বাবা বললেন, “এটা একটা লিগ্যাসি বলতে পারেন।
“ছোটবেলা থেকেই আমি বাবার হাত ধরে এসছি, উনি বেঁচে নেই। তো আমার বেবিকে নিয়ে আসাটা আমার দায়িত্ব।”
সন্তানের মনে স্বাধীনতা ও দেশপ্রেমের বীজ ‘দায়িত্ব নিয়েই’ বপন করার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করে রাজু বললেন, নতুন প্রজন্মকে দোষারোপ না করে তাদেরকে শেখানের দায়িত্বটা বড়দেরই নিতে হবে। কারণ তারা বড়দের দেখেই শেখে।

স্বাধীনতা দিবসে সম্মিলিত বাহিনীর কুচকাওয়াজ উপভোগ করতে হাজারো মানুষের জমায়েত হয়েছিল ঢাকার জাতীয় প্যারেড ময়দানে। দর্শক সারিতে এদিন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে যেমন বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি ছিল, তেমনই ঢাকা ও এর আশেপাশের বিভিন্ন এলাকার জনসাধারণ আসেন কেবলই আয়োজন উপভোগ করতে।
তবে নানা বয়সি ও পেশার মানুষের এই মিলনমেলার কেন্দ্রে যেন ছিল শিশু-কিশোররা। বড়দের হাত ধরে সাত সকালেই হাজির হয়ে অপেক্ষা করছিল অনুষ্ঠান শুরুর। প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানানোর পরে মূল আয়োজন শুরু হতেই তাদের অপেক্ষা ফুরায়।

এদের বেশিরভাগই বিভিন্ন সময় টিভির পর্দায় এমন আয়োজন দেখেছে, বৃহস্পতিবার প্রথমবার সরাসরি কুচকাওয়াজ উপভোগ করে চোখেমুখে ছিল তৃপ্তির ঝলক। ছন্দবদ্ধ পায়ে সম্মুখপানে দৃপ্ত যাত্রার কুচকাওয়াজ দেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিল অনেকেই।
একে একে বিভিন্ন বাহিনীর ট্যাংক, কামানের মতো ভারী যুদ্ধাস্ত্র ও প্রযুক্তিসহ নানা সরঞ্জাম দেখে বড়দের কাছে বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চেয়ে প্রশ্নও ছুড়ে দিচ্ছিল শিশুরা। আয়োজনের সবশেষ আকর্ষণ বিমান বাহিনীর ‘অ্যারোবেটিক শোতে’ যুদ্ধবিমানগুলোর নানান উড্ডয়ন কৌশল দেখে তৃপ্তি নিয়েই বাসায় ফিরেছে তারা।
স্থপতি আব্বুল্লাহ রাজুর সন্তান রাজ্যের কথাতে তারই প্রমাণ মিলল। সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয়টি জানতে চাইতেই এই স্কুলছাত্র বলছিল, সবকিছু দেখে ভালো লেগেছে, সবচেয়ে ভালো লেগেছে বিমান।
রাজুর কথায়, “বিমানের প্রতি তার খুব আগ্রহ, বিভিন্ন এয়ারক্রাফট সম্পর্কে সে খুবই আপডেটেড। সে বিমানগুলো টেলিভিশনে দেখে, এর আগে লাইভ প্যারেডে দেখেছে।

“তো তাকে ডিরেক্ট একটু মিগ-২৯ কেন দেখাব না। এই প্র্যাক্টিক্যালি এক্সপেরিয়েন্স বাচ্চাদের জ্ঞানের জন্য ভালো।”
সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে স্বাধীনতা প্যারেড উপভোগ করতে আসার পেছনে ঘুরে-ফিরে আবারো ছোটদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে বড়দের দায়িত্বের কথা টেনে আনলেন এই বাবা।
তিনি বলেন, “ছোটরা এই বিষয়গুলো ধারণ করলে দেশমাতৃকার জন্যই ভালো। এই জিনিসগুলো ওদের ভেতরে যদি তৈরি না হয়, আর আমরা যদি দোষারাপ করি জেনজি জেনারেশন-আলফা জেনারেশন এই সেই…দোষটাতে ওদের না। ওরা তাই করে, যেটা ওরা দেখে।
“আমি এখানে নিয়ে আসছি, ও এখানে আসছে। আমি সিনেপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সিনেপ্লেক্সে যাবে, আমি খেলা দেখাতে নিয়ে গেলে খেলা দেখাতে যাবে। আমি কোন জায়গাকেই ছোট করছি না, বাট সব জায়গার সাথে বেবিদের এটাচমেন্ট করলে কনফিডেন্স-সারভাইভাল জিনিসগুলি বাড়ে। এটা আমার পার্সোনাল সাইকোলজি, আমার বেবিকে আমি আমার আইডিওলোজিতে…যতটুকু পারি চেষ্টা করছি।”

ঢাকার রূপনগর এলাকা থেকে বাবার হাত ধরে প্যারেড ময়দানে হাজির হয় পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া নাঈম। রূপনগর পাইলট স্কুলের এই শিক্ষার্থী বলছিল, সরাসরি প্রথমবার এমন আয়োজন উপভোগ করেছে। এর মধ্যে তার সবচেয়ে ভালো লেগেছে বিমান।
তার বাবা গার্মেন্টকর্মী মিজানুর রহমান বলেন, “ঢাকায় থাকি, অনেকদিন পরে এইবারের প্রোগ্রামে আসার ইচ্ছা ছিল আগে থেকেই। সকালে আসার সময় ছেলেকে বললাম রেডি হইতে।
“পরে একসাথে আসলাম। আমরা সুন্দরমতোই দেখতে পারছি সব।”
বিমান বাহিনীর প্রদর্শনীর সময় দর্শকসারিতে নার্সারিপড়ুয়া আব্দুল্লাহকে আঙ্গুল দিয়ে বিভিন্ন বিমান দেখাচ্ছিলেন বড়ভাই কলেজপড়ুয়া ফাহিম। ছোটভাই নানান প্রশ্ন করছিল, সাধ্যমতো সেসব প্রশ্নের উত্তরও দিচ্ছিলেন ফাহিম।

কেমন লাগল জানতে চাইলে শিশু আব্দুল্লাহ জানায়, তার অনেক ভালো লেগেছে।
কী কী দেখেছে, জানতে সাইলে সে বলে যায়, “নৌবাহিনী দেখছি, সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিমান দেখছি। সবচেয়ে ভালো লাগছে কামান।”
নারায়নগঞ্জের রূপগঞ্জ নিয়ে ছোটভাইকে নিয়ে এই অনুষ্ঠান উপভোগ করতে ফাহিম রওনা দেন সকাল ৭টায়।
তিনি বলেন, “আমিও আগে কখনো আসিনাই। আগে টিভিতে দেখছি, এইবার সরাসরি দেখলাম।”
২০০৮ সালের পর এবারই ২৬ মার্চের আনুষ্ঠানিকতায় যুক্ত হল এ প্রদর্শনী।
চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কুচকাওয়াজ বা প্যারেড প্রদর্শনী বন্ধ ছিল। তবে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উদযাপনে এ আয়োজন থাকত।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এবার স্বাধীনতা দিবসে জাঁকজমকভাবে এ আয়োজন করতে রোজার শুরু থেকে প্যারেড স্কয়ার মাঠে প্রস্তুতি শুরু হয়।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কুচকাওয়াজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়, বেলা ১২টা পর্যন্ত চলা এই আয়োজনে মঞ্চ থেকে সালাম গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
আয়োজনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ -জামান, নৌ বাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন ও মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসরাত চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।