Published : 23 Mar 2026, 11:27 PM
সাত মাস আগে ঢাকার দক্ষিণখানে এক কিশোরী গৃহকর্মীর মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে ধর্ষণের আলামত পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় গৃহকর্তা শরিফুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আজমপুর কাঁচাবাজার এলাকার একটি বাসায় ২০২৫ সালের ১৯ অগাস্ট ওই কিশোরীর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তেলাপোকা মারার বিষপানে আত্মহত্যার অভিযোগে দক্ষিণখান থানায় অপমৃত্যুর মামলায় হয়। মৃতদেহের এইচভিএস-হাই ভ্যাজাইনাল সোয়াব পরীক্ষায় পুরুষ বীর্যের উপস্থিতি পায়।
সন্দেহের তালিকায় নাম আসে গৃহকর্তা শরিফুল ইসলামের। তার বিরুদ্ধে কিশোরীর মা বাদী হয়ে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি মামলা দায়ের করেন। ওই দিনই গ্রেপ্তার হওয়া শরিফুল বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে; সবশেষ গত ১৬ মার্চ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ছিল। কিন্তু ওইদিন দক্ষিণখান থানা পুলিশ প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। ঢাকার মহানগর হাকিম রৌনক জাহান তাকি আগামী ১২ এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই তাহমিনা আক্তার।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দক্ষিণখান থানার এসআই মেহেদী হাসান বলেন, “মামলার তদন্ত চলছে। মেয়েটাকে ওই বাসার মালিক একটা মোবাইল দিয়েছিল। সারাক্ষণ মোবাইল নিয়ে থাকতো।
“মোবাইল নিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিতে চেয়েছিল। একারণে কীটনাশক বিষপানে আত্মহত্যা করে।”
মামলার অভিযোগ ধর্ষণের পর মৃত্যু। মেয়েটা যদি আত্মহত্যা করে, তাহলে শরিফুলের সঙ্গে ওই ধারা যায় কি?
এমন প্রশ্নের উত্তরে তদন্ত কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, “বিষয়টা পরীক্ষা-নিরীক্ষার। ভিকটিমের ডিএনএ টেস্ট করা হয়েছে। সেখানে পুরুষের বীর্যের উপাদান পাওয়া গেছে।
“আসামির ডিএনএ টেস্টের জন্য পাঠানো হয়েছে। যদি ম্যাচিং হয়, তাহলে তো হয়ে গেল। আর ওই বাসায় একমাত্র পুরুষ ছিলে আসামি। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”
মামলার বাদী বলেন, “অভাবের সংসার। জীবনে কিছুই করতে পারিনি। একই গ্রামের মানুষ ছিল শরিফুল। তার ছেলেটাকে দেখাশোনার জন্য আমার মেয়েটাকে নিয়েছিল। সম্পর্কে ওরা চাচা (শরিফুল)-ভাতিজি (কিশোরী)।
“তিন বছর হলো, আমাকে মেয়েটাকে নিয়েছে। কীভাবে আমার মেয়েটাকে মেরে ফেলল! মেয়েটা অপরাধ করলে আমার কাছে দিয়ে দিত। মেয়েটাকে মেরে ফেলল।”
কিশোরীর মৃত্যুর দিনের কথা বলতে গিয়ে তার মা বলেন, “আগের দিন রাতে আমার মেয়ের সাথে ফোনে কথা হলো। হাসি-খুশিতে কথা হলো। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আমাকে ফোন করে জানায়, মুনিয়া অসুস্থ। হাসপাতালে ভর্তি। দ্রুত ঢাকায় যেতে বলে। শরিফুলের মা আমাকে নিয়ে ঢাকা যায়।
“বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে হাসপাতালে পৌঁছায়। হাসপাতালে গিয়ে দেখি, মেয়েটার লাশ পড়ে আছে। গিয়ে শুনি, সকাল সাড়ে ৮টার দিকেই মেয়েটা মারা গেছে। সবকিছু গোপন করে আমাকে একা ঢাকা নিয়ে যায়।”
মোবাইল কেড়ে নেওয়ায় গৃহকর্মী কিশোরী আত্মহত্যা করেছে, শরীফুলের পরিবারের এমন দাবি মানতে নারাজ তিনি।
বাদী বলেন, “মেয়েটা দেখতে অনেক সুন্দর ছিল। তার সাথে অনেক খারাপ কিছু করেছে। আমার মনে হয়, ও এসব আমাদের বলে দিতে চেয়েছিল। এজন্য ওকে মেরে ফেলেছে।”
তিনি বলেন, “গত কোরবানি ঈদে ওরা বাড়ি যায়। মেয়েটা বড় হয়েছে। বিয়ের প্রস্তাব আসছিল। এজন্য ওকে আর ঢাকায় দিতে চাইনি। জোর করে ঢাকায় নিয়ে আসে। বলে, বিয়ের দায়িত্ব তাদের।
“আগে প্রতিমাসে এক হাজার টাকা করে দিত। মেয়েকে যখন দিতে চাইনি, এরপর থেকে মাসে দেড় হাজার টাকা পাঠাতো।”
আসামিকে রক্ষার জন্য সবাই পুলিশ ও এলাকাবাসী এক হয়েছে দাবি করে কিশোরীর মা বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। আমাদের পক্ষে যেন কথা না বলে, এজন্য সবাইকে টাকা দিয়েছে। ও আত্মহত্যা করেছে, এমনটা গ্রামের মানুষকে বুঝিয়েছে। গ্রামের মানুষ জোর করে চার লাখ ৮০ হাজার টাকায় আপস করাইছে। পরে তো জানতে পারলাম, ও (শরিফুল) আমার মেয়ের সাথে খারাপ কাজ করেছে।
“টাকা চাই না, বিচার চায়। মেয়েটাকে মেরে ফেলছে। মেয়েটাকে ছাড়া কেমন দিন কাটাব? সারাজীবনেও ওকে ভুলতে পারব না। আমার ভালো, সুস্থ মেয়েটাকে মেরে ফেলল, একথা শোনার পরই পাগল হয়ে গেছি।
“যদি আপোস করতে চায়, তাহলে আমার মেয়েটার জান ফিরিয়ে দিক বা ওর মেয়েটাকে আমাকে দিয়ে দিক। তাহলে বুঝবে সন্তানের মর্ম। আর সাজা না হলে দুনিয়ার সব জায়গায় অঘটন ঘটাবে।”
মুনিয়ার দাদা রুহুল আমিন বলেন, “আমরা নাতনিকে মেরে ফেলেছে। আইনের যে সাজা আছে, সর্বোচ্চ সাজা চাই।”
বাদীপক্ষকে অসহযোগিতার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্তকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, “এ ঘটনায় প্রথমে অপমৃত্যুর মামলা হয়েছিল। তার পরও ভিকটিমের ডিএনএ টেস্টের জন্য পাঠাই। আসামিও ধরে নিয়ে আসছি। সবকিছুই কিন্তু আমরা করছি।
“তার পরও আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ। আর এলাকাবাসী যদি অসহযোগিতা করে থাকে, সেখানে তো আমাদের কিছু করার নেই।”
মামলাটি আন্তরিকভাবে দেখছেন মন্তব্য করে মেহেদী হাসান বলেন, “বাদীপক্ষকে আইনগত যত সহযোগিতা করা যায়, করব।”
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ওই কিশোরী ২০২২ সাল থেকে শরিফুল-রাবেয়া সুলতানা শিল্পী দম্পতির বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে আসছিল। গত বছরের ১৯ অগাস্ট সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে।
দক্ষিণখান থানা পুলিশ মুনিয়ার মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে হাসপাতালে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে পাঠায়।
পরে হাই ভ্যাজাইনাল সোয়াব পরীক্ষায় পুরুষ বীর্যের উপস্থিতি মেলায় বাদী মামলায় বলেছেন, শরিফুল তার নাবালিকা মেয়েকে মৃত্যুর আগে যেকোনো সময় ‘ধর্ষণ’ করেছেন।