Published : 27 Aug 2025, 08:25 AM
টেলিভিশনে ইসলামী অনুষ্ঠানের উপস্থাপক নূরুল ইসলাম ফারুকী খুন হওয়ার পর ১১ বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার পায়নি পরিবার।
পুরো এক দশক তদন্ত করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) গতবছরের শেষ দিকে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিতে পারলেও সব আনুষ্ঠানিকতা সেরে এখনো অভিযোগ গঠনের শুনানি শুরু করা যায়নি।
ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন বলছেন, এখন মামলার বিচার যেন দ্রুত শেষ করা যায়, রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সেই চেষ্টা তারা করবেন।
আর ফারুকীর ছেলে ফয়সাল ফারুকী বলছেন, “১১ বছর হয়ে গেছে। বাবার হত্যার বিচার পাইনি। ভরসা পাচ্ছি না যে বিচার পাব। তবুও আশায় আছি। কী কারণে আমার বাবাকে খুন করা হল মুল কারণটা, সত্যিটা জানতে চাই। হত্যাকাণ্ডের ইন্ধনদাতা, হোতা কারা, সেটাও জানতে চাই।”
২০১৪ সালের ২৭ অগাস্ট রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারের বাসায় ইসলামী বক্তা এবং ইসলামী ফ্রন্টের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের কেন্দ্রীয় নেতা ফারুকীকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তার ছেলে ফয়সাল ফারুকী এই মামলা দায়ের করেন।
ফারুকী চ্যানেল আইয়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ‘কাফেলা’ ও ‘শান্তির পথে’, মাই টিভির লাইভ অনুষ্ঠান ‘সত্যের সন্ধানে’ এর উপস্থাপক ছিলেন। এছাড়া তিনি ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত’ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্ট জামে মসজিদের খতিব ছিলেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়, ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে ফারুকীর বাসায় কলিং বেল দেয় দুর্বৃত্তরা। বাসার দরজা খুললে দুজন লোক প্রবেশ করে তার সঙ্গেই ড্রয়িং রুমে বসেন। কিছুক্ষণ পর আরও ৬/৭ লোক প্রবেশ করে। বসার জায়গা না থাকায় ফারুকীর মামাতো ভাই মারুফ হোসেন ভেতর থেকে চেয়ার আনতে যান। ফিরে এসে দেখেন ফারুকীর মাথায় পিস্তল ও চাপাতি ধরে রেখেছে তারা। পরে বাসার সবাইকে বেঁধে ফারুকীকে হত্যা করে নগদ টাকা, মোবাইল, স্বর্ণালঙ্কার ও ক্যামেরা নিয়ে চলে যায়।
গোয়েন্দা পুলিশ ও সিআইডির এক ডজনের বেশি কর্মকর্তার হাত ঘুরে এ মামলার তদন্তভার পান সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার কে এম আবুল কাশেম। গত বছরের ৫ নভেম্বর তিনি ছয়জনকে আামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
তদন্তে ১২ জনের সম্পৃক্ততা খুঁজে পেলেও তাদের মধ্যে ছয়জনের পূর্নাঙ্গ নাম ঠিকানা না পাওয়ায় তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয় অভিযোগপত্রে। এছাড়া সাক্ষ্য প্রমাণ না পাওয়ায় আরও ছয়জনকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দিতে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
এ মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন- হাদিসুর রহমান ওরফে সাগর, আব্দুল্লাহ আল তাসনিম নাহিদ, রফিকুল ইসলাম ফারদীন, আবু রায়হান মাহমুদ আব্দুল হাদী, মাহমুদ ইবনে বাশার, রতন চৌধুরী ওরফে ইঞ্জিনিয়ার রিপন ওরফে রাকিবুল ইসলাম রিয়াজ।
এছাড়া জামাই ফারুক, নাঈম, ইমন, হাফেজ কবির, আশফাক ই আজমদ ও খোরশেদ আলমদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার ‘তথ্যপ্রমাণ পেলেও’ তাদের পূর্ণাঙ্গ নাম ঠিকানা না পাওয়ায় অব্যাহতির আবেদন করা হয় অভিযোগপত্রে।
একই ঘটনায় বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের পক্ষে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা ঢাকা মহানগরের সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেন তুষারের করা পিটিশন মামলায় সাক্ষ্য প্রমাণ না পাওয়ায় ইসলামী বক্তা তারেক মনোয়ারসহ বেসরকারি টিভি চ্যানেলের ছয়জন উপস্থাপককে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। তারা হলেন– মুফতি কাজী মো. ইব্রাহীম, কামাল উদ্দিন জাফরী, আরকানুল্লাহ হারুনী, খালেদ সাইফুল্লাহ বখশী ও মুখতার আহম্মদ।
আদালত সিআইডি পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে পলাতক আসামি মাহমুদ ইবনে বাশার ও রফিকুল ইসলাম রুবেলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। হাসিদুর রহমান কারাগারে রয়েছেন। অপর তিন আসামি রয়েছেন জামিনে।
সবশেষ গত ২৯ জুলাই পলাতক দুই আসামিকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়ে দুটি জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আদেশ দেন ঢাকার মহানগর হাকিম মিনহাজুর রহমান। পুলিশকে আগামী ১ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।

মামলার বাদী ফয়সাল ফারুকী বলেন, “বিগত সরকার মামলাটা নিয়ে তেমন কিছু করেনি। এই সরকার, বিশেষ করে আইন উপদেষ্টার কাছে অনুরোধ, মামলাটার বিচার দ্রুত শেষ করবেন। পলাতকদের গ্রেপ্তার করে দ্রুত আইনের আওতায় আনবেন।
“আর যারা জামিনে আছে, তাদের কারাগারে রাখবেন। তারা যদি বাইরে থাকে তাহলে আমরা নিরাপদ বোধ করি না। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা প্রত্যাশা করছি। আর মামলার বিচারটা যেন দ্রুত শেষ হয়।”
আসামি ইঞ্জিনিয়ার রিপনের আইনজীবী মো. জায়েদুর রহমান বলেন, “ভিকটিমের পরিবারের মত আসামিরাও ন্যায়বিচার চান। এই মামলার তদন্তে দীর্ঘ সময়ে চলে গেছে। এতে বাদী যেমন হয়রানির শিকার হয়েছেন, আসামিদেরও হয়রানি হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর এখনও বিচার শুরু হয়নি। এগুলো সরকারের ভালোভাবে দেখা উচিত। সবাই যেন ন্যায়বিচার পায় সেই প্রত্যাশা করছি।”
অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন বলেন, “এ মামলায় দুই আসামি পলাতক রয়েছেন। তাদের আদালতে হাজির হতে দুটি জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। পত্রিকার বিজ্ঞপ্তির ওই প্রতিবেদন এলে মামলাটি বিচারের জন্য বদলি করা হবে।”
আরও পড়ুন:
ফারুকী হত্যা: ৮ বছর পরও 'তদন্ত প্রতিবেদনের প্রস্তুতি' সিআইডির
ফারুকী হত্যা: ছয় বছর ধরে তদন্তই চলছে
ফারুকী হত্যা: কয়েকজনের নাম পেয়েছে সিআইডি
রাজশাহীর শুভ হত্যা: এক বছরেও তদন্ত শেষ হয়নি