Published : 16 Mar 2026, 01:46 AM
“বুড়িগঙ্গা থেকে খালটা ঢুকছে, আমরা বলি জয়নগর খাল, মিলছে গিয়া ধলেশ্বরীতে। এই খাল দিয়া পানি-পুনি যাইত, মানুষ নদীর পানি জমিনে দিতে পারত, খাল থেকে মানুষ মেশিনে পানি নিত।”
সত্তরোর্ধ্ব মো. পিয়ার আলী একজন গ্যারেজ ব্যবসায়ী; বলছিলেন একটি খালের কথা, ১৯৭৭ সালে খালটির পুনঃখনন কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
ঢাকা জেলার কেরাণীগঞ্জ উপজেলার আটিবাজার পার হলেই ডান দিক দিয়ে বয়ে গেছে জয়নগর খাল। কেরাণীগঞ্জের ভেতর দিয়ে খালটির গন্তব্য ধলেশ্বরীতে।
স্থানীয় জয়নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি খালের কোলঘেঁষে। হেলিকপ্টারে করে এসে এই মাঠেই ১৯৭৭ সালে অনুষ্ঠান করে নিজ হাতে খাল খনন করেছিলেন জিয়াউর রহমান।
খাল খননের পর সচল এই প্রবাহ গত পাঁচ দশকে দখল, দূষণ, কুচরিপানার বিস্তার, প্লাস্টিক বর্জ্যের আগ্রাসনে অনেকটাই স্থির হয়ে গেছে। খালের কোথাও-কোথাও বাড়ি-ঘর; কোথাও কারও ভবনের সীমানাপ্রাচীর।

জয়নগর খালের উপরই একটি ‘অস্থায়ী গ্যারেজে’ বসে বৃদ্ধ পিয়ার আলী বলছিলেন, তার চোখের সামনেই কেমন করে একটি জীবন্ত খাল মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে গেল।
১১ মার্চ পড়ন্ত দুপুরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কাছে জয়নগর খাল নিয়ে স্মৃতিচারণ করলেন পিয়ার আলী। তার ভাষ্য, “খালের থেকে মানুষ মেশিনে পানি নিত। দেশে ইরি ধান আনছেন জিয়াউর রহমান সাব। চায়না থেকে শ্যালো মেশিনও আনছেন জিয়াউর রহমান সাব। অনেক সুবিধা কইরা গেছেন।
“কী কমু, কন। উনি ক্ষমতা থেকে যাওয়ার পর যারা বিএনপি করতো, তারাই কিন্তু স্লুইচ গেট করল। খালটাকে তছনছ করে ফেলল।”
পিয়ার আলীর বলে চলেন, “এখনও আছে, একটাও ভাঙা হয় নাই। খাল খনন করলে ভাঙা পড়ব। নিমতলীতে আছে, কলাতিয়ায় আছে, মানিকনগরে আছে।
“খালটাকে ধ্বংস কইরা দিল। এখন মানুষ বাড়িঘর কইরা, বিল্ডিং কইরা ফেলছে। আমি এলাকার বাসিন্দা, আমার গুষ্টির জন্মও এখানে।”

পিয়ার আলীর মত স্মৃতি আছে স্থানীয় আরও অনেকের। ত্রিশ বছর ধরে আটিবাজার এলাকায় বসবাস করেন ৬২ বছর বয়সী হাফিজুল হাসান।
তিনি বলেন, “এই জয়নগর খালে, এই ঘাটে নৌকা ভিড়ে থাকত। আমি নিজে গোসল করেছি। পানি ভালো ছিল। মনে হয়, ৫০-১০০ মানুষ এই ঘাটে গোসল করত। নৌকা মালামাল নিত। ঢাকা থেকে সরাসরি নৌকা দিয়ে মাল আসত। কিন্তু এখন তো খালই বন্ধ হয়া গেছে। দখল হয়ে গেছে।”
খোলামুড়া মোড় থেকে পশ্চিম দিকে বয়ে যাওয়া জয়নগর খালের উপর পাকা ঘাটে বসে হাফিজুল হাসান বললেন, সবার আগে খালে ময়লা ফেলা বন্ধ করতে হবে। ময়লার গাড়ি দিয়ে ময়লা নিতে হবে।
মৃতপ্রায় জয়নগর খাল পুনঃখনন কার্যক্রম আবারও শুরু হচ্ছে। কিছুদিন আগে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানিসহ সরকারি কর্মকর্তারা সরেজমিনে ঘুরে গেছেন।
নির্বাচনি ইশতেহারের অংশ হিসেবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার ‘নদী-নালা-খাল, জলাধার খনন ও পুনঃখনন’ কর্মসূচি শুরু করছে নবনির্বাচিত বিএনপির সরকার।
সোমবার ৫৪ জেলায় ‘দেশব্যাপী নদী-নালা-খাল, জলাধার খনন ও পুনঃখনন’ কর্মসূচি উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দিনাজপুর জেলার কাহারোল উপজেলায় সাহাপাড়া খালের ১২.২০ কিলোমিটার পুনঃখননের মাধ্যমে তিনি পিতার পথে খননযাত্রা শুরু করবেন।
এই কর্মসূচি ঘিরে গত ১১ মার্চ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে সরকারদলীয় প্রত্যেক মন্ত্রী, এমপিদের খননযোগ্য খালের নাম, পরিধি, বাস্তবায়নকারী সংস্থার নাম উল্লেখ করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট জেলার মন্ত্রী, উপদেষ্টা, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ ও সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় উপস্থিত থেকে খাল খনন কাজের উদ্বোধন করতে বলা হয়েছে চিঠিতে।
স্থানীয়ভাবে এই প্রকল্পে সমন্বয় করছে জেলা প্রশাসন ও খনন কার্যক্রমে নির্ধারিত সংস্থা।
সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসকে প্রধান করে গঠন করা হয়েছে একটি বিশেষ সেল। এই সেল পুরো কার্যক্রমের তদারকি, পরামর্শ দেবে।
সরকার গঠনের পর মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই সরকার জানায়, ১৮০ দিনের অগ্রাধিকারভিত্তিক কার্যক্রমের মধ্যে দেশব্যাপী ‘নদী-নালা-খাল, জলাধার খনন ও পুনঃখনন’ কর্মসূচি গুরুত্ব পাবে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, দেশব্যাপী নদী-নালা-খাল, জলাধার খনন ও পুনঃখনন’ কর্মসূচি শুরু করার পর পরিবেশসম্মত উপায়ে তার ‘প্রবাহ-প্রকৃতি’ ঠিক রাখা ও রক্ষণাবেক্ষণে কর্তৃপক্ষের বাড়তি মনোযোগ দরকার, কারণ দখল, দূষণ বন্ধ না হলে সুফল আসবে না।

প্রকল্প ঘিরে দলীয় নেতাকর্মীরা বাড়তি সুবিধা নিতে পারে এবং দুর্নীতি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ।
সরকারের একাধিক মন্ত্রী বলেছেন, প্রকল্প শুরু করার পর রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টিতে জোর দিয়েই সংশ্লিষ্টরা কাজের দেখভাল করবেন।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, জিয়াউর রহমানের খাল কাটা কর্মসূচির আলোকে নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল, নদী, নাল, জলাধার খনন করা হবে।
জিয়াউর রহমানের সময় এ কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ে ৬৭৫.১৮ মাইল দীর্ঘ ১৯৩টি খাল খনন ও পুনঃখনন করা হয়।
১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর যশোরের শার্শা উপজেলার উলশী এলাকায় ‘বেতনা নদী’ পুনর্খনন কাজ যখন উদ্বোধন করেন জিয়াউর রহমান, তখন তিনি সেনাপ্রধান ও উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক।
‘জিয়া কেন জনপ্রিয়’ শীর্ষক একটি সংকলন গ্রন্থে এ কে এম সালেক তার প্রবন্ধে লিখেছেন, জিয়াউর রহমানের এই কার্যক্রম শুরুর আগে দেশে ১০ শতাংশ জমিতে শুকনো মৌসুমে পানি সরবরাহ সম্ভব ছিল। খাল খনন কর্মসূচির পর অন্তত ৫২ লাখ একর জমিতে সেচের সুবিধা বৃদ্ধি পায়। এছাড়া মাছ উৎপাদন, পানি নিষ্কাশন ও নৌ চলাচলে সহায়ক হয় ওই প্রকল্প। বৃদ্ধি পায় খাদ্য উৎপাদন।
এখন নতুন করে খাল খনন কর্মসূচির বিষয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় বলছে, এ কর্মসূচি কৃষি ও সেচ কার্যক্রমে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে, যা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। ভূ-উপরিস্থ পানির পরিমাণ বৃদ্ধির ফলে ভূ-গর্ভস্থ পানির চাহিদা হ্রাস করাও এই খনন কার্যক্রমের লক্ষ্য।
সরকার আশা করছে, এই কার্যক্রমের ফলে খরা প্রবণতা কমবে, অনদিকে বন্যা ও জলাবদ্ধতাও হ্রাস পাবে।
পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেছেন, পানিসম্পদ, স্থানীয় সরকার, কৃষি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের আর্থিক সমন্বয়ে ‘দেশব্যাপী নদী-নালা-খাল, জলাধার খনন ও পুনঃখনন’ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হবে।
প্রতি কিলোমিটার খনন, পুনঃখননে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অন্তত ২০ লাখ টাকা ব্যয় হবে বলে প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, “এটা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্ভাব্য ব্যয়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের। আমাদেরটাই মেইনলি আরকি। আমরাই এই প্রকল্পে লিড দিচ্ছি। অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে কম-বেশ হতে পারে।”
প্রতিমন্ত্রী জানান, অধিকাংশ খনন কাজ থাকছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে; এছাড়া কৃষি, স্থানীয় সরকার ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নেও কিছু কাজের বাস্তবায়ন হবে।
যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পুনঃখনন প্রকল্প শুরু করার পরিকল্পনা থাকলেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা রয়েছে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর। এক্ষেত্রে শ্রমিক নিয়োগের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক নিযুক্ত করতে কর্তৃপক্ষকে উৎসাহিত করতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।
সংসদ সদস্য ফরহাদ হোসেন আজাদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়েছেন প্রকল্পের জনসম্পৃক্ততার উপর। তিনি চেয়েছেন যান্ত্রিক সরঞ্জামের পাশাপাশি লোকবলও যুক্ত হোক। এতে করে অনেক পরিবারের কমসংস্থান হবে।
“নদী-নালা-খাল, জলাধার খনন ও পুনঃখনন প্রকল্পে শ্রমিক নিয়োগের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকও নিযুক্ত হবে। বিএনপিসহ অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী, অনুসারীরাও যেন মানুষকে নিয়ে এই কাজে যুক্ত হন, প্রধানমন্ত্রী এমনটাই চান।”
বিগত আওয়ামী লীগের তিন মেয়াদের শাসনামলে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে খাল, নদী খনন, পুনঃখনন হলেও জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে আলাদা কর্মসূচি হিসেবে একে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “১৯৯১ সালে সরকার গঠনের পর প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে নেওয়া খাল খননের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছিলেন। তিনি ১৯৯২ সালে কয়েকটি জেলায় তা শুরু করেন। পরে তা আর ব্যাপকভাবে হয়নি।
“তবে জিয়াউর রহমানের উত্তরাধিকারী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ১৬ মার্চ দিনাজপুর থেকে ঐতিহাসিক খাল খনন কর্মসূচি শুরু হতে যাচ্ছে।”

স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশে নৌপথের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২৪ হাজার কিলোমিটার। পলি ও বালিতে ভরাট হয়ে বর্তমানে নৌপথ কমে হয়েছে চার হাজার কিলোমিটার।
বাংলাদেশ নদী রক্ষা কমিশনের ২০২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বিআইডব্লিউটিএ-এর তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, দেশে বর্ষা মৌসুমে যেখানে নৌপথ থাকে প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার, শুষ্ক মৌসুমে নৌপথ এসে দাঁড়ায় মাত্র ৪ হাজার ৩৪৭ কিলোমিটারে।
২০২১-২০২২ অর্থ বছরের মেইনট্যানেন্স ড্রেজিং এর আওতায় ২২৬.৬৭ লক্ষ ঘনমিটার পরিমাণ মাটি খনন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জিয়াউর রহমানের আগে শেরেবাংলা একে ফজলুল হক এমন উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
গত বছর অন্তবর্তী সরকারের সময়ে ৩০ হাজার খাল উদ্ধারে পানি সম্পদ মন্ত্রণায়ের একটি প্রকল্প এখনও চালু রয়েছে।
বিএনপির খাল খনন, পুনঃখনন বিষয়ে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, “আমি বিএনপির এই প্রকল্পকে স্বাগত জানাই। কিন্তু আমাদেরকে দূষণ বন্ধ করতে হবে, দূষণের উৎস বন্ধ করতে হবে। নদীপথের উপযোগিতা বাড়াতে হবে।”
মনজুর আহমেদের ভাষ্য, দেশে নদ, নদী, খাল, বিল ধ্বংসের অন্যতম কারণ দখল। আর রাজনৈতিক ও ক্ষমতাশালীরা এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত।
নদ-নদী, খাল, বিলের আইনি অভিভাবক জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ২০১৮ সালে ৪৮ জেলার অবৈধ দখলদারদের তালিকা প্রণয়ন করে।
কমিশনের ২০২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, খুলনা বিভাগে ৪ হাজার ৯৬৫, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩ হাজার ২৬০, ঢাকা বিভাগে ৮ হাজার ১৪৫, বরিশাল বিভাগে ২ হাজার ৪৪৬, ময়মনসিংহ বিভাগে ৩ হাজার ৬৪৩, রংপুর বিভাগে ১ হাজার ৩৩০, রাজশাহী বিভাগে ৩ হাজার ১১৫ এবং সিলেট বিভাগে ১ হাজার ৮৮৬ জন অবৈধ দখলদার রয়েছে। প্রত্যেক বিভাগেই উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে কমিশন।
ওই বছর পর্যন্ত সারাদেশে নদী, খাল, বিল দখল নিয়ে জাতীয় নদী কমিশনকে পক্ষভুক্ত করে মামলা হয়েছে ১৩২টি। হাই কোর্ট বিভাগে ৯৬টি, আপিল বিভাগে চারটি এবং স্থানীয় আদালতে ৩২টি মামলা তখন চলমান ছিল।

মামলা, উচ্ছেদের পরও ২০২২ সালে ২৮ হাজারের বেশি অবৈধ দখলদার থাকার একটি হিসাব দিয়েছিল কমিশন।
ওই সময় নদী কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দখলদারদের তালিকা প্রণয়ন অনেক কঠিন কাজ। আমি নিজে দায়িত্বে থাকতেও অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি, সুপারিশ করেছি ব্যবস্থা নেওয়ার। কিন্তু ব্যবস্থা হয় অপ্রতুল।”
২০২৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ‘বাংলাদেশের নদ-নদী: সংজ্ঞা ও সংখ্যাবিষয়ক সেমিনার’-এ জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন জানায়, দেশে নদ-নদীর সংখ্যা ১ হাজার ৮টি।
গত বছর অন্তবর্তী সরকারের সময় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বাংলাদেশের নদ-নদীর খসড়া তালিকা-২০২৫ এ বলা হয়েছে, দেশে এক হাজার ২৯৪টি নদ-নদী রয়েছে।
২০২৪ সালের ২৬ মে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), ওয়াটার রাইটস ফোরাম, রিভারাইন পিপল, বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের যৌথ সম্মেলনে বলা হয়, প্রাথমিক তালিকা অনুযায়ী, দেশের ২২৯টি নদী সংকটাপন্ন অবস্থায় পৌঁছে গেছে।
সংখ্যার দিক থেকে রংপুর বিভাগে ৪৩টি, সিলেটের ৪২টি, খুলনায় ৩৭টি, বরিশালে ৩০টি, ঢাকায় ২৮টি, রাজশাহীতে ১৯টি, চট্টগ্রামে ১৭টি ও ময়মনসিংহে ১৩টি নদী সংকটাপন্ন।
নদী কমিশনের ২০২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু জেলা বাদে সারাদেশে ৪ হাজার ১৮টি খাল চিহ্নিত করা হয়েছিল।
২০১৩ সালের পানি আইনে বলা হয়েছে পানির অন্তঃপ্রবাহ বা বহিঃপ্রবাহের পথ হল খাল।
নদী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “খাল বা নদী কেবল পুনঃখনন করলেই হবে না। রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। ব্রিজের পরিধি/দৈর্ঘ্য বড় করতে হবে “
তিনি বলেন, ‘খাল খনন করে গাছ গাছালি লাগাতে হবে। তবে খাল খননে ড্রেজারের বাইরে লোকবল নিয়োগের বিষয়টি এখন বিশৃঙ্খলতা সৃষ্টি করতে পারে। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের অভিসন্ধি থাকতে পারে। এসব মোকাবিলা করা সরকারের চ্যালেঞ্জ হবে।”

বড় নদীগুলো পানি উন্নয়ন বোর্ড খনন করলেও ছোট নদীগুলো সংস্কারের আওতায় নেই। তাই ছোট নদীগুলোকে সংস্কারের মধ্যে রাখতে বলছেন মনজুর আহমেদ।
তার পরামর্শ, “কচুরিপানা মুক্ত করতে হবে সকল জলাধারকে। বড় নদীর পাশাপাশি ছোট নদীগুলোকে পরিবহন পথ হিসেবে তৈরি করতে হবে। তাহলে স্থলপথ, রেলপথের চেয়েও কম খরচ হবে। খাল খননের পর গাছ লাগাতে হবে। নদীমাতৃক খেলাধুলাকেও রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে, আয়োজন করতে হবে “
এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমরা কিন্তু প্রকল্প শুরু করার বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করছি। খাল হলে ভালো কী হবে বলেছি। অনেকে আছে জায়গা দখল করেছিল, অনেকে ছেড়ে দিচ্ছে।
“মাছ চাষ করা যাবে; কিছু জায়গায় হাঁস প্রতিপালন করা সম্ভব হবে, সেটা আমরা বলছি।”
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমরা ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণের কর্মসূচি নিয়েছি। খাল খননের পর বৃক্ষ রোপণ করা হবে। তবে ধানক্ষেতের পাশে গাছ লাগানো নিয়ে কৃষকদের আপত্তি থাকে। এ বিষয়টিও খেয়াল রাখতে হবে।”
বিএনপির কেন্দ্রীয় একজন নেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, খাল খনন কর্মসূচির তিনটি দিক রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
“একটি হচ্ছে, বাংলাদেশ ভাটির দেশ, উজান থেকে পলি আসে। পলি এসে নিয়মিত আমাদের নদী, খাল ভরাট হয়, পলি জমে। এজন্য খনন কার্যক্রম জরুরি।
“দ্বিতীয়ত, পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা। এবং তৃতীয়ত, জিয়াউর রহমানের এই কর্মসূচির প্রতি মানুষের গ্রহণযোগ্যতা থাকায় তার ভাবমূর্তিকে কাজে লাগানো। নিজের প্রতি আস্থা সৃষ্টি করতে চান প্রধানমন্ত্রী।”
এ প্রকল্পের মাধ্যমে পানি অপসারণ ও ধরে রাখার পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে চায় সরকার। তবে কতটা বাস্তবায়ন হবে, তা ‘প্রশ্নসাপেক্ষ’ বলে মনে করছেন ওই বিএনপি নেতা।
চাঁদপুর জেলার একজন নেতা বলেন, “প্রকল্পটি মূলত দলীয় নেতাকর্মীদের তৃণমূল স্তরে ন্যূনতম কর্মসংস্থানের একটি সুযোগ। কিন্তু ঠিকাদার, স্থানীয় চাঁদাবাজি, দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তাদের কারণে এর রেজাল্ট জনগণের কাছে কতটা পৌঁছাবে, তা এখনই বলার সুযোগ নেই।”