দর কষাকষিতে ছাপাখানা, শঙ্কায় প্রাথমিকের বই

কাগজের দাম বেড়ে যাওয়ায় ছাড় চান ছাপাখানা ব্যবসায়ীরা।

কাজী নাফিয়া রহমানবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 11 Nov 2022, 07:54 PM
Updated : 11 Nov 2022, 07:54 PM

হাতে সময় আছে দুই মাসেরও কম, এর মধ্যেই প্রাথমিকের ১৪ লাখ পাঠ্যবই ছাপাতে হবে ঢাকার সূত্রাপুরের নুরুল ইসলাম প্রিন্টিং প্রেসের কর্মীদের। কিন্তু সেই কাজ তারা এখনও শুরুই করতে পারেননি; কারণ কাগজের দাম বাড়তি। 

এই প্রেসের মত অনেক ছাপাখানাই বই ছাপানোর কাজে হাত দেয়নি। মাধ্যমিকের বই ছাপানোর কাছে কিছুটা গতি থাকলেও প্রাথমিকের কাজ অনেক জায়গায় শুরুই হয়নি।

সরকারের সঙ্গে দর কষাকষিতে থাকা মুদ্রণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, লোকসান ঠেকাতে তারা কাগজ আমদানিতে শুল্ক ছাড় চান। তা না হলে পাঠ্যবইয়ের গুণগত মানে ছাড় দিতে হবে। কাজ ফিরিয়ে দেওয়ার কথাও কেউ কেউ বলছেন। 

শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি তাদের জোর আশ্বাস দিয়ে গেলেও বই ছাপার কাজ যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে নতুন বছরের প্রথম দিন প্রাথমিকের সব পাঠ্যবই পাওয়ার সুযোগ কমে আসছে বলে মনে করছেন এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফরহাদুল ইসলামও। তবে মাধ্যমিকের বিষয়ে তিনি আশাবাদী। 

আসছে বছর প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ৩৫ কোটি পাঠ্যবই বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে। ডিসেম্বরের মধ্যে এর কত শতাংশ বই প্রস্তুত করে উপজেলা পর্যন্ত পাঠানো যাবে, তা নিয়েই এখন হিসাবনিকাশ চলছে। 

কর্মকর্তারা বলছেন, সবমিলিয়ে আংশিক বই বিতরণের মাধ্যমেই হয়ত বছর শুরু করতে হবে তাদের। 

কোভিড মহামারী এবং দরপত্র জটিলতায় গত দুই বছর ধরেই বছরের প্রথম দিন সব পাঠ্যবই দিতে পারছে না সরকার। শেষ সময়ে দরপত্র দেওয়ায় চলতি বছরও সব বই পেতে অনেক শিক্ষার্থীকে মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। ৩০ হাজার বইয়ের শেষ লটটি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড- এনসিটিবি বুঝে পায় এপ্রিলে। 

এবারও সেই চক্র ভাঙা যায়নি। ২০১০ সাল থেকে বছরের প্রথমদিন বই দেওয়ার যে দৃষ্টান্ত আওয়ামী লীগ সরকার দেখিয়ে আসছে, তা আরেকবার হোঁচট খাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। 

বই ছাপতে লাগে কাগজ 

বছরের শেষ প্রান্তে এসে সরকার যখন তড়িঘড়ি কাজ আদায়ের চেষ্টা করছে, তখন ছাপাখানা মালিকরা শোনাচ্ছেন সমস্যার কথা। 

সরকারি দরের চেয়েও কম টাকায় কাজ নেওয়ার পর এখন তারা কাগজে শুল্ক ছাড়ের দাবি করছেন। তাতে ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায় বইয়ের গুণগত মানে ছাড় চাইছেন। 

সময়মত বই দেওয়ার ক্ষেত্রে দেরিতে কাজ পাওয়া, ইউক্রেইন যুদ্ধের কারণে কাগজের দাম বেড়ে যাওয়া, বিদ্যুৎ বিভ্রাটসহ নানা চ্যালেঞ্জের কথা বলছেন মুদ্রণ ব্যবসায়ীরা। 

পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, কবে নাগাদ বই ছাপানো শেষ হতে পারে; সে প্রশ্নে কথা বলতে রাজি হননি অনেক ব্যবসায়ী। 

নুরুল ইসলাম প্রিন্টিংয়ের মালিক পারভেজ আহমেদ বলেন, টেন্ডারের সময় কাগজের যে দাম ছিল, তার চেয়ে এখন প্রতি টন কাগজে ২৫-৩০ হাজার টাকা বেড়েছে। 

“প্রাথমিকের প্রথম, দ্বিতীয় শ্রেণির ওয়ার্ক অর্ডার পেয়েছি বুধবার বিকালে। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির পেয়েছি আরও কয়েকদিন আগে। আমাদের কোনো প্রিন্টার্সই কাজ শুরু করতে পারেনি। একেক টন কাগজে যদি ৩০ হাজার টাকা লোকসান হয়, একেকটা প্রিন্টার্স যদি ২০০ টন কাজ পায়; তাহলে কীভাবে সম্ভব?” 

তবে ১৫ অক্টোবর থেকে মাধ্যমিকের কাজ শুরু করে অনেকটা এগিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “ছোট ছোট কিছু দাবি করছি। এনসিটিবি নমনীয় আছে, মন্ত্রণালয়ে কথাবার্তা চলছে। মন্ত্রণালয় মেনে নিলেই আমরা কাজটা শুরু করে শেষ করে দেব। 

“ধরেন, এনসিটিবি কয়েকটা কাগজের ব্র্যান্ড আমাদের বাছাই করে দিল, কিন্তু তাদের রেট অনেক বেশি। আবার কোনো প্রতিষ্ঠান আছে, যেগুলো অনেক লাভ না করে কম দামে কাগজটা দেবে। আমরা তাদের কাছ থেকে কাগজ নিতে চাইছি। সেগুলো যদি আমাদের অনুমোদন দেয়, তাহলে আমরা একটু কম লোকসানে পড়ব।” 

চট্টগ্রামের সাগরিকা প্রিন্টিং প্রেস এবার প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ৫০ লাখ বইয়ের কাজ পেয়েছে। প্রেসের মালিক গিয়াসউদ্দিন বলছেন, তারা যখন টেন্ডার দিয়েছেন, তখন ডলারের রেট ছিল ৯০ টাকা। এখন ১০৭ টাকার বেশি। 

“তাছাড়া এখন দেশে পাল্প পাওয়া যাচ্ছে না, আমদানিও করা যাচ্ছে না। এখন আমরা চিন্তা করতেছি কাজ করব না। কারণ কাজ করলে অনেক লস হবে।” 

যদি বই ছাপতেই হয়, তাহলে গুণমানে ছাড় চেয়ে এই ব্যবসায়ী বলেন, “যেই কাগজে পাঠ্যবই ছাপাতে হবে সেগুলোর প্রতি টনের দাম এখন এক লাখ ৩০-৩৫ হাজার টাকা। আমরা এনসিটিবিকে বলেছি- দেশে যে কাগজ পাচ্ছি তাতে শর্তে যা উল্লেখ করা তার চেয়ে ব্রাইটনেস কম। এতে বাচ্চাদের বইয়ে কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু শর্তে সেটা দেয়া। আমরা চাচ্ছি এনসিটিবি এই শর্তটা কিছুটা শিথিল করুক, তাহলে আমরা সময়মত বই দিতে পারব।” 

প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বইয়ের কাজ পাওয়া ঢাকার আরামবাগের আনন্দ প্রিন্টার্সের স্বত্ত্বাধিকারী রব্বানী জব্বার বলছেন, গত বছরের প্রাথমিকের কাজের ২০ শতাংশ টাকা তারা এখনও পাননি। সে কারণে প্রাথমিকের বইয়ের কাজ করতে পারবেন না জানিয়ে এনসিটিবিকে চিঠি দিয়েছেন। 

এই ব্যবসায়ীর দাবি, ছয় মাসের ওয়ারেন্টি সময়ের পর তার বইয়ে ত্রুটি থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। 

“আমি আমার অবস্থান তুলে ধরেছি, কিন্তু চিঠির কোনো উত্তরও পাইনি। আমি ঋণখেলাপী হয়ে আছি। সে কারণে এনসিটিবিকে বলেছি, ব্যাংক সাপোর্ট না করলে ব্যক্তিগতভাবে আমার পক্ষে এ কাজ সম্ভব না। আমি এনসিটিবিকে সময়মত জানিয়েছি, যেন অন্য কাউকে দিয়ে প্রাথমিকের কাজটা করিয়ে নিতে পারে।” 

তবে এনসিটিবি একটু ‘নরম হলে’ সরকারের নির্ধারিত মান অনুযায়ী সময়মতই মাধ্যমিকের বইয়ের কাজ শেষ করার আশা করছেন রব্বানী জব্বার। 

“কাগজ, কাঁচামালের সংকট রয়েছে। আমাদের দিক থেকে প্রস্তাব ছিল, যেহেতু স্থানীয় কাগজকলগুলো সহযোগিতা করতে পারছে না, তাই বোর্ডের কাজটুকুর জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাগজ আমদানির সুযোগ দিলে ভালো হত। তাহলে বই ছাপানোর ঝামেলা হত না। এই প্রস্তাব আমরা আরও দেড়-দুই মাস আগেই দিয়েছি।” 

মাধ্যমিকের ৪০ লাখ বইয়ের কাজ পাওয়া ঢাকার মাতুয়াইলের ফারাজী প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনসের মালিক শাহজাহান ফারাজী জানান, গত ১১ দিনে তিনি ৮ লাখ বইয়ের কাজ শেষ করেছেন। 

কাগজের পাশাপাশি বিদ্যুতের সমস্যার কথা সামনে এনে তিনি বলেন, “অনেক সমস্যা আছে, তারপরও আমরা চেষ্টা করছি। এখন লোডশেডিং কিছুটা কমেছে। এটা আবার বাড়লে ঝামেলা হবে। লোডশেডিংয়ে কাগজ নষ্ট হয় অনেক বেশি। জেনারেটরে অনেক খরচ হয়। আবার গ্লুও বেশি লাগে। 

“লাভ বা লোকসান যাই হোক, পহেলা জানুয়ারিতে শতভাগ না হলেও ৮০ ভাগ বই দিতে পারব। আর শুধু আমি দিতে পারলে তো হবে না, সবাই দিতে পারবে কিনা সেটাই তো বিষয়।” 

এনসিটিবি যা বলছে 

সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলে বছরের প্রথমদিনই পাঠ্যবই পাওয়ার আশ্বাস দিয়ে আসছেন শিক্ষামন্ত্রী। তবে বাস্তবতা যে ভিন্ন, তা ধরা পড়ছে বই তদারকির সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্যে। 

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফরহাদুল ইসলাম বলছেন, তারা এখন ডিসেম্বরের মধ্যে বেশির ভাগ বই পাওয়ার আশা করছেন, যা পহেলা জানুয়ারির জন্য দেওয়া যাবে। 

“পহেলা জানুয়ারির আগে মাধ্যমিকের সব বই পেয়ে যাব। প্রাথমিকেও আমি আশাবাদী। যদি সবাই নাও পায়, ১৫ জানুয়ারির মধ্যে পেয়ে যাবে।” 

এর পেছনে নানামুখী সংকটের কথা তুলে ধরে ফরহাদুল ইসলাম বলেন, “বিদ্যুৎ ও কাগজের সংকট আছে। এবার দেশে ভার্জিন পাল্প আমদানি হয় নাই। পাল্পের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় কাগজকল মালিকরা কাগজ আমদানি করে নাই। 

“পাল্প আমদানি করতে না পারলেও দেশে সেকেন্ডারি পাল্প আছে। কিন্তু যে ব্রাইটনেস আমরা চাচ্ছি, সেজন্য ভার্জিন পাল্প লাগে। সেটা আনতে গেলে তারা অত্যধিক দাম চাচ্ছে। আমরা ব্রাইটনেসে যেন ছাড় দেই, সেটা চাচ্ছে পুস্তক মুদ্রণকারীরা। কাগজে ছাড় চাচ্ছে।" 

তবে শুল্কমুক্ত কাগজ আমদানির যে দাবি ব্যবসায়ীরা করছেন, তাতে অনেক অসুবিধা দেখছেন অধ্যাপক ফরহাদ। 

“পেপারমিলগুলোকেও তো বাঁচিয়ে রাখতে হবে সরকারকে। শুল্কমুক্ত কাগজ আমদানি করতে দিলে পেপারমিলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শুল্কমুক্ত কাগজ আনতেও মাসখানেক সময় লেগে যাবে।” 

গত বছরের অভিজ্ঞতার পর এবারও কেন দেরিতে দরপত্র দেওয়া হল প্রশ্ন করলে এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, “প্রাথমিকের বই দেশের বাইরে মুদ্রণ করা হবে নাকি দেশে থাকবে, এই সিদ্ধান্ত নিতে দুই মাস অতিবাহিত হয়েছে। আর এগুলোর সুযোগ নিয়ে ছাপাখানার মালিকরাও কিছু সুবিধা চাইছেন আমাদের কাছে।” 

জটিলতা এড়াতে আগামী বছর জানুয়ারিতেই বইয়ের টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানান তিনি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক