Published : 09 Aug 2025, 01:53 AM
আড়াইশ বছর আগে যাদের হাত ধরে পটুয়াখালী আর বরগুনার সাগর ঘেঁষে জনপদ গড়ে ওঠে, সেই রাখাইনরাই কোণঠাসা হয়ে এখন ‘পরবাসী’ হয়ে পড়েছেন।
তাদের জীবিকার প্রধান উৎস কৃষি জমি গেছে বহু আগেই; এখন বাড়ির পাশের শ্মশান, পুকুর আর প্রার্থনাস্থল-বৌদ্ধবিহারের জমিও যায়-যায়।
গত ২৯ জুন থেকে ৩১ জুন ওই এলাকায় সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে রাখাইনদের ব্যবহার করা খাসজমি কোথাও বেহাত হয়েছে দখলদারদের হাতে। কোথাও তাদের কাছ থেকে দুই শতক জমি কিনে ভোগ-দখল করছে চার শতক। কোথাও আবার কোনো রাখঢাক ছাড়াই বেড়া দিয়ে নেওয়া হয়েছে দখল।
রাখাইনরা বলছেন, প্রায় আড়াইশ বছর আগে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী, কলাপাড়া এবং বরগুনার তালতলী এলাকায় আবাস গড়ে তোলেন তাদের পূর্বপুরুষরা। শ্বাপদসংকুল আর দুর্যোগপ্রবণ এই অঞ্চলকে তারা চাষবাসের উপযোগী করে তোলেন।
১৯০০ সালের দিকে রাখাইন সম্প্রদায়ের ৫০ হাজার মানুষ থাকলেও বড় অংশ মারা যায় ১৯৬৫ সালের বন্যায়। এখন কোনো রকমভাবে টিকে আছেন আড়াই হাজার জনের মত।
বর্তমানে তাদের চাষের জমি নেই বললেই চলে; ভিটে টেকানোও কঠিন হয়ে পড়ছে।

গোড়াপত্তনের ২০০ বছর পর দখলবাজির শিকার
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের বৃহত্তম বরিশাল অঞ্চলের সভাপতি মং চো থিন তালুকদার জানান, ১৭৮৪ সালের দিকে সাগরপাড়ি দিয়ে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী এলাকায় আসেন রাখাইনরা। তারা সমুদ্রগামী পালতোলা নৌকা নিয়ে পটুয়াখালী ও বরগুনা উপকূলে আসেন, সম্প্রতি সেই নৌকাগুলোর একটির সন্ধান মেলে কুয়াকাটার হুইচ্যানপাড়ায়।
মাটি খুঁড়ে বের করা সেই নৌকা ২০১২ সালে সংরক্ষণ করা হয় কুয়াকাটা পৌরসভার বৌদ্ধবিহার ও রাখাইন মহিলা মার্কেটের কাছে।
এ অঞ্চলে রাখাইনরাই প্রথম জনপদ গড়েছিল জানিয়ে মং চো থিন তালুকদার বলেন, “পটুয়াখালী, বরগুনা ও কক্সবাজার অঞ্চলের আদি নামও ছিল রাখাইন ভাষায়, যেমন আজকের কুয়াকাটার আদি নাম ছিল ‘কানছাই চোয়ান’।”
এই জনপদে রাখাইনদের ভূমিতে দখলদারত্বের ইতিহাস খুব পুরনো নয়।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কারিতাসের কর্মকর্তা মং ম্যা বলেন, “রাখাইনদের ভূমি দখলের বিষয়টা খুবই সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয় ১৯৯০ এর দশকে, যখন কুয়াকাটাসহ পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার পর্যটন সম্ভাবনা বাড়তে থাকে অনেক গুণ।”
কারিতাসের ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (আইডিপিডিসি) এ কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পটির মাধ্যমে ২০০৭ সাল থেকে তারা রাখাইনদের শিক্ষা, ভূমি ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিয়ে কাজ করে আসছেন।
কারিতাসের হিসাব অনুযায়ী, পটুয়াখালী ও বরগুনায় এখন ৪০টি রাখাইন পল্লি রয়েছে। এসব পল্লিতে শ্মশান আছে ২২টি। আরো কিছু শ্মশান আগে থাকলেও কোনোটি পুরোপুরি, আবার কোনোটি আংশিকভাবে দখল হয়ে গেছে। বর্তমানে ১২টি গ্রামে কোনো শ্মশান নেই; আর ২০টিতে কেবল মন্দির রয়েছে।

‘হুমকির’ মুখে আড়াইশ বছরের পুরনো বিহার
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত ঘেঁষে হোটেল সি কুইনের ঠিক উল্টো দিকে রাখাইনদের আড়াইশ বছর পুরনো কুয়াকাটা শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহারের অবস্থান। চারদিক থেকে কমতে-কমতে প্রায় আড়াই একরের (২৫০ শতক) এই বিহার এখন দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬৫ শতাংশে।
বিহারের অধ্যক্ষ ইন্দ্রবংশ থের বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানালেন, ১৭৮৪ সালের দিকে এই বিহারটি প্রথম ছনের ছাউনি দিয়ে তৈরি করা হয়। ১৯৫১ সালে এটির কাগজপত্র হয়। আর ২০০৩ সালে এখানে পাকা স্থাপনা করা হয়।
তিনি বলেন, “আরএস জরিপের কাগজ অনুযায়ী, বিহারের নামে দুই একর ৪৪ শতাংশ জায়গা আছে। কিন্তু কুয়াকাটার মূল সড়ক নির্মাণের জন্য প্রায় এক একর জায়গা সরকার নিয়ে নেয়। জনস্বার্থে ব্যবহৃত এই জায়গা আর আমরা চাই না।
“কিন্তু আমাদের দাবি- বাকি যে জায়গাগুলো রয়েছে, সে জায়গাগুলো যেন আমরা ফিরে পাই। দেখা যাচ্ছে, আমাদের বর্তমান বিহার ৬৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যেও ৬৫ ফুট জায়গা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) দাবি করছে। ১৭ বছর ধরে এই সংক্রান্ত মামলা চলমান রয়েছে। হাই কোর্টের স্থগিতাদেশ রয়েছে এ বিষয়ে।”
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এ বিষয়টি আমি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানিয়েছি। ওরা দেখে জানানোর পর আমি ব্যবস্থা নেব।”
বিহারের অধ্যক্ষ ইন্দ্রবংশ থের’র ভাষ্য, “বিহারের ঠিক মুখেই বৌদ্ধদের একটি জাদি (বুদ্ধের অবশিষ্টাংশ দেহের অংশ বিবেচনায় স্তূপ নির্মাণ স্থাপনা বিশেষ) ছিল, বিশাল বটগাছ ঘেঁষে। বর্তমানে সেটিও নষ্ট হয়ে গেছে। সেটাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা বা পুনরায় সংস্কার করার সে সুযোগও তারা আমাদের দেয়নি।
“মামলার কোনো অগ্রগতিও নেই। রায় পেলেও পাউবো আবারও আপিল করে সেটি আটকে দেয়।”
তিনি বলেন, “এ বিহার ঘেঁষে রাখাইনদের এ দেশে আসার একটি স্মৃতি নৌকা প্রদর্শনীর জন্য সংরক্ষণ করেছে প্রত্নতত্ন অধিদপ্তর। ওটাও বৌদ্ধ বিহারের জায়গা। বিহারের ঠিক পাশেই রাখাইন মহিলা মার্কেটও বিহারের জায়গায়।”

দখল হচ্ছে শ্মশানও
বরগুনার তালতলীর সোনাকাটা ইউনিয়নের লাউপাড়া গ্রামের ভেতর দিয়েই বয়ে গেছে নিদ্রারখাল। তার কোলঘেঁষে কয়েক পুরুষ ধরে বসবাস করা রাখাইনদের একটি পল্লি রয়েছে। সেই পল্লি ঘেঁষেই যুগ যুগ ধরে রয়েছে রাখাইনদের শ্মশান।
২০২৩ সালে সেই শ্মশানের সামনের অংশের মাঝখানে সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘর নির্মাণ করা হয়। সোয়া দুই কাঠার সেই ঘর একজনের নামে বরাদ্দ দেওয়া হলেও সরেজমিনে দেখা গেছে, ছয় কাঠা জমি ভোগ দখল করছেন বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তি।
শ্মশানের আশপাশে পতিত জমি খালি পড়ে থাকলেও ঘরটি বানানো হয়েছে শ্মশানের জায়গায়। এভাবে দখল হতে হতে দেড় একরের (১৫০ শতক) শ্মশানটির পরিমাণ নেমেছে মাত্র ৬০ শতাংশে।
রাখাইনদের প্রত্যেক পাড়ার একজন মাতবর থাকেন। লাউপাড়ার মাতবর চিং তেন মং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই পাড়ার কয়েকজন জায়গাজমি সংক্রান্ত মামলা চালাতে না পেরে নিঃস্ব হয়ে মিয়ানমারে চলে গেছেন। আমাদের শ্মশানে যাওয়ার রাস্তাটাও দখল হয়ে গেছে।
“এখানে যখন ঘরের জন্য দখলদাররা মাটি খোঁড়া শুরু করে, তখনও লাশের হাড়গোড় পাওয়া গেছে।”
কে এই জমি আশ্রয়ণের ঘরের জন্য বরাদ্দ দিয়েছে জানতে চাইলে তিনি বললেন, “তখনকার ইউএনও।”
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, তখন তালতলীর ইউএনও ছিলেন এস এম সাদিক তানভীর। তিনি বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে ভৌত পরিকল্পনা, পানি সরবরাহ ও গৃহায়ন উইংয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রধান হিসেবে কর্মরত।
তার বক্তব্য জানতে মোবাইলে কয়েক দফা যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, যাকে আশ্রয়ণের ঘরটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেই ব্যক্তির নাম আবু সোলাইমান। তিনি আবার সৌদি প্রবাসী। কয়েক বছর ধরেই তিনি সেখানে আছেন। আগে পেশায় ছিলেন মসজিদের ইমাম।
এখন ঘরটিতে থাকেন সোলাইমানের ভাগনে দাবি করা নাইমুর রহমান নামের একজন। তিনি দাবি করলেন, ঘরের সঙ্গে পাশের তিন শতক জমিও বরাদ্দ পেয়েছেন।
কীভাবে তার মামা ঘরটি বরাদ্দ পেয়েছেন আর তিনিই কীভাবে সেই ঘরের ‘মালিক’ হলেন? উত্তর দিতে গিয়ে নাইমুর দায় দিলেন স্থানীয় প্রশাসনকে।
তার ভাষ্যে, “আমি এখানে উঠেছি একবছর আগে। এর আগে খালিই ছিল। কীভাবে মামা বরাদ্দ পেলেন, কোন সংস্থা বরাদ্দ দিল- আমি জানি না।
“আমি জানি ইমাম সাবদের জন্য বরাদ্দের ঘর এটা৷ মামা এখন সৌদি থাকে, তখন দরিদ্র ছিলেন।”
সোয়া দুই কাঠা বরাদ্দ পেলেও ছয় কাঠার বেশি কীভাবে ভোগ করছেন, সে প্রশ্নের জবাবে নাইমুর বললেন, “এখন এটা আসলে আমি বলতে পারব না। এটা যে দিছে, এটা তো সরকারি বরাদ্দের ঘর। তখন যাচাই-বাছাই ছাড়া দিল কেন?

“আমি দরিদ্র, আমার একটা জিনিস প্রয়োজন। আমি দাবি করতে পারি। কিন্তু যে দিবে সে যাচাই-বাছাই করবে। তারা না করলে সেটার কৈফিয়ত তো আমি দিব না।”
জানতে চাইলে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ফরাজী মো. ইউনুচ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। এ ঘর দিয়েছে মুজিববর্ষে, আমার আগের চেয়ারম্যান। আমার কাছে কেউ কোনো অভিযোগ নিয়ে আসে নাই।”
এই পাড়ার সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ মং থং উ ৯১ বছর বয়সী। বয়সের ভারে ন্যুব্জ্য মানুষটি বললেন, যা যাওয়ার তা তো গেছেই। শ্মশানের নামে জায়গাটা যেন সরকার বরাদ্দ দেয়।
অন্য পল্লিতেও একই দৃশ্য
রাখাইনদের জমি-জিরাতের পাশাপাশি শ্মশান দখলও সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে দক্ষিণের দুই জেলায়। তালতলীর ছোটবগী ইউনিয়নের ঠাকুরপাড়া এলাকায় রাখাইনদের আরেকটি শ্মশানও দখলের অভিযোগ উঠেছে।
পাড়ার বাসিন্দা অং তেন রাখাইন বলেন, “নথিতে ৭৪ শতাংশের এই বিশাল শ্মশান এখন এসে ঠেকেছে ১৫ শতাংশে। বলতে গেলে পুরো শ্মশানই বেহাত হয়েছে। মাটি কেটে কেটে এক-দুই হাত করে প্রত্যেক বছর দখল নেয় তারা।”
খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, শ্মশান সংলগ্ন বাড়ি, পুকুর দুলাল মৃধা নামে একজনের।
জানতে চাইলে তিনি বলেন, “১৯৫৫ সালে আমার দাদা এই জমি কিনে গেছেন। ২০১০ সালে আমি এখানে বাড়ি করেছি।”
এত বছর অন্য জায়গায় কেন ছিলেন, সে প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি। কিছুক্ষণ পর বললেন, এই জায়গা অদলবদল করে তিনি পেয়েছেন। দুলাল বললেন, মেপে যদি রাখাইনদের জমি বের হয়, তাহলে তা তিনি দিয়ে দেবেন।
দুলাল মৃধার পাশের বাসিন্দার নাম নুরুল ইসলাম। তার বিরুদ্ধেও দখলের অভিযোগ রয়েছে।
তবে দখল নিয়ে নুরুলের ছেলে হাবিবুর রহমান দুষলেন দুলাল মৃধাকে। বললেন, “আমরা মোটেও করিনি, দখল করেছেন দুলাল মৃধা। ভালো করে খুঁজলে তিনি দলিল দেখাতে পারবেন না।”
খানিক বাদে পাশে ডেকে দুলাল মৃধা বললেন, “দখল আসলে করেছেন হাবিবুর রহমানরা। তাদের কোনো দলিল নেই।”
ঠাকুরপাড়া রাখাইন পল্লির মাতবর ৭৩ বছর বয়সী মং চো ওয়েন বলেন, “প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে এগুলো দখল হয়ে গেছে।”
কোনো অভিযোগ করেছেন কি না, এ প্রশ্ন করা হলে অসহায়ত্ব প্রকাশ করে তিনি বললেন, “কার কাছে করব অভিযোগ? অবহেলিত আমরা।”
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, দুলাল ও নুরুলের বাবা অন্য জায়গা থেকে এসে এখানে বসতি গড়ে তোলেন। রাখাইনদের কিছু না থাকলেও দুলাল হয়েছেন পুকুর, বাড়ি আর ধানী জমির মালিক।
দুলাল মৃধা বলেন, “এই পুকুর, রাস্তাসহ পুরোটাই আমার। শুধু শ্মশানের যে অংশটুকু আছে, সেটাই রাখাইনদের। ১৯৫৫ সালে আমার দাদা এগুলো বার্মিজদের থেকে কিনেছে।
“২০১০ সালে আমি এখানে বাড়ি করেছি। আগে আমরা ঠাকুরপাড়া ওয়াপদার সঙ্গে ছিলাম। আমি যখন বাড়ি করি, তখন অন্যজন এখানে দখলে ছিল। শ্মশানের সম্পত্তি নিয়ে আমার কোনো লোভ নেই।”
হাবিবুর বলেন, “এগুলা সব বার্মিজদের জায়গা ছিল। পরে তো জোর যার, মুল্লুক তার। আমরা মোটেও দখল করিনি। দুলালরাই দখল করেছে। ৭০-৮০ বছর বয়সে আমার দাদা সাদেম আলী ফকির এই জায়গা কিনেছে। আমরা ছিলাম বরগুনার গিলাতলীতে।”

আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “কীভাবে এখানে এসেছি, আমি জানি না। আমার দাদা কিনেছে। কীভাবে কিনেছে, আমি জানি না। এখানে গুঞ্জর আলী হাওলাদার নামে এক লোক দখলে ছিল। তিনি তিনবার টাকা নিয়ে আমার দাদাকে দলিল দেয় নাই। পরে মৃত্যুর সময় ৫ কড়া জায়গার দলিল দিয়ে গেছে।”
তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে সালমা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কিছুদিন আগে তালতলীপাড়া শ্মশান নিয়ে এরকম অভিযোগ আসার পর আমি নিজে ঘটনাস্থলে গিয়ে জেলা পরিষদের সাথে কথা বলে ব্যবস্থা নিয়েছি।
“লাউপাড়া এবং ঠাকুরপাড়া নিয়ে কোনো লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ এখনো পাইনি। অভিযোগ না হোক, আমি অবহিত হলেও এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেব।”

সবখানে একই চিত্র
বরগুনার পর পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কালাচান পাড়াতে গিয়েও দখলের অভিযোগ পাওয়া গেল। খাপড়াভাঙ্গা নদীর পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই পল্লির শ্মশানের জমি দখলের পাশাপাশি শ্মশানের মাঝখান থেকে মাটি লুটের অভিযোগ করলেন বাসিন্দারা। প্রায় ৫০ শতাংশের এই শ্মশানের অবশিষ্ট আছে অল্পই।
পাড়ার মাতবর অং চো ছান তালুকদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “১৯৫৬ সালে এই শ্মশান স্থাপিত হয়। সরকারের খাস জমিটা আমরা এত বছর ধরে ব্যবহার করে আসছি।
“সেই শ্মশানকে কৌশলে নিজেদের বন্দোবস্ত করে নিয়েছে জালাল মিস্ত্রী নামের একজন। পরে আমরা যখন কবর দিতে আসি, তখনই বিরোধ শুরু হয় তাদের সঙ্গে। আমরা জেলা প্রশাসন বরাবর স্মারকলিপিও দিয়েছি।”
এই শ্মশানের যে অংশের মাটি কাটা হয়েছে, সেখানে নিজের ভাইকে দাফন করার তথ্য দিলেন কালাচানপাড়া উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক মং চ্যা চ্যান।
তিনি বলেন, “২০০২ সালে আমার ভাই মারা যাওয়ার পর এখানে দাফন করেছিলাম। আজ সে কবরের মাটিও দখল হয়ে গেল।”

জানতে চাইলে জালাল মিস্ত্রী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আসলে মাটি কাটিনি। এটা হল সত্য। তার পরেও যদি সাক্ষ্য-প্রমাণে পান, কিছু বলার নেই।”
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বলেন, “কলাপাড়া উপজেলার রাখাইন সম্প্রদায়ের যে নির্ধারিত শ্মশানগুলো রয়েছে, সে শ্মশানগুলো আমরা সংরক্ষণের ইতোমধ্যেই উদ্যোগ নিয়েছি।
“খাসজমিগুলো রাখাইনদের পাড়ার নামে বন্দোবস্ত দেওয়ার জন্য আমরা ইতোমধ্যে আবেদন সংগ্রহ করছি। পরবর্তী কাগজপত্র প্রস্তুতের কাজ চলমান রয়েছে।”
তিনি বলেন, “শ্মশানগুলো অরক্ষিত হওয়ার ফলে আশপাশে অনেকসময় বেদখল হওয়ার উপক্রম হয়। আমাদের কলাপাড়ায় যতগুলো রাখাইন পল্লিসহ শ্মশানসহ যেসব বেদখলীয় জমি রয়েছে, আমরা ইতোমধ্যে একাধিকবার মিটিং করেছি।
“আমরা বলেছি, যেখানেই সমস্যা আছে, আমাদের সঙ্গে আলোচনা করতে। আমরা আমাদের ভূমি অফিসের সহায়তায় সেগুলো উদ্ধারের ব্যবস্থা করছি।”

‘ভূমিদস্যুদের সহায়তায় প্রশাসন’
বরিশাল আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মং থিং জো জানালেন, রাখাইনদের সব শ্মশানেই থাকে দুটি অংশ। শ্মশানকে তারা বলে ‘চানসাই’। ধর্মীয় বিশ্বাসে রাখাইনরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও বাঙালি বৌদ্ধ বা অন্য আদিবাসী বৌদ্ধদের সঙ্গে তাদের রীতিনীতির অনেক পার্থক্য রয়েছে।
রাখাইন রীতি অনুযায়ী শ্মশানের দুটি অংশের একটিতে ‘অতিথিদের’ শেষকৃত্য করা হয়। ঐতিহ্য অনুযায়ী তারাই অতিথি, যারা তাদের গ্রামের বাইরে মারা যান। আর গ্রামে যাদের মৃত্যু হয়, তাদের শেষকৃত্য সম্পাদন করা হয় শ্মশানের অন্য অংশে।
মং থিং জো বলেন, শেষকৃত্যের আগে লাশ এনে রাখা হয় শ্মশানঘাটে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অতিথি শ্মশান তো বটেই, মূল শ্মশান এবং শ্মশানঘাটের জমিও দখল করে নিয়েছে ভূমিদস্যুরা।
“আমরা যে কোনো সময় হামলার শিকার হতে পারি। তাই আমাদের যে ভূমি রয়েছে, সেগুলোর রেকর্ড চাই। যাতে এই ঝামেলাটা আর তৈরি না হয়।”
মং ম্যা কাজ করছেন কারিতাসের তালতলী ও কলাপাড়া উপজেলার ল্যান্ড অ্যান্ড কেইস মনিটরিং অফিসার হিসেবে।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রাখাইনদের শ্মশান ব্রিটিশ আমল থেকেই খাসজমিতে নির্ধারণ করা। ১৯৫০-এর প্রজাস্বত্ব আইন অনুযায়ী, শ্মশান বা মন্দিরের জায়গা হস্তান্তরযোগ্য নয়, খাস জমি হলেও সেটি বরাদ্দ দেওয়ার আগে রাখাইনদের সাথে আলাপ করে নেওয়ার কথা।

“কিন্তু সেই জমির মালিকানা দাবি করে কোনো না কোনোভাবে প্রশাসনের সহায়তায় দখল করে রাখছে ভূমিদস্যুরা।”
তিনি বলেন, “মূল লক্ষ্য তিনটি জায়গায়। রাখাইনদের পল্লি, বৌদ্ধবিহার এবং শ্মশানভূমি। সেসব জায়গাই মূলত দখল হচ্ছে।”
পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি যোগ দেওয়ার পর এর মধ্যে অভিযোগ পাইনি। হয়ত তারা সাহস করেনি অভিযোগ জানাতে।
“বিষয়টি এখন নজরে আনায় ধন্যবাদ। আমি ইউএনও সাহেবের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেব।”